বর্ষা এলেই শুধু বৃষ্টি নামে না, অনেকের কাছে যেন শুরু হয় চুল পড়ার মৌসুমও। বৃষ্টির পানির সঙ্গে বাড়তি আর্দ্রতা, খুশকি আর স্ক্যাল্পের নানা সমস্যাকে চুল পড়ার জন্য দায়ী মনে করেন অনেকে। কিন্তু সত্যিই কি বর্ষার কারণেই বেশি চুল পড়ে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সম্প্রতি হেয়ার-হেলথ বিশেষজ্ঞ ও ট্রায়ার সহপ্রতিষ্ঠাতা সালোনি আনন্দের সঙ্গে কথা বলেছেন অভিনেত্রী সোহা আলী খান। আলোচনায় উঠে এসেছে বর্ষায় চুল পড়ার প্রকৃত কারণ, কতটা চুল পড়াকে স্বাভাবিক বলা যায় এবং কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বর্ষা কি সরাসরি চুল পড়ায়?
বিশেষজ্ঞের মতে, বর্ষা নিজে সরাসরি চুল পড়ার কারণ নয়। তবে এ সময় বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকের খুশকি ও স্ক্যাল্পের অন্যান্য সমস্যা বাড়তে পারে। আর এসব সমস্যা চুল পড়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
অনেকেই শহর বদলানো বা পানির মান পরিবর্তনকেও চুল পড়ার কারণ মনে করেন। তবে বিশেষজ্ঞের মতে, শুধু পানিকে দায়ী করার আগে জীবনযাপনের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। নতুন জায়গায় যাওয়া, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, বাইরে বেশি খাওয়া কিংবা নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপ এসব বিষয়ও চুল পড়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।
আজ যে চুল পড়ছে, তার গল্প শুরু তিন মাস আগে
চুল পড়া নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো আজ যে চুলটি পড়ছে, সেটির জীবনচক্রের পরিবর্তন শুরু হতে পারে কয়েক মাস আগেই।
সালোনি আনন্দের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চুলের একটি স্বাভাবিক বৃদ্ধি-চক্র রয়েছে। দীর্ঘ সময় বৃদ্ধির পর্যায়ে থাকার পর চুল ধীরে ধীরে এমন একটি পর্যায়ে যায়, যখন সেটি ফলিকল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শেষ পর্যন্ত ঝরে পড়ে। এই পর্যায়কে টেলোজেন পর্যায় বলা হয়।
তাই কয়েক মাস আগে কেউ অসুস্থ হয়ে থাকলে, অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকলে, পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে কিংবা দ্রুত ওজন কমানোর ডায়েট করলে তার প্রভাব পরে চুল পড়ার মাধ্যমে দেখা দিতে পারে।
অর্থাৎ, চুল পড়তে দেখেই সাম্প্রতিক কোনও ঘটনা যেমন নতুন শ্যাম্পু ব্যবহার, পানির পরিবর্তন কিংবা বর্ষার আবহাওয়াকে দায়ী করা সবসময় ঠিক নয়।
কতটা চুল পড়া স্বাভাবিক?
প্রতিদিন কিছু চুল ঝরে পড়া স্বাভাবিক। কারণ পুরোনো চুলের জায়গায় নতুন চুল গজানোর প্রক্রিয়া শরীরের স্বাভাবিক ব্যবস্থারই অংশ।
তাই হঠাৎ কয়েকদিন বেশি চুল ঝরতে দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং চুল পড়ার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো, সাময়িক চুল পড়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে কিছুটা সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। টেলোজেন ধরনের চুল পড়া অনেক সময় নিজে থেকেই কমে যেতে পারে।
শ্যাম্পু বদলালেই কি সমাধান?
চুল পড়া শুরু হলেই অনেকের প্রথম কাজ হয় শ্যাম্পু বদলে ফেলা। কিন্তু বিশেষজ্ঞের মতে, চুল পড়ার প্রকৃত কারণ বুঝতে হলে শুধু শ্যাম্পু বা পানির দিকে তাকালে হবে না।
বরং গত কয়েক মাসে নিজের শরীর ও জীবনযাপনে কী পরিবর্তন ঘটেছে, সেটি মনে করা জরুরি। অসুস্থতা, মানসিক চাপ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন কিংবা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো বিষয় চুলের স্বাভাবিক চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন?
সাময়িকভাবে চুল পড়া শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কয়েক মাস ধরে চুল পড়া অব্যাহত থাকলে বা সমস্যা কমার বদলে বাড়তে থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সোহা আলী খান ও সালোনি আনন্দের আলোচনার মূল বার্তাটি তাই বেশ পরিষ্কার—চুল পড়লেই বর্ষা, পানি কিংবা শ্যাম্পুকে দায়ী না করে সমস্যাটির পেছনের কারণ খুঁজে দেখা দরকার।
বর্ষার আর্দ্রতা হয়তো স্ক্যাল্পের কিছু সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু মাথার চুল ঝরার পুরো দায় বর্ষার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। অনেক সময় আজকের চুল পড়ার উত্তর লুকিয়ে থাকে কয়েক মাস আগের জীবনযাপনেই।
সূত্র: এনডিটিভি