যুদ্ধ, সংঘাত, দুর্ভিক্ষ, রোগব্যাধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ নানা সংকটে দিন কাটান। তাদের পাশে দাঁড়াতে নিজের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে উপেক্ষা করে কাজ করে যাচ্ছেন হাজারো মানবিক সহায়তাকর্মী। কারও হাতে থাকে ত্রাণ, কেউ চিকিৎসা দেন, কেউ আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করেন, আবার কেউ যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেন একটু আশার বার্তা। অনেক সময় মানবতার সেবায় নিয়োজিত এসব মানুষকেও জীবন দিতে হয়।
এই সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের স্মরণ এবং তাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই প্রতি বছর ১৯ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব মানবিকতা দিবস। দিবসটি শুধু মানবিক সহায়তাকর্মীদের সম্মান জানানোর দিন নয়, বরং বিশ্বের অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও মনে করিয়ে দেয়।
মানবতার জন্য এক দিন
বিশ্ব মানবিকতা দিবস আমাদের শেখায়, মানবিকতা কোনও নির্দিষ্ট দেশ, ধর্ম বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানুষ বিপদে পড়ুক, তার পাশে দাঁড়ানোই মানবতার প্রকৃত পরিচয়।
দারিদ্র্য ও রোগব্যাধিতে জর্জরিত অঞ্চল কিংবা যুদ্ধ ও সহিংসতায় বিপর্যস্ত জনপদে মানবিক সহায়তাকর্মীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। তাদের লক্ষ্য একটাই, বিপদে পড়া মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব করা এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করা।
কীভাবে দিবসটি পালন করা যায়
বিশ্ব মানবিকতা দিবস পালনের সবচেয়ে বড় উপায় হলো মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। এর শুরু হতে পারে নিজের চারপাশ থেকে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া সবই মানবিকতার চর্চা।
একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পর্কে জানা এবং সেসব এলাকার সাধারণ মানুষের দুর্দশা সম্পর্কে সচেতন হওয়াও জরুরি। কারণ যুদ্ধের ক্ষতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সবচেয়ে বড় শিকার হন সাধারণ মানুষ শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসহায় পরিবারগুলো।
বন্ধু, সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়াও হতে পারে দিবসটি পালনের একটি কার্যকর উপায়। সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ, খাদ্য, পোশাক কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করার পাশাপাশি কাউকে স্বেচ্ছাসেবী কাজে উৎসাহিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
যে আত্মত্যাগ স্মরণ করায় এই দিবস
বিশ্ব মানবিকতা দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ব্রাজিলীয় কূটনীতিক ও মানবিক সহায়তাকর্মী সার্জিও ভিয়েরা দে মেলোর নাম। জাতিসংঘের হয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করেছেন এবং প্রায় তিন দশক ধরে সশস্ত্র সংঘাতের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে জাতিসংঘের সদর দফতরে ভয়াবহ বোমা হামলায় সার্জিও ভিয়েরা দে মেলোসহ ২২ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হন। তাদের স্মরণে পরবর্তীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে বিশ্ব মানবিকতা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সার্জিওর কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সচেতনতা সৃষ্টি। তিনি মনে করতেন, যুদ্ধের গল্প শুধু যোদ্ধাদের মৃত্যু কিংবা সরকারগুলোর সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। ঘর হারানো, প্রিয়জন হারানো, খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট কিংবা নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে তাদের প্রতিদিন বেঁচে থাকতে হয়।
মানবিকতার ডাক
বিশ্ব মানবিকতা দিবস তাই কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার একটি আহ্বান। পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ চলছে, কোথাও মানুষ ক্ষুধার্ত, কোথাও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এ বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সার্জিও ভিয়েরা দে মেলো এবং তার মতো হাজারো মানবিক সহায়তাকর্মীর আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবতার জন্য কাজ করতে সবসময় বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই। একটি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনের সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া কিংবা অন্যকে মানবিক কাজে উৎসাহিত করাও হতে পারে বড় পরিবর্তনের সূচনা।
মানবিকতা বেঁচে থাকুক মানুষের কাজে, সহমর্মিতায় এবং একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে এই হোক বিশ্ব মানবিকতা দিবসের প্রত্যাশা।