ডায়েট না করেও ওজন কমানোর ৯ কৌশল

ওজন কমাতে গেলেই ভাত বন্ধ, পছন্দের খাবারে নিষেধাজ্ঞা কিংবা দিনের পর দিন না খেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে কাজে দেয় এমন খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত খাবার এবং নিয়মিত শরীরচর্চাই হতে পারে বেশি টেকসই পথ। স্বাস্থ্যকর ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনার পরামর্শই দেওয়া হয়। বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সপ্তাহে প্রায় ১–২ পাউন্ড ওজন কমানোকে স্বাস্থ্যকর লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়।

পুষ্টিবিদ নেহার অভিজ্ঞতায়ও ছিল এমনই কিছু ছোট পরিবর্তন। তার দাবি, কঠোর ডায়েট না করেও তিন মাসে প্রায় ২২ কেজি ওজন কমিয়েছেন তিনি। তবে এই ধরনের দ্রুত ওজন কমানোর অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে একই ফল দেবে এমন নয়। কারও ওজন কমানোর প্রয়োজন আছে কি না এবং কোন পদ্ধতি নিরাপদ, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা। তাই বিশেষ করে দ্রুত ওজন কমানোর পরিকল্পনা থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সকাল শুরু হোক পানি দিয়ে

ঘুম থেকে উঠে পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। কেউ কেউ লেবু, জিরে, মেথি বা মৌরি মেশানো পানীয় দিয়ে দিন শুরু করেন। তবে এগুলোকে ‘ডিটক্স’ পানীয় হিসেবে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়ার প্রমাণিত উপায় ভাবা ঠিক নয়। ওজন কমানোর মূল ভিত্তি হলো সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তা।

তিন বেলার খাবারে রাখুন ভারসাম্য

বারবার অল্প অল্প করে খাওয়ার বদলে নিজের দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পরিমিত খাবার খেতে পারেন। ভাত, ডাল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম সবই খাদ্যতালিকায় থাকতে পারে। মূল বিষয় হলো পরিমাণ ও খাবারের সামগ্রিক পুষ্টিমান।

ভাতকে একেবারে শত্রু ভাববেন না

ওজন কমানোর জন্য ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়া জরুরি নয়। বরং প্লেটে ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে তার সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, ডাল ও প্রোটিন রাখুন। পছন্দের খাবার একেবারে বাদ না দিয়ে পরিমিত খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ হতে পারে।

ভালো ফ্যাটও খাবারে থাকুক

ঘি, বাদাম, বীজের মতো ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবারও সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে এগুলো ক্যালোরি-সমৃদ্ধ হওয়ায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। ‘স্বাস্থ্যকর’ মানেই ইচ্ছেমতো খাওয়া যায় এমন নয়।

টক দই হতে পারে ভালো সংযোজন

চিনি ছাড়া টক দই খাবারের সঙ্গে রাখতে পারেন। এতে প্রোটিন থাকে এবং অনেক ধরনের দইয়ে উপকারী ব্যাকটেরিয়াও থাকতে পারে। তবে বাজারের দই কিনলে লেবেলে যোগ করা চিনির পরিমাণ দেখে নেওয়া ভালো।

খাবারের পর একটু হাঁটুন

খাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ বসে বা শুয়ে না থেকে হালকা হাঁটার অভ্যাস করা যেতে পারে। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ওজন কমানোর সময় পেশি ধরে রাখতেও সহায়তা করতে পারে।

‘চিট ডে’-র বদলে ৮০/২০ ভাবনা

সপ্তাহের বেশির ভাগ সময় পুষ্টিকর খাবার এবং বাকি সময়ে পছন্দের খাবার পরিমিতভাবে খাওয়ার ধারণা অনেকের জন্য বাস্তবসম্মত হতে পারে। তবে ৮০/২০ নিয়ম কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্ধারিত ওজন কমানোর সূত্র নয়। ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ও ধরন ঠিক করাই গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাপল সাইডার ভিনিগার নিয়ে সতর্ক থাকুন

খাবারের আগে অ্যাপল সাইডার ভিনিগার মেশানো পানি খেলে ওজন দ্রুত কমবে বা অতিরিক্ত ক্যালোরি ‘ঝরে যাবে’ এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। তাই এটিকে ওজন কমানোর শর্টকাট হিসেবে না দেখে, চাইলে খাবারের অংশ হিসেবেই সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে নিয়মিত ওষুধ খেলে বা কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

প্লেটে রাখুন রঙিন ও পুষ্টিকর খাবার

শাকসবজি, ফল, মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজ থেকে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট পেতে পারে। ‘অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি’ খাবারের নামে কোনো নির্দিষ্ট খাবারকে ওজন কমানোর জাদুকাঠি ভাবার প্রয়োজন নেই। বরং বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাবারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টেকসই অভ্যাস। দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় ডিটক্স, ‘ফ্যাট বার্নার’ বা অপ্রমাণিত ওজন কমানোর সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। অনেক এমন পণ্যের কার্যকারিতা প্রমাণিত নয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

ভাত বা ঘি একেবারে বাদ দেওয়ার চেয়ে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাবার, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম এই অভ্যাসগুলোই দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণের বেশি বাস্তবসম্মত পথ।