জর্জটাউনে এক চক্কর!

মালয়শিয়ার ছোট শহর পেনাং। খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল। পেনাং তখনো জেগে উঠেনি। হোটেলের খাবার খাবো না। ফুটপাতের খাবার খাবো। পথে নেমে দেখি নাস্তা তৈরির আয়োজন চলছে ফুটপাতে। রেষ্টুরেন্টগুলোও প্রস্তুতি শেষ করতে পারেনি। কিন্তু যে খাবারের আয়োজন দেখছি, তার অনেক কিছুই অপরিচিত। মসলার ব্যবহার বেশি মনে হলো। তাই কফি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ট্যাক্সির সন্ধানে। ট্যাক্সি পাওয়া মামুলি ব্যাপার। জর্জটাউন যাবো, ঢাকা থেকেই জানা  গন্তব্য। আর্মেনিয়ানরা এখানে ব্যবসা করতে এসেছিল। তাদের স্মৃতি পথে-দেয়ালে। একটা চার রাস্তার মোড়ে তামিল ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাদের নামিয়ে দিল। ভাড়াটা যে বেশি নিয়েছে, তা বুঝতে পেরেছি পরে। সঙ্গে সতর্কতা পরামর্শ কোন তামিল চালকের ট্যাক্সিতে ওঠা যাবে না! মোড়ে একটা পাম গাছের নিচে চার চাকার ও তিন চাকার রিকশা জমে আছে। উল্টো দিকে মন্দির। ঝটপট মন্দিরের ছবি তুলে ফেললাম কয়েকটা।

জর্জটাউনে এক চক্কর!

এবার কোন পথে যাই? কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ। ডানদিক দিয়ে শুরু করবো নাকি বাম দিয়ে? নাকি সোজা পথই ভাল পন্থা! এক বৃদ্ধ মালয় ঘুরঘুর করছে। আর কী যেন বলতে চাইছে। ভাবলাম হায় হায় এখানেও ভিখারি? ভুল ভাঙলো। তিনি ভিখারি নন। চার চাকা সাইকেল ভাড়া দেয়ার জন্য পিছু ধরেছে। সাইকেলে চড়ে পুরো এলাকা ঘুরে দেখা যাবে। ভালই, রিকশা চালককে ফাও গাইড হিসেবেও পেয়ে যাবো! ততক্ষণে বেলা গড়িয়ে দশটা। তাতানো রোদ চারদিকে। তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। কিন্তু একি! রিকশা নাকি আমাদেরকেই চালিয়ে যেতে হবে। এতক্ষণে বিষয়টা পুরোপুরি বুঝলাম। দেখলাম চার চাকার বাহনে চারজন পর্যটক একসঙ্গে চালিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘণ্টায় চল্লিশ রিংগিত রফা করে বেড়িয়ে পড়লাম।

শহরের প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন

কখনো রিকশা চালিয়ে কখনো পায়ে হেঁটে দেখছি। দেখছি আর ছবি তুলছি। মনে হচ্ছে আমি বুঝি দু্ই-তিনশ বছর আগের কোন এক মানুষ। শান্ত শহর। একলা পথিক আমি পথ হেঁটে চলেছি। বাড়িঘর দোকানপাট  কথা বলছে ফিসফিস করে। যেমন যা ছিল তেমনি রাখা আছে। সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে মানানসই শিল্প রচনা। কেউ হয়তো  ফেলে রেখে গেছে ব্যবহৃত বাক্স কিংবা ঘরের পুরনো আসবাব। বারান্দার সিলিং-এ পুরনো ফ্যান লাইট। সেটার সঙ্গে  জুড়ে দেয়া হয়েছে  আধুনিক চিন্তার ইন্সটলেশন আর্ট। বহু বছরের পুরনো তবু পুরনো নয়! বহুবছরের ব্যবহৃত তবু যেন মলিন নয়। আবার কোনও কিছুই নতুন নয়। ঠিক যেমন ছিল তেমনই। মনে হচ্ছে কোনও আর্মেনিয়ান আমাকে হাত ধরে ঘুরে দেখাচ্ছে এ গলি সেই অন্য গলি। ঘুরতে ঘুরতে  শুধু উদাস হতে ইচ্ছে করে। ট্যাক্সি চালক বলেছিল–দেখে এসো, পুরোটাই একটা ছবি। ইট বর্গা চৌকাঠ সব কথা বলবে তোমাদের সঙ্গে। সত্যি তাই। মিথ্যে নয় এক বর্ণও। 

শহর ঘোরার বাহন

ঘুরছি ফিরছি। মাঝে  মধ্যেই দেখা হয়ে যাচ্ছে দেশি মানুষের সঙ্গে। ভাগ্য বদলাতে এসেছে এরা। কখন গলা ছেড়ে গান ধরেছি, ‘আমি পথ ভোলা এক পথিক এসেছি।’ হঠাৎ পেছন থেকে  একজন বলে উঠলো –আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? ব্যস বাংলা ভাষা বলে কথা। জমে উঠলো গল্প। তার নাম দীপক। জেনে নিল আমার দেশের ঠিকানা। ও কিন্তু বাংলাদেশের নয়। কলকাতা থেকে এসেছে। লাভলেনে ওর দোকানে আনারসের জুস খেতে খেতে পরিচয় টুটুলের সঙ্গে। ওদের জুস-কফিবারটা দারুণ। দেয়ালে ক্রেতাদের অটোগ্রাফই সুন্দর সাজ হয়ে উঠেছে। টুটুল জর্জটাউনে এসেছ পাঁচ বছর আগে। টুটুলের জোর দাবি- আমাদের পুরনো ঢাকাকেও এমন করে পুরনো ঐতিহ্যের আওতায় এনে পর্যটনকেন্দ্রে  রূপান্তরিত করা যায় কিনা। কত পর্যটক আসবে শুধু দেখার জন্য। টুটুল নিজেই আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলে-না, সম্ভব না। নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতা আমাদের দেশে।

টুটুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার চার চাকার  বাহনে। চাকা ঘুরছে, বেলাও ঘুরছে। একটা পলেস্তরা খসে পড়া দেয়ালের সামনে এসে চমকে  উঠলাম। দেয়ালে আঁকা এটা কার ছবি? জানি না। কিন্তু বড্ড পরিচিত মুখ,পরিচিত বসার ঢঙ। চিন্তা ঘুরপাক খেতে খেতে পেরিয়ে যাচ্ছি পর্তুগিজ সভ্যতার একের পর এক স্পর্শ। খোশ গল্প করছেন ছয় সাতজন তরুণী। ইউরোপ কিংবা আমেরিকার পর্যটক। গবেষক দলও হতে পারে। ওদের দেখে মনে হল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই ওরা বুঝি এমন করে বসে আছে! আটকে গেছে কোন ছবিতে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। আমিও আমার পায়ের চিহ্ন রেখে গেলাম অনেক যুগের পুরনো এই সাজানো নগরীতে।

বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা

বারবার এপথে ওপথে দেখা হয়ে যাচ্ছে একই পর্যটকদের সঙ্গে। কেউবা আমাদের মতোই হারিয়ে ফেলেছে গলি। ঘুরে ফিরে এক পথেই হাতড়ে ফিরছে নতুন গলির পথ। বেশ আত্মীয় হয়ে উঠলাম একে অপরের। এখানে অনেক ছোট ছোট হোটেলও আছে। অল্প টাকায় থাকা যায়। তবে এগুলোতে পাঁচতারকা  হোটেলের মতো সুযোগ সুবিধা পাওয়া যাবে না। তবে আড্ডা জমানোর ভালো জায়গা বটে। সন্ধ্যা হলেই শান্ত স্বভাব উধাও। জমে উঠে এখানকার জীবন। জমজমাট মধ্য রাত পর্যন্ত। এক রাতের জন্য আর্মেনিয়ান হয়ে ওঠা!

ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত আমরা। টুংটাং শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে কুলফিওয়ালা। ঠিক যেন পুরনো ঢাকার কোনও বুড়ো কুলফিওয়ালা। দাঁড়িয়ে গলা ভেজালাম। একটা পুরনো দরজায় তালা লাগিয়ে বের হয়ে এল লম্বা শুকনো খটখটে চেহারার এক বৃদ্ধ। কুশল বিনিময় করেই জানতে চাইল ঘণ্টায় কত টাকায় সাইকেল ভাড়া নেওয়া হয়েছে। চল্লিশ রিংগিত শুনতেই বৃদ্ধের বেজার মুখ। বড্ড ঠকিয়েছে বজ্জাতগুলো। পঁচিশ কিংবা ত্রিশ হলে ভালো হত। মনে মনে বললাম ঠিক আছে, আগামীবার না হয় ঠকবোনা!  কিন্তু এবার? এবারতো মন ভরে দেখা হল একটা শহর সমান ক্যানভাস! এটাই বা কম কি?

/এনএ/