সফল উদ্যোক্তার গল্প আজকাল প্রায়ই চোখে পড়ে। আর এসব গল্প দেখে অনেকেই স্বপ্ন বুনেন নিজেকে সফল হিসেবে গড়ে তোলার। কিন্তু কীভাবে সফল হবেন? সেই গল্পই শোনাচ্ছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা সুমনা আফরোজ রোজা।
‘একজন মানুষের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল হওয়ার মন্ত্র একটিই, তা হচ্ছে লেগে থাকা। পরিশ্রম, সততা, আত্মসংযম এবং আত্মনিবেদিত হওয়ার মাধ্যমে তা সম্ভব’ বলে মনে করেন সুমনা। তিনি বলেন, ‘একজন নারীর সত্যিকারের বিজয় আসে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পর। নারীর মুক্তি কর্ম দক্ষতায়, শোকেসে সাজিয়ে রেখে নয়।’
সোমবার (১৬ ডিসেম্বর) বিজয় দিবসে দুপুরের আগে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসেই নিজের সংগ্রামের গল্প বলছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা সুমনা আফরোজ রোজা।
রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের পাশেই ‘ফুড আর্কাইভ অ্যান্ড ক্যাটারিং’ নামে ছোট্ট রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সুমনা আফরোজ রোজা। নাচ-গান থেকে থেকে আইন পেশা, পাঁচ তারকা হোটেল থেকে রাস্তায় খাবারের দোকান— সব ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জনের গল্প শোনালেন তিনি।
রোজা বলেন, ‘যেখানে দেশের মানবসম্পদের অর্ধেকই নারী। আর এই নারীরা পিছিয়ে থাকলে হবে না। নারীকে তার বিজয় অর্জন করতে হবে আত্মনির্ভরশীলতার মাধ্যমে। নারীর মুক্তির পথ তৈরি হয় আর্ধিক স্বচ্ছলতায়। তাই ঘরে বসে না থেকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। আমি নিজের চেষ্টায় আত্মনির্ভরশীর হয়েছি, নানান প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও। আমি চাই, আপনি যা জানেন সেখানেই নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলেন। তবেই ভালো লাগার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হয়ে অবদান রাখতে পারবেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে। আমি চাই প্রত্যেক নারী আত্মনির্ভরশীল হোক।’
রাস্তার পাশে নিজের ব্যবসা
৩২ বছর বয়সী সুমনা আফরোজ রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু-তে কন্টিনেন্টাল শেফ হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি আইন পেশায় নিযুক্ত হন কম বয়সেই। লেখাপড়া শেষ করে একদিনও বেকার বসে থাকতে চাননি, বসেও থাকেননি। নাচ-গান যন্ত্র সংগীত চর্চা চালিয়ে গেছেন। সর্বশেষ মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের ‘তাজমহল ফুড কোর্ট’ এ ‘ফুড আর্কাইভ অ্যান্ড ক্যাটিারিং’ নামে একটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করেন ২০২২ সালের ১৫ এপ্রিল। ২৪ হাজার টাকা দোকান ভাড়া। এই ব্যবসায় সফল হতে দিনভর পরিশ্রম করেন তিনি। রোজা বলেন, ‘‘আমার ইচ্ছে আছে রাজধানীতে ‘ফুড আর্কাইভ অ্যান্ড ক্যাটারিং’এর একাধিক শাখা করবো।’’ লেগে থাকলে সবই সম্ভব বলে মনে করেন সুমনা।
বিজয় দিবসে সোমবার (১৬ ডিসেম্বর) দুপুরের আগে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, দোকানে বসে ‘কে গো জানতে পায়, রসের রসিক না হলে’ লালনের গানটি গুন গুন করে গাইছেন সুমনা। ক্রেতা দেখে হাতের দোতারাটি দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে অর্ডার মাফিক সিঙ্গাড়া ভাজা শুরু করেন তিনি।
কাজের ফাঁকে সুমনা জানান, ফলের জুস থেকে শুরু করে ভারতীয়, চীনা ও থাই খাবার কম দামে বিক্রি করেন। হরেক রকম চা ও কফির আয়োজন রেখেছেন ছোট্ট এই দোকানটিতে।
সুমনা বলেন, ‘অর্ডার নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে নির্ভেজাল খাবার তৈরি করে ক্রেতাদের সার্ভ করি। পাঁচ তারকা হোটেলের খাবার সবার পক্ষে কিনে খাওয়া সম্ভব নয়। আমি ম্যানুয়ালি পাঁচ তারকা হোটেলের মান বজায় রেখে সুলভ দামে খাবার বিক্রি করি। এখানে বসেই খেতে পারবেন ক্রেতারা। হরেক রকম চা, কফি, বিভিন্ন ফলের জুস থেকে শুরু করে ক্রেতাদের পছন্দ মতো বিভিন্ন খাবার পরিবেশন করা হয় সুমনার দোকানে।
সুমনার ক্যাম্পেইন
‘দেশি ও বিদেশি আইটেমের খাবার ভেজালমুক্ত খাওয়ানোই আমার একটি উদ্দেশ্য। বিশেষ করে টেস্টি সল্টমুক্ত খাবার খাওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ করি। আর এখানে টেস্টিং সল্ট ছাড়াই উন্নত স্বাদের খাবার তৈরি করি।, জানালেন সুমনা আফরোজ রোজা। তিনি বলেন, ‘বাচ্চারা টেস্টিং সল্টযুক্ত খাবার বেশি পছন্দ করে। আমার ৭ বছরের ছেলে নিখাদ টেস্টিং সল্টের কারণে নেফ্রটিক সিনড্রমে আতক্রান্ত হয়। সেই থেকে আমি প্রচারণা চালিয়ে আসছি এর বিরুদ্ধে। শিশু বা বৃদ্ধ সবাই যেন টেস্টিং সল্টমুক্ত খাবার খায়, ভেজালমুক্ত খাবার খায়। আমার মতো কেউ প্রিয় সন্তান নিয়ে বিপদে না পড়েন।’
নাচ ও গানের চর্চা
আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু-তে কন্টিনেন্টাল শেফ এবং আইন পেশা দুটোই অব্যাহত রেখেছেন সুমনা। সেইসঙ্গে নাচ-গানও চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, নতুন করে চর্চা শুরু করেছেন ফোক সংগীত। লালনের গান শিখছেন বাউল শিল্পী শফি মণ্ডলের কাছে।
সুমনা বলেন, ‘রেডিসন ব্লু-তে কন্টিনেন্টাল শেফ হিসেবে কাজ করছি ২০২২ সাল থেকে। এর আগে কাজ করেছি হলিডে ইন হোটেলে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন জিআর ও গেস্ট রিলেশন্স অফিসার হিসেবেও কাজ করেছি। আইন পেশায় পুরোপুরি সক্রিয় হতে পারছি না সময়ের অভাবে। নিজে আনন্দে থাকার জন্য নাচ-গান এখনও চর্চা করে যাচ্ছি।’
সুমনা বলেন, ‘ছায়ানটে পাঁচ বছর নজরুল সংগীত শিখেছি নজরুল ইনস্টিটিউটে। ক্লাসিক্যাল মিউজিক শিখেছি পণ্ডিত পঙ্কজ বসু এবং অনিল কুমার সাহার কাছে। নজরুল সংগীত শিখেছি বরেণ্য শিল্পী খালেদ হোসাইন, ফেরদৌস আরা, সালাউদ্দিন স্যার, ইয়াকুব আলী খান, জোসেফ কমল রড্রিক্সের কাছে। তানপুরা শিখেছি গুরুজী পঙ্কজ বসুর কাছে। সেতার ভারতীয় রাম প্রপান্ন আচার্য এবং নিলাদ্রি কুমার ওস্তাদের কাছে। আর ভরতনাট্যম বাংলাদেশের বেলায়েত হোসেন ঝন্টু স্যারের কাছে। বর্তমানে দোতারা ও লালন সাঁইজির বাণী শিখছি গুরুজী বাউল শিল্পী শফি মণ্ডলের কাছে।
পারিবারিক সূত্রেই উদ্যোক্তা
রোজা বলেন, ‘আমার বড় ভাই শেফ সোহেল আহমেদ। বর্তমানে কাতার এয়ারলাইন্সে ডেমি শেফ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি কাতারেই আছেন। আর আমার বড় বোন রুমানা আফরোজ বাসা থেকেই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ব্যবসা করেন। তার ব্যবসা অনলাইনে, নাম ‘কেক অ্যান্ড ফ্লেক বাই ফেরিওয়ালি’। বলতে পারেন পারিবারিক উৎসাহেই আমরা দুবোনই উদ্যোক্তা। আর নাচ ও গানের চর্চাটাও পারিবারিক উৎসাহে।
সুমনা আরও বলেন, ‘আমার মা সালমা বেগম ‘জীবন বীমা’য় অ্যাকাউন্টসে কাজ করতেন। তিনি বাংলাদেশ বেতারে নজরুল সংগীত গাইতেন। বর্তমানে তিনি বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। বাবা মারা গেছেন আমি যখন খুব ছোট। বাবা আনোয়ার হোসেন সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন।
ঢাকার গোপীবাগ আর কে মিশন রোডে আমরা বড় হয়েছি। এখন থাকি মোহাম্মদপুর মায়ের বাসায়।
লেখাপড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সুমনা বলেন, ‘ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শুরু করি। পরে আশা ইউনিভার্সিটিতে ক্রেডিট ট্রান্সফার করি। আমি আইনে অনার্স ও মাস্টার্স করে ঢাকা বারে এনরোলমেন্ট হয়েছি। পরিবারে মা, ভাইবোনের সহযোগিতায় আজ এই জায়গায় পৌঁছেছি। আমি চাই, আমার মতো সব নারী আত্মনির্ভরশীল হোক। সমাজে নারীর মুক্তি ঘটুক।’