পানি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দীর্ঘ সময়ের শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মিঠাপানির ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে দৈনন্দিন জীবনে পানির অপচয় কমানও এখন শুধু অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় নয়, পরিবেশ রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সরবরাহ করা পানির প্রায় ৫৯ শতাংশই ব্যবহার করে পরিবারগুলো। গড়ে একজন মানুষ প্রতিদিন ১৩৬ লিটার পানি ব্যবহার করেন। ফলে প্রত্যেকে যদি দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনেন, সম্মিলিতভাবে তার প্রভাব হতে পারে অনেক বড়।
বাড়িতে পানির ব্যবহার কমাতে সহজেই অনুসরণ করতে পারেন এই ১০টি কৌশল।
১. গোসলের সময় চার মিনিটে নামিয়ে আনুন
বাথটাবের তুলনায় শাওয়ারে সাধারণত কম পানি লাগে। তবে দীর্ঘ সময় শাওয়ারের নিচে থাকলে সেই সাশ্রয় আর থাকে না। তাই গোসল চার মিনিটের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করুন।
চার মিনিট শাওয়ার চালালে প্রায় ৫০ লিটার পানি খরচ হতে পারে, যেখানে সাধারণ একটি বাথটাবে লাগে প্রায় ৮০ লিটার। সময় মেনে চলতে চার মিনিটের টাইমার বা পছন্দের ছোট কোনও গান ব্যবহার করতে পারেন। সাবান বা শ্যাম্পু মাখার সময় শাওয়ার বন্ধ রাখলেও পানি সাশ্রয় হবে।
২. দাঁত ব্রাশের সময় কল বন্ধ রাখুন
দাঁত ব্রাশ করার সময় কল খোলা থাকলে প্রতি মিনিটে ৯ লিটার পর্যন্ত পানি নষ্ট হতে পারে। প্রতিদিনের এই ছোট্ট অপচয় এক বছরে গিয়ে দাঁড়াতে পারে হাজার হাজার লিটারে। তাই ব্রাশ করার সময় কল বন্ধ রাখুন। কুলি করার সময় যতটুকু দরকার, ততটুকুই পানি ব্যবহার করুন।
৩. ডিশওয়াশার চালান ‘ইকো মোডে’
হাতে বাসন ধোয়ার চেয়ে ডিশওয়াশারে পানি বেশি লাগে এমনটা মনে হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো। ডিশওয়াশারে প্রতি প্লেস সেটিংয়ে এক লিটারেরও কম পানি লাগতে পারে, যেখানে হাতে ধুলে প্রায় ৪ দশমিক ৫ লিটার পর্যন্ত পানি খরচ হয়।
তবে পানি সাশ্রয়ের জন্য মেশিনটি পুরো ভর্তি করে চালানো ভালো। বাসনের উচ্ছিষ্ট পানিতে ধুয়ে ফেলার বদলে আগে ঝেড়ে ফেলুন। আর ‘ইকো মোড’ থাকলে সেটি ব্যবহার করুন।
৪. কল থেকে পানি পড়ছে কি না দেখুন
টুপটাপ করে পড়া একটি কলও বছরে ৫ হাজার লিটারের বেশি পানি নষ্ট করতে পারে। এই পরিমাণ পানি দিয়ে প্রায় ১২৫ বার গোসল করা সম্ভব। তাই কল থেকে সামান্য পানি পড়লেও অবহেলা করবেন না। অনেক সময় ছোটখাটো মেরামতের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করা যায়।
৫. রান্নাঘরের পানি ফেলে দেবেন না
সবজি সেদ্ধ করা পানি ঠান্ডা করে বাগানের গাছপালায় ব্যবহার করতে পারেন। আবার গ্লাসে খাওয়ার পর বেঁচে যাওয়া পরিষ্কার পানিও ঘরের গাছে দেওয়া যায়। অর্থাৎ একবার ব্যবহৃত হলেই পানি ফেলে দিতে হবে এমন নয়। নিরাপদ ও উপযোগী হলে একই পানি অন্য কাজে ব্যবহার করার অভ্যাস করুন।
৬. টয়লেটের লিক পরীক্ষা করুন
টয়লেটের ছোটখাটো লিকও দিনে ২০০ থেকে ৪০০ লিটার পর্যন্ত পানি নষ্ট করতে পারে। কমোডে অনবরত পানির শব্দ, পানির ওপরিভাগে ঢেউ বা টানা পানি প্রবাহিত হতে দেখা লিকের লক্ষণ হতে পারে। সাধারণত সিস্টার্নের ভেতরের ফ্লাশ বা ফিল ভালভের সমস্যার কারণে এমনটা হয়। লিক ধরা পড়লে দ্রুত মেরামত করুন।
৭. স্মার্ট ওয়াটার মিটার ব্যবহার করুন
দিনের কোন সময় কতটা পানি ব্যবহার করছেন, তা বুঝতে স্মার্ট ওয়াটার মিটার কাজে লাগতে পারে। পানির ব্যবহার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে অপ্রয়োজনীয় খরচও সহজে চিহ্নিত করা যায়। তাই আপনার এলাকায় স্মার্ট ওয়াটার মিটার বসানোর সুযোগ এলে সেটি সম্পর্কে খোঁজ নিন।
৮. ওয়াশিং মেশিন পুরো ভর্তি করে চালান
অল্প কিছু কাপড়ের জন্য বারবার ওয়াশিং মেশিন চালাবেন না। মেশিন যথেষ্ট ভর্তি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এতে প্রতিবার ধোয়ার জন্য অপ্রয়োজনীয় পানি খরচ হবে না। মেশিনে ‘ইকো মোড’ থাকলে সেটিও ব্যবহার করুন। বেশি সময় ভিজিয়ে রাখার মাধ্যমে এই মোড তুলনামূলক কম পানি ব্যবহার করেই কাপড় পরিষ্কার করতে পারে।
৯. গাড়ি ধুতে হোস পাইপের বদলে বালতি ব্যবহার করুন
হোস পাইপ দিয়ে গাড়ি ধোয়া সহজ হলেও এতে প্রতি মিনিটে ২০ লিটার পর্যন্ত পানি খরচ হতে পারে। ফলে পুরো গাড়ি ধুতে ৩০০ লিটার পর্যন্ত পানি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর বদলে বালতি ও স্পঞ্জ ব্যবহার করুন। একটি বালতি ধোয়ার জন্য এবং আরেকটি কেবল ধুয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করলে মোট প্রায় ৩০ লিটার পানিতেই গাড়ি পরিষ্কার করা সম্ভব।
১০. বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখুন
বাগানে পানি দেওয়ার সময় স্প্রিংকলার বা হোস পাইপ চালু রাখলে ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ১ হাজার লিটার পর্যন্ত পানি খরচ হতে পারে। এর বদলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ওয়াটার বাট বা বড় পাত্র ব্যবহার করতে পারেন।
একটি সাধারণ ওয়াটার বাটে প্রায় ২০০ লিটার বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা যায়। পরে সেই পানি গাছপালায় ব্যবহার করলে একদিকে যেমন পানির অপচয় কমবে, অন্যদিকে সরবরাহ করা পানির ওপরও চাপ কমবে।
ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলো প্রতিদিনের জীবনে যুক্ত করা কঠিন নয়। কিন্তু সবাই মিলে এগুলো অনুসরণ করলে পানির অপচয় কমানোর পাশাপাশি মূল্যবান এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব।