উপসর্গ মিললেই ওষুধ নয়, ইন্টারনেট দেখে চিকিৎসা নিতে যেসব সাবধানতা অবলম্বন করবেন

অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্ট দেখে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সহজে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেলেও অনলাইনের তথ্যের ভিত্তিতে রোগ নির্ণয় ও ওষুধ গ্রহণ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ধরনের উপসর্গ একাধিক রোগের কারণে হতে পারে। ফলে অনলাইনে পাওয়া সাধারণ তথ্য দেখে নিজের রোগ নির্ণয় করলে সঠিক রোগ শনাক্ত না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে, ভুল ওষুধ বা ভুল মাত্রার ওষুধ গ্রহণের কারণে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে এবং অন্য ওষুধের সঙ্গে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। ডাব্লিউএইচও-ও ভুল আত্মনির্ণয়, চিকিৎসা নিতে দেরি, ভুল চিকিৎসা নির্বাচন, ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া এবং অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে।

অ্যান্টিবায়োটিকে বিশেষ সতর্কতা

নিজে নিজে চিকিৎসার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়টি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ কিংবা ভুল ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বাড়তে পারে।

ডাব্লিউএইচও-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের প্রায় প্রতি ছয়টির একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ দেখা গেছে।

ডাব্লিউএইচও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে, ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় এগুলো কার্যকর নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের চিত্রও উদ্বেগজনক

বাংলাদেশেও অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ডাব্লিউএইচও-এর বাংলাদেশবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়ার সুযোগ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের ঘাটতি সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এ কারণে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের প্যাকেটে লাল চিহ্ন এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করার বার্তা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনলাইনে ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও সতর্কতা

শুধু অনলাইন পরামর্শ নয়, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে। ডাব্লিউএইচও বলছে, অননুমোদিত অনলাইন ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনলে নকল, নিম্নমানের বা অনিবন্ধিত পণ্য পাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমন ওষুধ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, প্রস্তুতকারক বা বিক্রেতা অনুমোদিত কি না সেটিও নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

কী করবেন

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, অনলাইনের তথ্যকে প্রাথমিক ধারণার উৎস হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু সেটিকে চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। নতুন কোনও ওষুধ শুরু করার আগে, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক বা প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধের ক্ষেত্রে, নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

পুরোনো প্রেসক্রিপশন দেখে একই ধরনের উপসর্গে আবার ওষুধ খাওয়া, অন্যের ওষুধ নিজের জন্য ব্যবহার করা কিংবা অনলাইনে প্রচারিত কোনও চিকিৎসা-পদ্ধতি যাচাই না করে অনুসরণ করাও এড়িয়ে চলতে হবে। উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে, তীব্র হলে বা দ্রুত অবনতি ঘটলে দ্রুত যোগ্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

স্বাস্থ্যতথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ, তবে তথ্য জানা আর নিজের রোগের চিকিৎসা নিজে করা এক বিষয় নয়। সঠিক রোগ নির্ণয় ও নিরাপদ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের পরামর্শ।

 

তথ্যসূত্র:  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) — অনলাইনে ওষুধ ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত ঝুঁকি, ডাব্লিউএইচও — অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর), ডাব্লিউএইচও বাংলাদেশ — বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও সচেতনতা