পুরনো কাঠের আসবাবের সৌন্দর্যই আলাদা। দাদু-দিদার আমলের সেগুন কাঠের খাট, মেহগনি কাঠের আলমারি কিংবা পুরনো ড্রেসিং টেবিল এসব শুধু ঘরের আসবাব নয়, অনেক সময় পরিবারের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের আসবাবে দেখা দিতে পারে ঘুণপোকা ও অন্যান্য পোকার উপদ্রব। একবার ভেতরে পোকা বাসা বাঁধলে বাইরে থেকে আসবাবটি ঠিকঠাক দেখালেও ধীরে ধীরে কাঠের ভেতরটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তাই আসবাবে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আগেই কিছু বিষয়ে নজর রাখা জরুরি। পুরনো কাঠের আসবাব ভালো রাখার জন্য মেনে চলতে পারেন কয়েকটি সহজ নিয়ম।
১. কাঠ শুকনো রাখুন
স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ কাঠের জন্য মোটেই ভালো নয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঘরের আর্দ্রতা বেড়ে গেলে কাঠের আসবাবে পোকার উপদ্রবের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
আসবাবে পানি পড়লে সঙ্গে সঙ্গে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলুন। কাঠ পরিষ্কারের সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার না করাই ভালো। নিয়মিত ধুলো পরিষ্কার করে আসবাব শুকনো ও বাতাস চলাচল করে এমন পরিবেশে রাখুন।
২. দেয়ালের সঙ্গে একেবারে ঠেস দিয়ে রাখবেন না
আলমারি বা ভারী কাঠের আসবাব দেয়ালের সঙ্গে একেবারে লাগিয়ে রাখলে পেছনে বাতাস চলাচল কমে যায়। এতে স্যাঁতসেঁতে ভাব জমতে পারে। সম্ভব হলে আসবাব ও দেয়ালের মধ্যে সামান্য ফাঁকা রাখুন। বিশেষ করে বাইরের দেয়ালের পাশে রাখা আলমারি বা খাটের ক্ষেত্রে বিষয়টি খেয়াল করা জরুরি।
৩. ছোট ছিদ্র দেখলেই পরীক্ষা করুন
কাঠের গায়ে ছোট ছোট গোল ছিদ্র, কাঠের গুঁড়োর মতো মিহি আবর্জনা বা অস্বাভাবিক দাগ দেখা গেলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। এগুলো কাঠে পোকার উপস্থিতির লক্ষণ হতে পারে। এমন কিছু চোখে পড়লে আক্রান্ত অংশটি ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। প্রয়োজন হলে কাঠমিস্ত্রি বা পোকা নিয়ন্ত্রণে দক্ষ পেশাদারের পরামর্শ নিন।
৪. পুরনো আসবাব নিয়মিত পরীক্ষা করুন
বছরের পর বছর একই জায়গায় থাকা আসবাবের ভেতরে কী হচ্ছে, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। তাই কয়েক মাস পরপর আলমারির পেছন, নিচের অংশ, ড্রয়ার ও জোড়ার জায়গাগুলো দেখে নিন। বিশেষ করে যেসব আসবাব খুব কম নাড়াচাড়া করা হয়, সেগুলোতে নিয়মিত নজর দেওয়া জরুরি।
৫. কাঠে ফাটল বা ক্ষত তৈরি হলে দ্রুত মেরামত করুন
পুরনো কাঠে সময়ের সঙ্গে ছোট ফাটল, জোড়া আলগা হওয়া বা গর্ত তৈরি হতে পারে। এসব জায়গা অবহেলায় ফেলে রাখলে কাঠ আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ক্ষতি বেশি হলে নিজে মেরামত করার বদলে দক্ষ কারিগরের সাহায্য নিন। প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বদলে বা মেরামত করে আসবাবটিকে আবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যায়।
৬. প্রয়োজনে বার্নিশ বা উপযুক্ত কাঠের ফিনিশ ব্যবহার করুন
পুরনো কাঠের আসবাবের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে সময়ে সময়ে উপযুক্ত বার্নিশ বা কাঠের ফিনিশ ব্যবহার করা যায়। এতে কাঠের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি হতে পারে এবং আসবাবের চেহারাও সতেজ দেখায়। তবে কোনও পণ্য ব্যবহারের আগে সেটি আপনার আসবাবের কাঠ ও পুরনো ফিনিশের জন্য উপযোগী কি না নিশ্চিত হয়ে নিন।
৭. ঘুণ ধরা আসবাব আলাদা রাখুন
কোনও একটি আসবাবে পোকার উপস্থিতি নিশ্চিত হলে সেটিকে সম্ভব হলে অন্য কাঠের আসবাব থেকে কিছুটা আলাদা রাখুন। এতে সমস্যা শনাক্ত করা এবং আক্রান্ত অংশের চিকিৎসা বা মেরামত করা সহজ হবে।
ঘুণ ধরেছে মানেই প্রিয় আসবাব ফেলে দিতে হবে এমন নয়। ক্ষতির মাত্রা কম হলে অনেক ক্ষেত্রেই আক্রান্ত অংশ মেরামত করে আসবাবটি আবার ব্যবহার করা সম্ভব।
৮. রাসায়নিক ব্যবহার করার আগে সতর্ক থাকুন
ঘুণপোকা তাড়াতে বাজারে বিভিন্ন ধরনের কাঠ সংরক্ষণকারী ও কীটনাশক পাওয়া যায়। তবে সব পণ্য সব ধরনের কাঠের জন্য উপযোগী নয়। তাই যেকোনো রাসায়নিক সরাসরি আসবাবে ব্যবহার করার আগে পণ্যের নির্দেশনা পড়ুন।
ঘরের শিশু, পোষা প্রাণী বা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখুন। পোকার আক্রমণ বেশি হলে পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল সেবার সাহায্য নেওয়াই নিরাপদ।
৯. আসবাব তৈরির সময় কাঠ ভালোভাবে বেছে নিন
নতুন কাঠের আসবাব বানানোর পরিকল্পনা থাকলে শুরুতেই কাঠের মান যাচাই করুন। ভালোভাবে শুকানো ও উপযুক্ত মানের কাঠ ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। কাঠ কেনার সময় অভিজ্ঞ কারিগর বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে ভুল কাঠ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি কমে।
১০. ঘরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখুন
কাঠের আসবাব ভালো রাখতে শুধু আসবাব পরিষ্কার করলেই হবে না, ঘরের পরিবেশও খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজন হলে ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে।
মনে রাখবেন, পুরনো কাঠের আসবাবের যত্ন মানে শুধু চকচকে করে রাখা নয়। নিয়মিত পরীক্ষা, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ এবং ছোটখাটো ক্ষতি দ্রুত মেরামত করাই পারে পারিবারিক স্মৃতির এই আসবাবগুলোকে দীর্ঘদিন ভালো রাখতে।