বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

৪০ বছর মানেই জীবন শেষ নয়

প্রশ্ন 

আমি একজন স্কুল শিক্ষক ছিলাম। স্বামী মারা গেছেন যখন আমার দুই ছেলে ছোট। এখন তাদের সংসার হয়েছে। আমি বড় ছেলে, তার বউ ও বাচ্চার সঙ্গে থাকি আমার নিজের বাড়িতে। ছেলে ও বউ চাকরিজীবী। তাদের সন্তানকে বড় করতে গিয়ে আমি আমার নিজের অবসর জীবনের পুরোটাই উৎসর্গ করেছি। কিন্তু ছেলের বউ আমার সঙ্গে ভালো ব‍্যবহার করে না। আমার আর্থিক অবস্থা খারাপ না, কেবল একটু ভালো ব‍্যবহারের আশা করে শেষ জীবন কাটাচ্ছি। ওদের সন্তানের দেখভালের জন্য আমি নিজের মতো করে কোথাও যেতেও পারি না। কিন্তু এখন আমার শরীরও অনেক খারাপ থাকে, আমার এসব দায়িত্বও পালন করতে কষ্ট হয়। সন্তানদেরকে কীভাবে বলবো? আমি ঠিকমতো মানুষ করতে পারিনি।

উত্তর

মানসিক প্রস্তুতি নিন। প্রথমে নিজেকে মনে করান যে, আপনি কারোর দয়ায় বেঁচে নেই। এই বাড়ি আপনার। নাতিকে দেখাশোনা করাটা আপনার ‘দায়িত্ব’ নয়, বরং ‘ভালোবাসার বাড়তি কাজ’। শরীর খারাপ লাগলে সেটা না করার পূর্ণ অধিকার আপনার আছে।

ছেলের সাথে আলাদাভাবে কথা বলুন। বউমার সাথে সরাসরি কথা বললে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। তাই প্রথমে আপনার বড় ছেলের সাথে একান্তে কথা বলুন। কোনও অভিযোগের সুরে নয়, বরং আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং অনুভূতির কথা তুলে ধরুন। আলোচনার সময় সমস্যা বলার সাথে সাথে সমাধানও দিন। বলুন, ‘তোমরা দুজনেই চাকরি করো, তাই বাচ্চার জন্য একজন ফুল-টাইম আয়া বা কেয়ারগিভার রাখা প্রয়োজন। আমি বাসায় আছি, আমি হয়তো সুপারভাইজ করতে পারব, কিন্তু শারীরিক শ্রম দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

নিজের জন্য সময় বের করুন। সন্তানদের বুঝতে দিন যে আপনারও ‘নিজস্ব জীবন’ আছে। আপনি ঘুরতে যান, ছোট ছেলের কাছে বা কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে কিছুদিন বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করুন। এতে তারা বুঝতে পারবে যে আপনাকে ছাড়া সংসার সামলানো কতটা কঠিন। তাদেরও রিয়েলাইজেশন বা উপলব্ধি হবে। যখন শরীর খারাপ লাগবে, সরাসরি ‘না’ বলুন।

মনে রাখবেন, শিক্ষক হিসেবে আপনি সারাজীবন অন্যদের শাসন ও স্নেহ দিয়ে মানুষ করেছেন। এখন নিজের সন্তানের ক্ষেত্রেও সেই দৃঢ়তা দেখানোর সময় এসেছে। চুপ করে সব সহ্য করে গেলে তাদের আচরণ পরিবর্তন হবে না, বরং দিন দিন বাড়বে।

প্রশ্ন

আমি চাকরিজীবী। ক‍্যারিয়ার বানাতে গিয়ে বিয়ে করিনি। এখন আমার বয়স ৪০। বন্ধু বান্ধবের নিজেদের জীবন হয়েছে, তাদের সঙ্গও পাই না খুব একটা। এখন আমি বিয়ের কথা ভাবতে গিয়ে দেখছি, এই বয়সে আমাদের সমাজের মেয়েদের বিয়ে খুব সহজ না। সম্প্রতি আমার মামা একজন ৫০ বছরের ডিভোর্সি ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা বলছেন। আমার বৃদ্ধা মাও সেটাতে সম্মত। কিন্তু আমি দ্বিধায় রয়েছি। কারণ উনার ১৪ বছরের একজন কিশোর সন্তানও রয়েছে।

উত্তর

প্রথমত নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনার দ্বিধার প্রধান কারণ ওই কিশোর সন্তান কিনা। ১৪ বছর বয়সটা টিনএজ বা বয়ঃসন্ধিকাল। এই সময়ে ছেলেমেয়েরা সাধারণত একটু বিদ্রোহী বা আবেগপ্রবণ হয়। এই বয়সের একটি সন্তান তার বাবার জীবনে ‘নতুন মা’ বা ‘সঙ্গী’কে সহজে মেনে নিতে পারে না। সে কি আপনার সাথে থাকতে প্রস্তুত? নাকি সে আপনাকে ‘শত্রু’ ভাববে? কিংবা আপনি কি ভাবছেন, বিয়ের পরপরই আপনাকে একটি ১৪ বছরের সন্তানের দায়িত্ব নিতে হতে পারে। আপনি কি এখনই ‘মা’ বা ‘অভিভাবক’-এর গুরুদায়িত্ব নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত?

ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলুন, তাকে জানুন। ডিভোর্সের কারণ জানাটা জরুরি। আগের স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ কেন হলো? তার কি কোনও আচরণগত সমস্যা আছে কিনা বুঝতে চেষ্টা করুন। শুধুমাত্র মামার কথায় ভরসা না করে, নিজেরা একটু কথা বলে নিন। সমাজের বা মায়ের চাপে নয়, নিজের দিকে তাকান। আপনি কি শুধুই ‘একাকীত্ব’ দূর করতে বিয়ে করতে চাইছেন? একজন ৫০ বছর বয়সী ডিভোর্সি পুরুষের সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং তার টিনএজ সন্তানের সাথে এক ছাদের নিচে থাকা—এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মতো ধৈর্য এখন আপনার আছে তো? নাকি আপনি দিনশেষে নিজের মতো শান্তিতে থাকতে চান?

অনেক প্রশ্ন সামনে। বিয়েতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার আগে ভদ্রলোকের সাথে এবং সম্ভব হলে তার সন্তানের সাথে কয়েকবার দেখা করুন। মনে রাখবেন, ৪০ বছর মানেই জীবন শেষ নয়, বা যা জুটছে তাই মেনে নিতে হবে—এমন কোনও কথা নেই। আপনি স্বাবলম্বী, আপনার নিজের পরিচয় আছে। যদি ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে মনে হয় তিনি একজন ভালো বন্ধু হতে পারবেন এবং তার সন্তান আপনাকে সম্মান করতে প্রস্তুত, তবেই এগোনো উচিত।