ধরুন, কেউ সামাজিক মাধ্যমে এমন একটি মন্তব্য করলেন, যা অনেকের কাছে আপত্তিকর মনে হলো। মুহূর্তেই পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ল। অপরিচিত মানুষজন তার সমালোচনা করতে শুরু করলেন। কেউ তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, কেউ কর্মস্থলকে ট্যাগ করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেন। এমনকি কেউ কেউ তার জীবনের অন্য কোনও দিক না জেনেই ঠিক করে ফেললেন—মানুষটি আসলে কেমন।
অথচ এই মানুষটিই হয়তো বছরের পর বছর পরিবারকে সময় দিয়েছেন, বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন, অপরিচিত কাউকে সাহায্য করেছেন কিংবা নিজের কাজের মাধ্যমে সুনাম অর্জন করেছেন। কিন্তু সেসবের কিছুই যেন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি মন্তব্য, একটি ভুল কিংবা একটি মুহূর্তই হয়ে উঠেছে তার পুরো পরিচয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে নিয়ে এমন গণসমালোচনা বা অপদস্থ করার প্রবণতাকে বলা হয় অনলাইন শেমিং বা সামাজিক মাধ্যমে লজ্জা দেওয়া। ভুলের সমালোচনা করা আর একজন মানুষকে তার একটি ভুলের মধ্যেই আটকে ফেলা অবশ্য এক বিষয় নয়। সমস্যাটা তৈরি হয়, যখন কোনও ঘটনার প্রেক্ষাপট না জেনেই মানুষকে চূড়ান্তভাবে বিচার করা শুরু হয়।
অন্যের ভুল চরিত্রের দোষ, নিজের ভুল পরিস্থিতির কারণে?
কেউ ভুল কিছু বললে আমরা প্রায়ই ধরে নিই, তার চরিত্রেই সমস্যা আছে। কিন্তু নিজের মুখ থেকে একই ধরনের ভুল কথা বেরিয়ে গেলে আমরা হয়তো বলি, সেদিন খুব ক্লান্ত ছিলাম, মাথায় অনেক চাপ ছিল কিংবা কথাটা ঠিকভাবে বোঝাতে পারিনি।
মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতার একটি ব্যাখ্যা হলো ‘ফান্ডামেন্টাল অ্যাট্রিবিউশন এরর’। সহজভাবে বললে, অন্যের আচরণ ব্যাখ্যা করতে আমরা তার ব্যক্তিত্বকে বেশি গুরুত্ব দিই, আর নিজের আচরণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে সামনে আনি।
সামাজিক মাধ্যমে এই প্রবণতা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ সেখানে কাউকে বিচার করার সময় তার মুখোমুখি বসে কথা বলা, তার অভিজ্ঞতা জানা কিংবা ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট বোঝার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। একটি পোস্ট বা স্ক্রিনশট দেখেই তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না। বরং প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের ভুলের সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা কি তার পুরো ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দিয়ে ফেলছি?
একবার নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে
কাউকে নিয়ে একবার নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে পরবর্তী ঘটনাগুলোও সেই ধারণার আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা যায়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিজের আগের বিশ্বাসের পক্ষে যায়, এমন তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা।
ধরা যাক, কারও একটি মন্তব্য দেখে আপনি মনে করলেন, তিনি অহংকারী। এরপর তার প্রতিটি বক্তব্যে অহংকার খুঁজতে শুরু করলেন। তিনি ভালো কিছু করলেও সেটিকে গুরুত্ব না-ও দিতে পারেন, আবার সাধারণ কোনও কথাকেও নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
এভাবে প্রথম ধারণাটিই ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকে। সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের নেতিবাচক মন্তব্যও সেই ধারণাকে আরও জোরালো করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানুষের আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা। ইতিবাচক অভিজ্ঞতার তুলনায় নেতিবাচক অভিজ্ঞতা ও ধারণা অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। মনোবিজ্ঞানে বিষয়টি ‘ব্যাড ইজ স্ট্রংগার দ্যান গুড’ ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফলে একজন মানুষ দীর্ঘদিন ভালো কাজ করলেও একটি আপত্তিকর মন্তব্য তার পরিচয়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ক্ষোভ যত বেশি, ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও তত বেশি
সামাজিক মাধ্যমে কোনও বিষয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে শুধু মানুষের আগ্রহ কাজ করে না; আবেগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে নৈতিক ক্ষোভ বা অন্যায়বোধ তৈরি করে, এমন পোস্ট মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
২০১৭ সালে প্রসেডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে টুইটারের কথোপকথন বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, পোস্টে নৈতিকতা ও আবেগ প্রকাশকারী প্রতিটি অতিরিক্ত শব্দের সঙ্গে সেটি ছড়িয়ে পড়ার হার প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ার সম্পর্ক ছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি আবেগপূর্ণ পোস্টই একই হারে ছড়াবে। গবেষণাটি নির্দিষ্ট ধরনের পোস্ট ও আলোচনার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল।
তারপরও ফলাফলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। ক্ষোভ তৈরি করে, এমন বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সময় ঘটনার প্রেক্ষাপট, তথ্যের সত্যতা কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
পর্দার আড়ালে বসে কাউকে নিয়ে কঠোর মন্তব্য করাও সহজ। সামনাসামনি যে কথা বলতে আমরা দ্বিধা করতাম, অনলাইনে পরিচয় ও দূরত্বের আড়ালে সেটিই বলে ফেলতে পারি। মনোবিজ্ঞানে এ প্রবণতাকে বলা হয় ‘অনলাইন ডিসইনহিবিশন ইফেক্ট’।
সমালোচনা যখন মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আঘাত হানে
সামাজিক মাধ্যমে সমালোচিত হওয়া সবার জন্য একই রকম অভিজ্ঞতা নয়। যুক্তিসংগত সমালোচনা, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং কাউকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হয়রানি—এসবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
তবে অনলাইন হয়রানির প্রভাব যে গুরুতর হতে পারে, তা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০২১ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত এক জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৪১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জানিয়েছেন, তারা কোনও না কোনও ধরনের অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
আবার প্রাপ্তবয়স্কদের অনলাইন হয়রানি নিয়ে করা গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আতঙ্কের আক্রমণ এবং আত্মহত্যার চিন্তার মতো মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অবশ্য সমালোচনার মুখে পড়লেই প্রত্যেকের এমন সমস্যা হবে, তা নয়। তবু সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে অপদস্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা যে কারও মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
ভাবুন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন—অসংখ্য অপরিচিত মানুষ আপনার চরিত্র নিয়ে আলোচনা করছেন, আপনার মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, এমনকি অন্যদের আপনার সঙ্গে কাজ না করার আহ্বান জানাচ্ছেন। আপনি চুপ থাকলে কেউ সেটিকে দোষ স্বীকার বলে ব্যাখ্যা করতে পারেন। আবার উত্তর দিতে গেলেও বিতর্ক আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আর সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট মুছে গেলেও তার স্ক্রিনশট বা পুনঃপ্রকাশিত সংস্করণ থেকে যেতে পারে। অন্যরা যখন বিষয়টি ভুলে যান, তখনও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তার পরিণতি বহন করতে হতে পারে।
একটি ভুল কি একজন মানুষকে পুরোপুরি চেনায়?
একজন মানুষের কোনও কথা বা কাজ অবশ্যই তার সম্পর্কে কিছু জানাতে পারে। গুরুতর অন্যায় হলে জবাবদিহি প্রয়োজন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু একটি মুহূর্তই যে কারও সম্পূর্ণ পরিচয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়।
আমরা সাধারণত অন্যের জীবনের সামান্য অংশই দেখি। যে মানুষটির একটি মন্তব্য নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তিনি হয়তো একই সময়ে অসুস্থ পরিবারের সদস্যের যত্ন নিচ্ছেন, শোক সামলাচ্ছেন কিংবা নিজের জীবনের অন্য কোনও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এসব তথ্য তার ভুলকে বৈধতা দেয় না; শুধু মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন একটি পোস্টের চেয়ে অনেক বড়।
তাই সামাজিক মাধ্যমে কাউকে নিয়ে কিছু লেখার আগে কয়েকটি বিষয় ভেবে দেখা যেতে পারে। ঘটনাটি সম্পর্কে আপনি কতটা নিশ্চিত? পুরো প্রেক্ষাপট জানেন কি? সমালোচনাটি কি নির্দিষ্ট আচরণকে ঘিরে, নাকি একজন মানুষকে অপমান করাই এর উদ্দেশ্য? আপনার মন্তব্যটি কি সমস্যার সমাধানে সাহায্য করবে, নাকি শুধু আরও মানুষকে আক্রমণে উৎসাহিত করবে?
কারও আচরণের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়, ভুলের সমালোচনাও করা যায়। কিন্তু সেই সঙ্গে এটুকু মনে রাখা জরুরি—একটি ভুলের দায় নেওয়া আর একজন মানুষকে চিরকাল সেই ভুলের পরিচয়ে আটকে রাখা এক বিষয় নয়।
শেষ পর্যন্ত, কাউকে বিচার করার আগে মনে রাখা দরকার—আমরা তার জীবনের একটি মুহূর্ত দেখছি, পুরো জীবনটা নয়।