কারও চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েকটি নির্দেশ দেওয়া হলো, আর তিনি নিজের অজান্তেই সেগুলো মেনে চলতে শুরু করলেন— হিপনোসিস বা সম্মোহন নিয়ে সিনেমা কিংবা মঞ্চের প্রদর্শনীতে এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে কি সম্মোহনের মাধ্যমে মানুষের মন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে মনোযোগ, প্রত্যাশা ও অন্যের নির্দেশে সাড়া দেওয়ার মতো মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া?
হিপনোসিস বা সম্মোহন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ধারণা সময়ের সঙ্গে বদলেছে। সম্প্রতি এক লেখায় মনোবিজ্ঞানীরেন্স টি. হোয়াইট তুলে ধরেছেন, সম্মোহনের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে গবেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
সম্মোহিত হলেই কি নিয়ন্ত্রণ হারান মানুষ?
সম্মোহন নিয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, সম্মোহিত ব্যক্তি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং অন্যের নির্দেশ মানতে বাধ্য হন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই ধারণাকে সমর্থন করে না।
সম্মোহনের সময় মানুষের মনোযোগ ও অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে তিনি নিজের ইচ্ছা বা বিচারবোধ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। বরং প্রত্যাশা, পরিবেশ এবং নির্দেশের প্রতি ব্যক্তির সাড়া দেওয়ার প্রবণতা তার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
মঞ্চে সম্মোহনের প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা অনেক সময় জানেন, দর্শক তাদের কাছ থেকে বিশেষ ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করছেন। সেই পরিস্থিতিও তাদের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সম্মোহনের সব অভিজ্ঞতাকে অভিনয় বা ভান বলে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া আরও জটিল।
সম্মোহনে কি হারানো স্মৃতি ফিরে আসে?
সম্মোহন নিয়ে আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, এর সাহায্যে ভুলে যাওয়া ঘটনা বা অতীতের স্মৃতি নির্ভুলভাবে মনে করা যায়। কিন্তু সম্মোহন স্মৃতির যথার্থতা নিশ্চিত করে না।
কোনও ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন করার ধরন, অন্যের দেওয়া ইঙ্গিত কিংবা নিজের প্রত্যাশা স্মৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে সম্মোহনের সময় কেউ কোনও ঘটনা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বর্ণনা দিলেও সেটি যে নির্ভুল, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এ কারণে অপরাধের তদন্ত কিংবা আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্মোহনের মাধ্যমে পাওয়া স্মৃতিকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
চিকিৎসায় সম্মোহন কতটা কার্যকর?
সম্মোহনের ক্ষমতা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি থাকলেও চিকিৎসাক্ষেত্রে এর কিছু ব্যবহার নিয়ে গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু উপসর্গ সামলানোর ক্ষেত্রে সম্মোহন সহায়ক হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা ব্যক্তিভেদে এবং সমস্যার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই একে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সম্মোহন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—মানুষের আচরণে পরিবর্তন ঘটলেই তার পেছনে রহস্যময় কোনও শক্তি কাজ করছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মনোযোগ, প্রত্যাশা, পরিবেশ ও ব্যক্তির মানসিক প্রবণতাও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, সম্মোহনকে নিছক ভেলকি বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর মাধ্যমে মানুষের মন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। সম্মোহনের ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা বুঝতে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, প্রচলিত ধারণা নয়।