মেনোপজ নিয়ে এই ভুল ধারণাগুলো জানেন তো?

বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীদের শরীরে নানা পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে একটি স্বাভাবিক পর্যায় হলো মেনোপজ, যখন ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে এটি ঘটে। এ সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ শরীর গরম হয়ে ওঠা, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা মেজাজের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কারও ওজনও বাড়ে, বিশেষ করে পেটের আশপাশে।

এসব পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মনে ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ ভাবেন, মেনোপজ মানেই শরীর ও মনের অবনতি। কেউ আবার স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়াকে ডিমেনশিয়ার লক্ষণ বলে মনে করেন। তবে বাস্তবতা এতটা সরল নয়।

মনোবিজ্ঞানী জর্জিয়া উইটকিন সম্প্রতি এক নিবন্ধে মেনোপজকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এই পর্যায়কে শুধু বয়সজনিত অবনতি হিসেবে না দেখে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া এবং জীবনযাপনের অভ্যাস পর্যালোচনার সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

ভুল ধারণা ১: মেনোপজ মানেই শরীর ভেঙে পড়া

মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনসহ কয়েকটি হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন আসে। এর প্রভাবে শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মেনোপজের পর সুস্থ থাকার সুযোগ কমে যায়।

নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। শরীরের পরিবর্তনগুলো বুঝে সে অনুযায়ী যত্ন নেওয়াই এ সময় গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল ধারণা ২: মেনোপজের পর ওজন বাড়বেই

মেনোপজের সময় অনেক নারীর ওজন বাড়ে এবং পেটের আশপাশে চর্বি জমার প্রবণতা দেখা দেয়। হরমোনের পরিবর্তন এর একটি কারণ হলেও বয়সের সঙ্গে পেশির পরিমাণ কমে যাওয়া, শারীরিক কার্যক্রমের পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা ও খাদ্যাভ্যাসও এতে ভূমিকা রাখে।

ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত হাঁটা, সক্ষমতা অনুযায়ী শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং সুষম খাবার গ্রহণ সহায়ক হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয়ের পরিমাণ কমানোও উপকারী। লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণ নয়, পেশি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখাও।

ভুল ধারণা ৩: হাড়ের ক্ষয় ঠেকানোর উপায় নেই

মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড়ের ঘনত্ব দ্রুত কমতে পারে। এতে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তবে কিছু অভ্যাস এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার এবং সক্ষমতা অনুযায়ী ভার বহনকারী ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পাশাপাশি ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার ও পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি নিশ্চিত করা জরুরি। হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে।

ভুল ধারণা ৪: ভুলে যাওয়া মানেই ডিমেনশিয়া

মেনোপজের সময় কেউ কেউ পরিচিত মানুষের নাম মনে করতে, কোনও কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিস কোথায় রেখেছেন তা মনে করতে অসুবিধা অনুভব করেন। এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে অনেকে ‘ব্রেন ফগ’ বলেন।

হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের ব্যাঘাত ও মানসিক চাপের সঙ্গে এসব সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে সাময়িক স্মৃতির সমস্যা বা মনোযোগের ঘাটতি মানেই ডিমেনশিয়া কিংবা আলঝেইমার রোগ নয়।

বই পড়া, নতুন কিছু শেখা, ধাঁধা সমাধান, সামাজিক যোগাযোগ এবং শরীরচর্চা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সহায়ক হতে পারে। দৈনন্দিন কাজের জন্য ক্যালেন্ডার, নোট কিংবা ফোনের রিমাইন্ডারও ব্যবহার করা যায়। তবে স্মৃতির সমস্যা ক্রমাগত বাড়লে বা দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটালে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ভুল ধারণা ৫: ঘুমের সমস্যা ও ক্লান্তি সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই

হঠাৎ শরীর গরম হয়ে ওঠা এবং রাতে অতিরিক্ত ঘামের কারণে মেনোপজের সময় অনেকের ঘুম ব্যাহত হয়। এর ফলে পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু এসব উপসর্গকে বয়সের স্বাভাবিক পরিণতি ভেবে সহ্য করার প্রয়োজন নেই।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, শোবার ঘর ঠান্ডা রাখা এবং ঘুমের আগে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা উপকারী হতে পারে। ক্যাফেইন, অ্যালকোহল কিংবা ঝাল খাবারে কারও কারও উপসর্গ বাড়তে পারে। তাই নিজের ক্ষেত্রে কোন অভ্যাসে সমস্যা বাড়ছে, তা খেয়াল রাখা ভালো।

উপসর্গে ঘুম বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন থেরাপি কিংবা অন্য চিকিৎসার মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।

ভুল ধারণা ৬: সুস্থ থাকতে শুধু ব্যায়ামই যথেষ্ট

শরীরচর্চা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সুস্থ থাকার জন্য এটিই একমাত্র উপায় নয়। খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক সুস্থতা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় দরকার।

নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ, ধূমপান এড়িয়ে চলা, মানসিক চাপ সামলানো এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে। নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরিবার, বন্ধু কিংবা সহায়তামূলক গোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলাও মানসিক স্বস্তি দিতে পারে।

মেনোপজকে ভয় নয়, বুঝে নেওয়া জরুরি

মেনোপজের অভিজ্ঞতা সবার এক রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ সামান্য, আবার কারও ঘুম, কাজকর্ম ও মানসিক সুস্থতায় বড় প্রভাব পড়ে। তাই প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর না করে শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

মেনোপজ জীবনের শেষ অধ্যায় নয়। বরং নিজের শরীরের কথা নতুন করে শোনা, প্রয়োজনীয় যত্ন নেওয়া এবং পরবর্তী জীবনের জন্য সুস্থ অভ্যাস গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।