হোটেলে উঠলে অনেকেই ভাবেন, টাকা দিয়ে যেহেতু সেবা কিনছেন, তাই কিছুটা বাড়তি স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু হোটেলের অতিথি হওয়া মানেই ইচ্ছেমতো আচরণ করার অধিকার পাওয়া নয়। বরং অন্য অতিথি ও কর্মীদের প্রতি কিছু মৌলিক শিষ্টাচার মেনে চলাই ভালো।
ব্রিটিশ শিষ্টাচার বিশেষজ্ঞ ও সেন্ট্রাল লন্ডনের দ্য ইংলিশ ম্যানার ইনস্টিটিউটের পরিচালক উইলিয়াম হ্যানসন মনে করেন, হোটেলে মানুষ এমন কিছু আচরণ করেন, যা নিজের বাড়িতে কখনোই করতেন না। তাঁর মতে, হোটেলকে শুধু একটি ‘লেনদেনের জায়গা’ হিসেবে দেখার কারণেই এমনটা ঘটে।
হোটেলে থাকার সময় কী করবেন, আর কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলবেন হ্যানসনের পরামর্শে দেখে নেওয়া যাক।
১. কর্মীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবেন না
চেক-ইন করতে দেরি হচ্ছে, ঘর প্রস্তুত নয় কিংবা কোনও সেবা ঠিকমতো পাওয়া যায়নি এমন পরিস্থিতিতে বিরক্ত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিরক্তি কর্মীদের ওপর প্রকাশ করা শিষ্টাচারসম্মত নয়।
হ্যানসনের মতে, হোটেলের কর্মীরাও মানুষ এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা উচিত। কোনও সমস্যা হলে সেটি সরাসরি জানাতে হবে, তবে ভদ্রভাবে। ‘আমার ঘর এখনও পরিষ্কার করা হয়নি, অথচ সন্ধ্যা ৬টা বাজে’ এভাবে সমস্যাটি জানানো যায়। কিন্তু রাগ দেখানো বা কর্মীদের অপমান করার কোনও কারণ নেই।
ভদ্র থাকা মানে নিজের অধিকার ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের অসন্তোষও দৃঢ়ভাবে, কিন্তু সম্মানের সঙ্গে জানানো যায়।
২. আপগ্রেড চাইলে আগে ভালো ব্যবহার করুন
হোটেলে বিনা খরচে রুম আপগ্রেড পাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবে কর্মীদের সঙ্গে আপনার আচরণ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
হ্যানসনের মতে, লয়্যালটি বা রিওয়ার্ড প্রোগ্রামের সদস্য হলে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি একজন অতিথি হিসেবে ভদ্র ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
চেক-ইনের সময় দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হলেও কর্মীদের দিকে রাগী চোখে তাকানো বা বিরক্তি প্রকাশ করা ভালো ফল দেবে না। বরং ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করুন।
৩. কর্মীদের নাম ধরে ডাকুন
হোটেলের কর্মীদের নামের ব্যাজ থাকার কারণ আছে। তাই সম্ভব হলে তাদের নাম ধরে সম্বোধন করুন।
কেউ যদি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, “আমার নাম উইলিয়াম, আজ আমি আপনার কনসিয়ার্জ” তাহলে নামটি মনে রাখুন এবং পরে নাম ধরে ডাকুন।
হ্যানসনের মতে, এতে কর্মীরা বুঝতে পারেন যে অতিথি তাদের শুধু একটি ‘সেবা দেওয়ার ব্যক্তি’ হিসেবে দেখছেন না, একজন মানুষ হিসেবেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে তারাও অতিথির জন্য বাড়তি কিছু করার আগ্রহ দেখাতে পারেন।
হ্যানসন নিজেও যেসব হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নিয়মিত যান, সেখানকার কর্মীদের নাম ফোনে লিখে রাখেন। পরেরবার যাওয়ার আগে তিনি সেই তালিকাটি দেখে নেন।
৪. ভালো সেবার প্রশংসা করুন
হোটেল নিয়ে রিভিউ লিখতে গেলে শুধু অভিযোগ করাই উচিত নয়। ভালো অভিজ্ঞতার কথাও জানানো দরকার।
হ্যানসনের মতে, কোনও সমস্যা হলে মানুষ বাড়ি ফিরে দ্রুত নেতিবাচক রিভিউ লিখতে চান। কিন্তু ভালো সেবা পাওয়ার পর সেটি লিখে জানানোর প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম।
অথচ একজন কর্মী যদি বিশেষভাবে সহযোগিতা করেন, কোনও পরিবারের সদস্যের জন্য বাড়তি ব্যবস্থা করেন কিংবা নাশতায় অসাধারণ কিছু পরিবেশন করেন, সেটিও রিভিউতে উল্লেখ করা যেতে পারে।
হ্যানসনের যুক্তি, কোনও হোটেলের ১০টি নেতিবাচক রিভিউ থাকলেও হয়তো তার বিপরীতে ১০০টি ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেগুলো কেউ লিখে জানাননি। তাই ভালো সেবা পেলে ধন্যবাদ জানানো বা ইতিবাচক রিভিউ দেওয়াও অতিথির শিষ্টাচারের অংশ।
৫. হোটেলের করিডোরে চুপচাপ থাকুন
হোটেলের করিডোরকে নিজের বাড়ির বসার ঘর মনে করবেন না। সেখানে উচ্চস্বরে কথা বলা, চিৎকার করা কিংবা দৌড়াদৌড়ি করা অন্য অতিথিদের বিরক্ত করতে পারে।
হ্যানসনের মতে, হোটেলে সবাই রাতে ঘুমান না। কেউ রাতভর কাজ করে দিনের বেলা ঘুমাতে পারেন। তাই করিডোরে সব সময় নীরবতা বজায় রাখা উচিত।
বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করলে করিডোরে দৌড়াদৌড়ি বা চিৎকার না করার বিষয়টি অভিভাবকদের খেয়াল রাখা দরকার।
হ্যানসনের ভাষায়, হোটেলের করিডোর হওয়া উচিত ‘ক্যাথেড্রালের মতো শান্ত’। কারণ দরজার ওপাশে থাকা অতিথি কী করছেন বা কেন বিশ্রাম নিচ্ছেন, তা আপনি জানেন না।
৬. সব হোটেল সামগ্রী বাড়িতে নিয়ে যাবেন না
হোটেলের ছোটখাটো অ্যামেনিটিজ দেখে অনেকেরই সেগুলো সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা হয়। তবে কোনটি নেওয়া যায় আর কোনটি নেওয়া চুরি সেটি বোঝা জরুরি।
কটন প্যাড, নখের ফাইল কিংবা ছোট সেলাইয়ের কিটের মতো ডিসপোজেবল সামগ্রী সাধারণত নেওয়া যায়। হোটেলের স্লিপারও অনেক ক্ষেত্রে অতিথিরা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন।
কিন্তু হেয়ার ড্রায়ার, তোয়ালে, বেডিং বা বাথরোব নিয়ে চলে যাওয়া উচিত নয়।
এ ছাড়া অনেক হোটেল এখন পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থায় দেয়ালে স্থায়ী শ্যাম্পু, কন্ডিশনার বা বডি ওয়াশের বোতল ব্যবহার করছে। এগুলো অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য নয়।
৭. লাগেজ নিয়ে অযথা সংকোচ করবেন না
ভালো মানের হোটেলে কনসিয়ার্জ, পোর্টার বা বেলবয়দের অন্যতম কাজ হলো অতিথিদের লাগেজ বহনে সহায়তা করা। তাই নিজের ভারী স্যুটকেস নিয়ে হোটেলের দীর্ঘ করিডোর ধরে টানতে টানতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
চেক-আউটের আগে ফোন করে কর্মীদের ডেকে নেওয়া যায়। যেমন, “আমরা ১৫ মিনিটের মধ্যে চেক-আউট করব, কেউ কি এসে আমাদের লাগেজ নিয়ে যাবেন?”
হ্যানসনের মতে, অনেক অতিথি অযথা সংকোচ করেন। ভাবেন, কাউকে ডেকে লাগেজ বহন করানো হয়তো বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু এটি হোটেলেরই একটি সেবা। আপনি যে মূল্য দিচ্ছেন, তার বিনিময়ে এই সুবিধা নেওয়াতে কোনও সমস্যা নেই।
তবে নিজের লাগেজ নিজে বহন করলেও সেটি শিষ্টাচারবিরোধী নয়। মূল কথা হলো, হোটেলের কর্মীদের সাহায্য নিতে সংকোচ না করা এবং অন্য অতিথিদের অসুবিধা না করা।
ভদ্র অতিথি হওয়ার সহজ নিয়ম
হোটেলে ভালো অতিথি হওয়ার জন্য আলাদা কোনও জটিল নিয়ম নেই। কর্মীদের সম্মান করা, নিজের সমস্যা ভদ্রভাবে জানানো, অন্য অতিথিদের বিশ্রামের কথা মাথায় রাখা এবং হোটেলের সম্পত্তির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াই যথেষ্ট।
হ্যানসনের পরামর্শের মূল কথাটিও সেখানেই হোটেলে টাকা দিয়ে সেবা নেওয়া যায়, কিন্তু ভদ্রতা কেনা যায় না। সেটি নিজের আচরণেই দেখাতে হয়।