‘একা, কিন্তু নিঃসঙ্গ নই’: নতুন জীবনধারায় স্বস্তি খুঁজছেন অনেক তরুণ

শুক্রবার রাত। কর্মব্যস্ত দিন শেষে ঘরে ফিরেছেন এক তরুণী। ফ্রোজেন পিজ্জা ওভেনে, পাশে তৈরি সালাদ, মোমবাতির আলো আর জানালার বাইরে নীরব প্রকৃতি। এরপর সোফায় বসে টেলিভিশন দেখতে দেখতে রাতের খাবার। অনেকের কাছে দৃশ্যটি নিঃসঙ্গতার প্রতীক মনে হতে পারে। কিন্তু লানা ইসার কাছে এটি স্বাধীনতা, স্বস্তি এবং নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ।

কানাডার টরন্টোভিত্তিক এই তরুণীর ভিডিও লাখো মানুষের নজর কেড়েছে। কারণ, তিনি এমন একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, যা অনেকেই অনুভব করলেও প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন—একা থাকা, খুব বেশি বন্ধু না থাকা এবং তবু সুখী থাকা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধীরে ধীরে এমন একদল কনটেন্ট নির্মাতা জনপ্রিয় হচ্ছেন, যারা একাকী জীবনকে করুণা নয়, বরং সচেতন জীবনযাপনের একটি ধরন হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের ভিডিওতে নেই বিলাসী জীবনযাপনের প্রদর্শনী বা অবিরাম সামাজিক ব্যস্ততা। আছে একা কফি খাওয়া, বই পড়া, নিজেই নিজের জন্য রান্না করা, একা ভ্রমণে বের হওয়া কিংবা নিজের সঙ্গ উপভোগ করার গল্প।

অনেকের ভাষায় তারা ‘লোনলিনেস ইনফ্লুয়েন্সার’। তবে এই তকমা মানতে নারাজ এসব নির্মাতা। তাদের দাবি, একা থাকা আর নিঃসঙ্গ থাকা এক বিষয় নয়। নিঃসঙ্গতা হলো অবাঞ্ছিত একাকিত্ব, আর একা থাকা হতে পারে সচেতন, স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া এবং মানসিক শান্তির একটি উপায়।

লানা ইসা বলেন, মানুষ সাধারণত বন্ধু না থাকার কথা বলতে চান না। কারণ সমাজে বিষয়টিকে এখনও বিব্রতকর হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার পর তিনি দেখেছেন, অসংখ্য মানুষ একই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তারা মন্তব্যে নিজেদের গল্প শেয়ার করছেন, একে অপরকে সাহস দিচ্ছেন।

একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের কনটেন্ট নির্মাতা ডেভন নোহরিংও। নিজেকে অন্তর্মুখী হিসেবে পরিচয় দেওয়া নোহরিংয়ের মতে, একা থাকলেই তিনি সবচেয়ে স্বস্তি অনুভব করেন। নিজের মতো সময় কাটানো তাকে মানসিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করে। তাই একা থাকাকে দুর্বলতা নয়, ব্যক্তিগত শক্তি হিসেবে দেখেন তিনি।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, একা থাকা এবং দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতা এক জিনিস নয়। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক মেলোডি ডিংয়ের ভাষায়, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। জীবনে অর্থবহ সম্পর্ক থাকা মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রত্যেকের সামাজিক চাহিদা এক নয়। কেউ বেশি মানুষের সঙ্গে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, আবার কেউ অল্প কয়েকটি সম্পর্কেই পরিপূর্ণতা খুঁজে পান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একা থাকার জীবনধারা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো ‘নিখুঁত জীবনের’ ক্লান্তি। সবসময় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ভ্রমণ কিংবা উৎসবমুখর মুহূর্তের বিপরীতে সাধারণ, নিরিবিলি জীবনও যে পরিপূর্ণ হতে পারে—এই বার্তাই মানুষকে আকৃষ্ট করছে।

এসব কনটেন্টের নির্মাতারাও বলছেন, তারা মানুষকে সম্পর্ক এড়িয়ে চলতে উৎসাহিত করছেন না। বরং বোঝাতে চাইছেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অন্য কারও উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়। নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে শেখাও মানসিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাদের বিশ্বাস, সুখের কোনো একমাত্র সংজ্ঞা নেই। কারও কাছে সেটি বন্ধুদের ভিড়ে, আবার কারও কাছে নিজের সঙ্গে কাটানো নীরব এক সন্ধ্যায়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, জীবনটা নিজের মতো করে বেছে নেওয়া

সূত্র: বিবিসি