বুলিং নয়, বন্ধুত্বই হোক স্কুলের ভাষা

একটি নিরাপদ স্কুল শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, এটি এমন একটি পরিবেশ, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী সম্মান, সহমর্মিতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে। কিন্তু বুলিং বা হয়রানি সেই নিরাপদ পরিবেশকে নষ্ট করতে পারে। তাই বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি, শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে অস্ট্রেলিয়ায় আয়োজন করা হয় হয়রানি প্রতিরোধ সপ্তাহ।

এই বার্ষিক উদ্যোগ অস্ট্রেলিয়ার স্কুল, শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোকে একত্রিত করে বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করে। একই সঙ্গে তরুণদের বুলিং চিনতে, এর ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে এবং এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে কার্যকরভাবে পদক্ষেপ নিতে হয়, তা শেখানো হয়।

কীভাবে পালন করা যায়

হয়রানি প্রতিরোধ সপ্তাহকে শুধু সচেতনতামূলক বক্তব্য বা আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নানা সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে উদ্‌যাপন করা যায়। এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবার ও পুরো স্কুল-সম্প্রদায়কে একসঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি সদয়তা ও সহমর্মিতার চর্চা বাড়াতে সাহায্য করে।

সদয়তার দেয়াল তৈরি করুন

শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা যেতে পারে, যেন তারা ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক বার্তা লিখে স্কুলের একটি ‘সদয়তার দেয়াল’-এ লাগায়। এসব বার্তা মন খারাপ করা কোনও শিক্ষার্থীকে সাহস জোগাতে পারে, আবার সবাইকে একে অপরের প্রতি সদয় হওয়ার কথাও মনে করিয়ে দিতে পারে।

দেয়ালজুড়ে ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সমর্থনের বার্তা তুলে ধরার মাধ্যমে বোঝানো যায় এই স্কুলে সদয়তা, সম্মান ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

‘বুলিংমুক্ত অঞ্চল’ অঙ্গীকার

শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অঙ্গীকার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে তারা অন্যদের সঙ্গে সম্মান, ভদ্রতা ও সহমর্মিতার সঙ্গে আচরণ করার প্রতিশ্রুতি দেবে।

অংশগ্রহণকারীদের ‘বুলিংমুক্ত অঞ্চল’ লেখা ব্যাজ বা হাতের ব্যান্ড দেওয়া যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হবে এবং তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পাশাপাশি স্কুলে ইতিবাচক ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত হবে।

সদয়তার শৃঙ্খল তৈরি করুন

বিভিন্ন রঙের কাগজের ফিতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করে তাতে ইতিবাচক বার্তা, সদয় আচরণের কথা কিংবা বুলিং প্রতিরোধের লক্ষ্য লিখতে বলা যেতে পারে।

এরপর ফিতাগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত করে তৈরি করা যায় দীর্ঘ ‘সদয়তার শৃঙ্খল’। স্কুলের করিডোর বা অন্য কোনো দৃশ্যমান স্থানে এটি সাজিয়ে রাখা যেতে পারে। এই শৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে ঐক্য, সহযোগিতা এবং বুলিংয়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ানোর প্রতীক।

বুলিংবিরোধী গল্প শোনার আয়োজন

শিক্ষার্থীদের বয়স উপযোগী এমন গল্প পড়ে শোনানো যেতে পারে, যেখানে বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা, সম্মান এবং বুলিংয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিষয়গুলো উঠে আসে।

গল্প শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করলে তারা চরিত্রগুলোর আচরণ নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি স্কুলে আরও সদয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে তারা কী ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়েও ভাবতে পারবে।

বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কার্যক্রম অন্যের অনুভূতি বোঝা, সহানুভূতিশীল হওয়া এবং ভালো আচরণের গুরুত্ব উপলব্ধিতে সহায়ক হতে পারে।

সদয়তার সেরা উদাহরণদের স্বীকৃতি

যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত সদয়তা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আচরণের উদাহরণ তৈরি করে, তাদের বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে।

সনদপত্র, ছোট উপহার কিংবা অভিনন্দনের মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা হলে তারা নিজেদের কাজের জন্য মূল্যায়িত বোধ করবে। একই সঙ্গে অন্য শিক্ষার্থীরাও ইতিবাচক আচরণ অনুসরণে উৎসাহ পাবে।

‘সদয়তার সেরা উদাহরণ’ হিসেবে শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি দেওয়া তাদের মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি স্কুলে ইতিবাচক, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণের একটি সুন্দর মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।

এক দিনের কর্মসূচি থেকে এক সপ্তাহ

অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রধান বুলিং ও সহিংসতাবিরোধী কর্মসূচিটি প্রথমে ‘বুলিং ও সহিংসতার বিরুদ্ধে জাতীয় কর্মদিবস’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১১ সালে ‘বুলিং। না!’ উদ্যোগের মাধ্যমে এটি শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্কুলগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করা।

২০২৪ সালে কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। এক দিনের আয়োজনকে রূপ দেওয়া হয় পুরো এক সপ্তাহের কর্মসূচিতে, যা সোমবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চলে। একই সঙ্গে এর নাম পরিবর্তন করে ‘বুলিংকে না বলার সপ্তাহ’ বা ‘বুলিংকে না: জাতীয় কর্মসূচির সপ্তাহ’ করা হয়।

এই পরিবর্তনের ফলে বুলিং প্রতিরোধে শুধু একটি দিনের পরিবর্তে পুরো সপ্তাহজুড়ে সচেতনতা, আলোচনা ও নানা কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি হয়।

সম্মিলিত উদ্যোগেই পরিবর্তন

অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা কর্তৃপক্ষগুলোর সমর্থনে পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে স্কুলগুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধি, সহযোগিতা এবং পুরো সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে বুলিং মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন উপকরণ ও সহায়তা দেওয়া হয়।

প্রতি বছর এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী স্কুলের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২২ সালেই ৬ হাজারের বেশি স্কুল এতে অংশ নিয়েছিল। বিভিন্ন বছরের কর্মসূচিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং একসঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

এর মূল বার্তা হলো বুলিং প্রতিরোধ শুধু কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। পরিবার, স্কুল, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পুরো সম্প্রদায় একসঙ্গে কাজ করলেই নিরাপদ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি

হয়রানি প্রতিরোধ সপ্তাহের অন্যতম লক্ষ্য হলো তরুণদের বুলিং শনাক্ত করা, প্রতিরোধ করা এবং বুলিংয়ের ঘটনা ঘটলে যথাযথভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম করে তোলা। পাশাপাশি তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা হয় বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল বড়দের সঙ্গে কথা বলতে, বুলিংয়ের ঘটনা জানাতে এবং প্রয়োজনে সহপাঠীদের পাশে দাঁড়াতে। কারণ একটি ছোট ইতিবাচক পদক্ষেপও কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু একটি সপ্তাহ পালন নয়। বরং এমন একটি স্কুল সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যার প্রভাব সারা বছর ধরে থাকে। যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজেকে নিরাপদ, মূল্যবান, সম্মানিত ও সমর্থিত মনে করে।

বুলিংমুক্ত পরিবেশ গড়ার কাজ তাই শুধু শিক্ষকদের নয়, শুধু পরিবারেরও নয়। সবার সম্মিলিত সদয়তা, সাহস ও সহযোগিতাই পারে একটি নিরাপদ স্কুল এবং আরও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে।