সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের প্রথম উপাদানটি হলো শরবত। এই শরবতের প্রচলন হয়েছে মূলত দেহে পানির ঘাটতি পূরণ করার জন্য। একেকটি বাড়িতে শরবত নিজস্ব স্বাদ ও রুচি অনুযায়ী তৈরি করা হয় তবে সাধারণত শরবতের জন্য যেসকল উপকরণ ব্যবহার করা হয় তা হলো - লেবু, তেঁতুল, ইসবগুল, তোকমা, স্কোয়াস, যে কোনও ফলের রস, দুধ, দই, চিঁড়া ইত্যাদি। অতিরিক্ত চিনি যদি ব্যবহার না করা হয় তাহলে, শরবতের প্রতিটি উপাদানেরই ভালোমানের খাদ্যগুণ রয়েছে। যেমন - লেবু ছাড়াও অন্যান্য ফলের রসে রয়েছে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি, খনিজ পদার্থ। ইসবগুল ও তোকমা অন্ত্রের কার্যকারিতা ভালো রাখে ভালো ডাবের পানিও শরীরের জন্য বেশ উপকারি। কেননা ডাবে রয়েছে পটাশিয়াম ও সোডিয়াম এবং যাদের প্রস্রাবে সমস্যা রয়েছে, অর্থাৎ প্রস্রাব কম হয় তাদের জন্য ডাবের পানি খুবই কার্যকর।
শরবতের পর প্রথমেই আসে ছোলার কথা। ছোলায় যেমন আছে খাদ্যশক্তি, তেমনি রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন বি। খোসাসহ ছোলা রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে, তবে ওজন বেশি থাকলে ছোলা ভাজা বা ভুনা না খেয়ে সেদ্ধ ছোলা খাওয়া উচিত এবং পরিমাণেও কম হওয়া উচিত। ছোলা ছাড়া মটর দিয়ে চটপটি, ঘুঘনিও খাওয়া যেতে পারে, এবং যারা বয়স্ক, চিবাতে অসুবিধা হয় তাদের জন্য ঘুঘনিই সবচেয়ে ভালো। অনেকে ইফতারে কাঁচা ছোলা পছন্দ করেন। এটা যেমন রক্তের চর্বি কমাতে সাহায্য করে, তেমনি পুষ্টিকরও বটে। কাঁচা ছোলার সঙ্গে আদা কুচি, টমেটো কুচি, পেঁয়াজ, পুদিনা পাতা ও লবণ দিয়ে খেলে বেশ উপাদেয় হয়।
ছোলার পরেই আসে ভাজাভুজি, বিশেষ করে পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ। এর সাথে সাথে অনেকের জন্য রোজা মানেই হালিম, তেহারি, চিঁড়া, কলা, নারকেল, দুধ, সেমাই, নরম খিচুড়ি, কাবাব, দইবড়া, জিলাপি ইত্যাদি আরও অনেক ধরনের খাবার। যেহেতু এসব খাবার সবই ক্যালরিবহুল, এ কারণে খাবারের মধ্যে পরিমিতি বোধটা অবশ্যই থাকতে হবে। কারণ, শুধু ইফতারির প্লেট হিসাব করলেই দেখা যাবে ১০০০-১৪০০ ক্যালরি পর্যন্ত ইফতারিতে খাওয়া হয়ে যায়।
ইফতারির উপাদানগুলোর মধ্যে ফল রাখাটা স্বাস্থ্যসম্মত। এতে ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব পূরণ করা যায়। ফল দেহত্বক, চোখ, দাঁত, চুল, নখ যেমন ভালো রাখে তেমনি হৃদরোগীদের জন্যও ভালো। তবে ডায়াবেটিস ও কিডনির রোগ থাকলে রোগটিকে বিবেচনায় রেখে ফল খেতে হবে।
রাতের খাবার
অনেকে এত বেশি ইফতার করেন, ফলে রাতের খাবার খেতে চান না। এটা না করে কম করে সব বেলাতেই খাওয়া উচিত। রাতের খাবার হালকা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ইফতারের খাবারে ডাল বেশি থাকে বলে এ সময় ডাল বাদ দেয়া ভালো। মাংসের চেয়ে হালকা মসলার রান্না মাছ, সবজি, শাক, ভর্তা এগুলো থাকতে পারে। ইচ্ছে হলে টক দই বা দুধ দিয়ে চিড়া খেতে পারেন। তবে মনে রাখবেন রাতের খাবার এবং সেহরির খাবারের মাঝে যেন অবশ্যই ৪/৫ ঘণ্টার একটা সময় থাকে। আর এটা করতে হলে রাতের খাবার আর ইফতারের সময়ে খুব গ্যাপ না থাকলেও চলে। ইফতার একটু খেয়ে নামায পড়ে রাতের খাবার খেয়ে নিন। তারপরত তারাবী শেষে এক গ্লাস দুধ খেয়ে বা একটা কলা খেয়ে ঘুমাতে চলে যেতে পারেন। রাতে বা সেহরি, কোন সময়েই ঠেসে খাবেন না এবং অবশ্যই খাবারের সাথে সাথে ঘুমাতে যাবেন না। হাতে একটু সময় নিয়ে খেয়ে তার ৩০/৪০ মিনিট পড়ে পানি খাবেন এবং তার পড়ে শুতে যাবেন।
সেহরি বা ভোর রাতের খাবার
রমজানে এই খাবারটির গুরুত্ব অনেক। যেহেতু সারাদিন উপবাস থাকতে হবে, সেহেতু এ সময় বেশি বেশি খাওয়া উচিত - এমনটা যেমন অনেকে মনে করেন, তেমনি ভোরে উঠে খেতে হবে এই ভেবে অনেকে একেবারেই খেতে চান না। মনে রাখবেন দুটোই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বেশি বা মাত্রাতিরিক্ত খেলে গ্যাস বা ডায়রিয়া হতে পারে, তেমনি আবার না খেয়ে রোজা রাখতে গেলে শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে। এছাড়া শরীরে সোডিয়াম-পটাশিয়াম কমে যেতে পারে পারে। এদিকে যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের রক্তে চিনির পরিমাণ কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুদীর্ঘ উপবাস দেহের বিপাকক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব ফেলে, এবং দেহের গ্লুকোজ ক্ষয় হয় বলে সহজেই ক্লান্তি আসে। এতে করে দিনের স্বাভাবিক কাজকর্মও করা যায় না। সেহরির খাবার হবে অন্যান্য দিনে দুপুরে যে পরিমাণ খাবার খাওয়া হয় ততটুকু। এ সময় এক কাপ দুধ খেতে পারলে ভালো হয়। হজমে সুবিধার জন্য চিড়া আর ঘরে পাতা দই খেতে পারেন। ফল খেলে গ্যাস হলে, ভোর রাতে ফলটা না খাওয়াই ভালো। আর যেমনটা বলছিলাম, রাতে বা সেহরি, কোন সময়েই ঠেসে খাবেন না এবং অবশ্যই খাবারের সাথে সাথে ঘুমাতে যাবেন না। হাতে একটু সময় নিয়ে খেয়ে তার ৩০/৪০ মিনিট পড়ে পানি খাবেন এবং তার পড়ে নামায শেষে শুতে যাবেন।
/এফএএন/