প্রশ্ন: আমার বয়স ২৭ বছর। আমি নিয়মিত পাবলিক বাসে অফিস যাতায়াত করি। সম্প্রতি একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে। বাসে থাকা যাত্রীদের কেউ আমার সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। এরপর থেকে আমি বাসে উঠতে ভয় পাই। কোনোভাবেই ভয় কাটাতে পারছি না। আমার নিয়মিত চলাচল খুব সীমিত হয়ে গেছে। নিয়মিত অন্য বাহনে যাতায়াত করাও আমার পক্ষে আর্থিকভাবে সম্ভব না। আমি কারোর সঙ্গে শেয়ারও করতে পারছি না। এখন আমি কী করবো?
উত্তর: আস্থাভাজন কারও সঙ্গে কথা বলুন। কারো না কারও সঙ্গে কথা বলতে হবে। যদিও আপনি লিখেছেন কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারছেন না, তবুও চেষ্টা করে দেখুন খুব কাছের কোনও বন্ধু, বোন, বা এমন কোনও আত্মীয়ের কাছে কথা বলা যায় কিনা। এমন কেউ যিনি কোনও প্রকার দোষারোপ করবেন না। অনেক সময় কথা বললে মন হালকা হয়। যদি একান্তই কাউকে না পান আপনার অনুভূতিগুলো একটি ডায়েরিতে লিখে রাখতে পারেন। এতে আপনার ভেতরের চাপা কষ্ট এবং রাগ বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে এবং আপনি কিছুটা হালকা বোধ করবেন।
পরামর্শ: যদি সম্ভব হয়, একজন কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। তারা আপনাকে এই মানসিক ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে পেশাগত প্রক্রিয়ায় সাহায্য করতে পারবেন। বাংলাদেশে এখন অনলাইনেও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা আছে, যা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হতে পারে।
ছোট ছোট পদক্ষেপে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনুন। সেটা হতে পারে বিকল্প পথের সন্ধানের মধ্য দিয়ে। প্রথমেই অফিসের লম্বা পথের জন্য বাসে না উঠে, কোনও ছুটির দিনে বা কম ভিড়ের সময়ে একদম ছোট দূরত্বের জন্য (যেমন দুই বা তিন স্টেশন) বাসে উঠে দেখতে পারেন। সঙ্গে একজন বন্ধুকে নিয়ে গেলে আরও ভালো হয়। উদ্দেশ্য হলো, বাসের পরিবেশের সঙ্গে ভয়টাকে ধীরে ধীরে কাটানো।
আত্মরক্ষার প্রস্তুতি থাকা ভালো
যেকোনও মানুষের জন্যে প্রাথমিক আত্মরক্ষামূলক কিছু কৌশল জানা জরুরি। আপনি জরুরি কিছু নম্বর সঙ্গে রাখুন। আপনার মোবাইলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯ নম্বরটি সেভ করে রাখুন। বিপদের আশঙ্কা দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে কল দিন। ভয় পাবেন না। আপনার নিরাপত্তার জন্য অনেক উপায় চারপাশে আছে, ভয় পেয়ে গেলে আপনি সেগুলোর সহায়তা নিতে পারবেন না। চুপ করে না থেকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন।
প্রশ্ন: আমার বয়স ৪২। বিবাহিত। আমাদের একটি ছয় বছরের সন্তান আছে। আমাদের দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার সময় মারা যায়। আমার স্ত্রী তারপর থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সে প্রথম সন্তানের স্কুল, খাওয়া দাওয়া কিছুই যত্ন নিতে চায় না। তার ধারণা আমাদের কোনও অবহেলার কারণে সে সন্তান হারিয়েছে। তাকে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সে তাতেও নিয়মিত আগ্রহী না হওয়ায় বন্ধ করে দিতে হয়েছে। যদি তার জন্য এবং আমার পরিবারের জন্য কোনও পরামর্শ থাকে।
উত্তর: খুবই সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে আপনাকে। আপনার স্ত্রীর অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিন, তার মনে যে অপরাধবোধ কাজ করছে (আমাদের অবহেলায় সন্তান হারিয়েছে), সেটিকে সরাসরি ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। এতে তিনি আরও একা বোধ করতে পারেন। বরং তার পাশে বসে শুনুন এবং তাকে বারবার বলুন, ‘আমি সব সময় তোমার পাশে আছি।’ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, ‘যা ঘটেছে তা কারও নিয়ন্ত্রণে ছিল না।’
কাউন্সেলিং ভীতি বা অনাগ্রহ আমাদের দেশে অতি পরিচিত। স্ত্রী সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে কাউন্সেলিংয়ে না যেতে চাইতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনারা 'কাপল কাউন্সেলিং-এর (দম্পতি কাউন্সেলিং) সহায়তা নিতে পারেন। আপনার স্ত্রীকে বলুন, ‘চলো আমরা একসঙ্গে যাই। আমারও এই পরিস্থিতি সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। আমরা একসাথে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিলে হয়তো আমাদের সন্তানের জন্য এবং নিজেদের জন্য ভালো হবে।’ এতে তিনি একা বোধ করবেন না এবং দায়টা শুধু তার ওপর চাপানো হচ্ছে, এমনটা ভাববেন না।
আরেকটি বিষয়ে খেয়াল রাখবেন আপনাদের প্রথম সন্তানের যত্ন নেওয়ার জন্য স্ত্রীকে চাপ দেবেন না। বরং আপনি যখন বাচ্চার যত্ন নিচ্ছেন, তখন তাকে ছোট কোনও কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করুন। আপনারা দুই জনই সন্তান হারিয়েছেন। নিজেদের মধ্যে কথা বলুন। অল্প অল্প হারানো সন্তানের স্মৃতিচারণ করুন। শোককে চেপে না রেখে প্রকাশ করতে পারলে ভেতরের ভার কিছুটা কমে।
প্রথম সন্তানের জন্য করণীয়
ছয় বছরের একটি শিশু পরিস্থিতি পুরোপুরি না বুঝলেও সে অনুভব করতে পারে যে কিছু একটা ঠিক নেই। মায়ের আচরণে সে নিজেকে বঞ্চিত ভাবতে শুরু করলে পরিস্থিতি আরেকটু জটিল হয়ে যেতে পারে। তাকে বারবার আশ্বাস দিন যে আপনারা তাকে খুব ভালোবাসেন। সত্যিটা তাকে সহজ করে বলুন- ‘মা তোমাকে আগের মতোই ভালোবাসে, কিন্তু মন খারাপ থাকায় এখন তোমার সঙ্গে বেশি কথা বলতে বা খেলতে পারছে না। কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।’ এতে সে মায়ের আচরণকে ব্যক্তিগতভাবে নেবে না।
আপনার নিজেরও যত্ন দরকার
আপনিও আপনার সন্তানকে হারিয়েছেন। আপনারও কষ্ট পাওয়ার এবং শোক করার অধিকার আছে। নিজের অনুভূতিগুলোকে চেপে রাখবেন না। একজন বিশ্বস্ত বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বলুন। সব দায়িত্ব একা পালন করতে করতে আপনি ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। দিনের মধ্যে কিছুটা সময় (৩০ মিনিট হলেও) নিজের জন্য বের করুন। যা করতে ভালো লাগে, তাই করুন।