যেখানে ঝগড়াও মধুর, সেই সম্পর্কের আজ বিশেষ দিন

একসঙ্গে থাকলে ঝগড়া হবে, মান-অভিমান হবে, আবার পাঁচ মিনিট পর কে চা বানাবে তা নিয়েও আলোচনা হবে। তারপরও দিন শেষে দু’জন দু’জনেরই! এমন সম্পর্কের মজাই আলাদা। আর সেই সম্পর্ককে একটু বেশি করে উদ্‌যাপন করার উপলক্ষ দম্পতি দিবস।

ভালোবাসার জন্য যে সবসময় দামি উপহার, মোমবাতির আলো কিংবা রেস্তোরাঁয় খাওয়ানোর প্রয়োজন হয়, তা নয়। কখনও একসঙ্গে বসে গল্প করা, পুরোনো ছবি দেখা কিংবা সঙ্গীর পছন্দের গানটি চালিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট। মূল কথা, ব্যস্ত জীবনে দু’জনের জন্য একটু সময় বের করা।

দম্পতি দিবসের গল্প কোথা থেকে

দু’জন মানুষের একসঙ্গে পথচলার গল্প মানবসভ্যতার মতোই পুরোনো। ধর্মীয় কাহিনিতে আদম ও হাওয়ার কথা আসে প্রাচীনতম দম্পতি হিসেবে। ইতিহাসে আবার প্রেম, রাজনীতি ও ক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ক্লিওপেট্রা ও মার্ক অ্যান্টনির সম্পর্কও বহুল আলোচিত।

১৮৪৬ সালে কবি এলিজাবেথ ব্যারেট ও রবার্ট ব্রাউনিংয়ের বিয়ের গল্পও বেশ রোমান্টিক। লেখালেখির সূত্রে পরিচয়, এরপর চিঠি চালাচালি। শেষ পর্যন্ত গোপনে বিয়ে করে ইতালিতে পাড়ি জমান তারা।

তবে সব প্রেমের গল্পে শুধু ফুল আর কবিতা ছিল না। ১৯৩৬ সালে ব্রিটেনের রাজা এডওয়ার্ড অষ্টম ভালোবাসার মানুষ ওয়ালিস সিম্পসনের জন্য সিংহাসন ছেড়ে দেন। রাজকীয় দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বেছে নেওয়ার এই ঘটনা ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ওবারগেফেল বনাম হজেস মামলার রায়ের পর দেশজুড়ে সমলিঙ্গের বিয়ের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃতি পায়। ফলে দাম্পত্য ও ভালোবাসার ধারণা নিয়েও বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা হয়।

বিখ্যাত জুটির গল্পেও আছে চমক

দম্পতি দিবসে নিজেদের সম্পর্কের পাশাপাশি ইতিহাসের আলোচিত জুটিদের গল্পও জানা যেতে পারে।

রানী ভিক্টোরিয়া ও প্রিন্স অ্যালবার্টের দাম্পত্য ছিল দীর্ঘ ২১ বছরের। অ্যালবার্টের মৃত্যুর পর তার শোকে ভিক্টোরিয়া দীর্ঘদিন কালো পোশাক পরতেন।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ও কোরেটা স্কট কিং ছিলেন শুধু জীবনসঙ্গীই নন, নাগরিক অধিকার আন্দোলনেরও সহযোদ্ধা। স্বামীর হত্যার পর কোরেটা তাঁর আদর্শ ও কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান।

আধুনিক শিল্পের জগতেও রবার্ট রাউশেনবার্গ ও জ্যাসপার জনসের সম্পর্ক আলোচিত। ব্যক্তিগত সম্পর্ক শেষ হলেও শিল্পজগতে তাঁদের প্রভাব থেকে যায়।

সঙ্গীকে চমকে দিতে পারেন যেভাবে

দম্পতি দিবসে সঙ্গীকে চমকে দিতে লাখ টাকা খরচ করার দরকার নেই। বরং ছোট্ট কিছু কাজই বেশি মনে থাকতে পারে।

আয়নার সামনে একটি ছোট্ট ভালোবাসার চিরকুট রেখে দিন। ব্যস্ততার মাঝখানে হঠাৎ ফোন করে বলুন, ‘কী করছ?’ যদিও উত্তরটা আপনি জানেন! একসঙ্গে হাঁটতে বেরিয়ে পড়ুন, প্রিয় গান শুনুন কিংবা প্রথম দেখা হওয়ার জায়গায় আবার ঘুরে আসুন।

আর যদি খুব সাহসী হন, সঙ্গীকে বলুন, ‘আজ ঝগড়ায় তুমি জিতবে!’ তবে এই ঘোষণা দেওয়ার পর কী হবে, তার দায় কিন্তু আপনার!

প্রেমের সিনেমা দেখেও কাটতে পারে দিন

ঘরে বসে সিনেমা দেখার পরিকল্পনা থাকলে দম্পতিদের গল্প নিয়ে তৈরি কয়েকটি ছবি বেছে নিতে পারেন।

‘রেডিওঅ্যাকটিভ’ (২০২০)-এ মেরি ও পিয়ের কুরির সম্পর্কের পাশাপাশি বিজ্ঞানের জগতেও তাঁদের অবদান উঠে এসেছে।

‘ওয়াক দ্য লাইন’ (২০০৫)-এ জনি ক্যাশ ও জুন কার্টারের সম্পর্কের গল্প দেখা যায়।

‘লাভিং’ (২০১৬)-এ রিচার্ড ও মিলড্রেড লাভিংয়ের বিয়ের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।

আর ‘সাউথসাইড উইথ ইউ’ (২০১৬)-তে দেখা যায় বারাক ও মিশেল ওবামার প্রথম ডেটের গল্প।

নিজেদের সম্পর্কের হিসাব নিন

দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকলে অনেক সময় মনে হয়, ‘আমরা একসঙ্গে আছি কেন?’ দম্পতি দিবস সেই প্রশ্নের সুন্দর উত্তর খোঁজারও সুযোগ।

দু’জনে বসে লিখে ফেলতে পারেন, সঙ্গীর কোন বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লাগে, কোন স্মৃতিটি সবচেয়ে প্রিয় এবং কেন একসঙ্গে থাকাটা জীবনকে সুন্দর করে।

তবে তালিকা করতে গিয়ে সঙ্গীর বদভ্যাসের তালিকা বানিয়ে ফেলবেন না। আজকের দিনটি অভিযোগ জানানোর নয়!

গানেই ফিরে আসুক পুরোনো দিন

দু’জনের সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গান নিয়ে বানিয়ে ফেলুন নিজেরাই একটি ভালোবাসার তালিকা। পুরোনো দিনের গান থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের গান সবই থাকতে পারে সেখানে।

শুনতে পারেন স্টিল দ্য ওয়ান’, ‘হোয়েন আ ম্যান লাভস আ ওম্যান’, ‘লেটস স্টে টুগেদার’ কিংবা এড শিরানের ‘থিংকিং আউট লাউড’। আর যদি দু’জনের আলাদা পছন্দ হয়, তাহলে দুই পক্ষের গানই রাখুন, এটাই তো দাম্পত্যের গণতন্ত্র!

দম্পতি দিবস আসলে ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটানোর অজুহাত। উপহার থাকলে ভালো, ফুল থাকলে আরও ভালো। কিন্তু সবকিছুর আগে দরকার আন্তরিকতা।

কারণ দাম্পত্য জীবনে সবচেয়ে দামি উপহার হয়তো কোনো গয়না নয়—ব্যস্ত দিনের শেষে একজন আরেকজনকে বলা, ‘আমি আছি।’

তাই আজ একটু বেশি কথা বলুন, একটু বেশি হাসুন, পুরোনো স্মৃতি মনে করুন। আর ঝগড়া যদি করতেই হয়, অন্তত আজকের দিনটা শেষ হওয়ার আগে কে আগে ‘সরির’ বলবে সেটাও ঠিক করে রাখুন!