প্রতি শীতেই দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এক উপকূলে নামে আশ্চর্য এক জলজ উৎসব। অগভীর সমুদ্রের পানিতে তখন জড়ো হয় হাজার হাজার জায়ান্ট অস্ট্রেলিয়ান কাটলফিশ। কেউ রং বদলায়, কেউ শরীরের আকৃতি পাল্টায়, আবার কেউ সঙ্গী খুঁজতে ছুটে বেড়ায়। এই অসাধারণ দৃশ্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন ডুবুরিরাও।
কোনও কোনও বছর এই সমাবেশে কাটলফিশের সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছায়। কিন্তু এবার সেই পরিচিত দৃশ্য যেন হঠাৎ করেই ফিকে হয়ে গেছে। সমুদ্রের তলদেশে নেমে ডুবুরিরা দেখেছেন, যেখানে থাকার কথা কয়েক হাজার কাটলফিশ, সেখানে দেখা মিলেছে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটির।
সরকারি হিসাবে, এ বছর প্রজননের জন্য ‘কাটলফিশ কোস্টে’ জড়ো হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮১১টি কাটলফিশ। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ৯৭ শতাংশ।
এই নজিরবিহীন পতন নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে গবেষক ও পরিবেশবিদদের মধ্যে। কারও কারও আশঙ্কা, এটি হয়তো এই অনন্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য একটি বড় সংকটের শুরু।
ডিমও নেই, নেই আগের সেই ভিড়
জায়ান্ট কাটলফিশের জীবনচক্র খুবই ছোট। পূর্ণবয়স্ক কাটলফিশ সাধারণত মাত্র ১২ থেকে ১৮ মাস বেঁচে থাকে এবং প্রজননের পর মারা যায়। ফলে প্রতিটি প্রজনন মৌসুমই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এবার সেই গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমেও আশার আলো খুবই ক্ষীণ। উপকূলজুড়ে জরিপ চালিয়ে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৪০টি ডিম পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক সময়ে এই ৮ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে কয়েক মিলিয়ন ডিম থাকার কথা।
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ ও পানি দপ্তরের হয়ে জুলাই মাসে চারজন ডুবুরি এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সংরক্ষণবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা আইরেল্যাবের পরিচালক ম্যানি কাটজ।
দুই দিন ধরে মোট আটটি এক ঘণ্টার ডাইভ করেন তাঁরা। পাথুরে প্রবালপ্রাচীরের নিচের অংশ এবং যতটা সম্ভব প্রতিটি পাথরের তলা খুঁজে দেখেন। কিন্তু এত বিস্তৃত অনুসন্ধানের পরও মাত্র ৪৪০টি ডিম পাওয়া যায়।
কাটজ বলেন, “উপকূলের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সাধারণত কয়েক মিলিয়ন ডিম থাকার কথা। আমরা যতটা সম্ভব প্রায় প্রতিটি পাথরের নিচেই খুঁজেছি। কিন্তু সব মিলিয়ে মাত্র ৪৪০টি ডিম পেয়েছি।”
তার মতে, এত কম সংখ্যক পূর্ণবয়স্ক কাটলফিশ এবং এত কম প্রজনন কার্যক্রমের অর্থ হলো, আগামী প্রজন্মে যুক্ত হওয়া কাটলফিশের সংখ্যাও খুব কম হতে পারে। ফলে পরবর্তী প্রজনন মৌসুম আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পাথরের নিচে লুকিয়ে কাটলফিশ
শুধু সংখ্যা কমেনি, কাটলফিশের আচরণেও পরিবর্তন চোখে পড়েছে। জরিপের সময় ডুবুরিরা মাত্র ডজনখানেক পূর্ণবয়স্ক কাটলফিশ দেখতে পান। অথচ সাধারণত এ সময় সেখানে কয়েক দশ হাজার কাটলফিশ থাকার কথা।
কাটজ জানান, এবার দেখা কাটলফিশগুলো ছিল অস্বাভাবিকভাবে ভীতু। তারা পাথরের নিচে লুকিয়ে থাকছিল। তাঁর ভাষায়, সংখ্যায় এত কম হওয়ায় দলবদ্ধ থাকার যে নিরাপত্তা কাটলফিশ সাধারণত পায়, এবার সেটিও তাদের নেই।
বিষাক্ত শৈবালের ছায়া
কাটলফিশের সংখ্যা এতটা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিষাক্ত শৈবাল ফুলে ওঠার ঘটনা।
জলভাগে শৈবালের সংখ্যা অস্বাভাবিক দ্রুত বেড়ে যাওয়াকে শৈবাল ফুলে ওঠা বলা হয়। এটি প্রাকৃতিকভাবেও ঘটতে পারে। তবে সমুদ্রের পানির উষ্ণতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ এবং পানিতে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান জমে যাওয়ার মতো কারণে এর তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনও এসব পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে গত বছরের মার্চে প্রথম এই বিষাক্ত শৈবালের প্রভাব শনাক্ত হয়। এরপর থেকে সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
গত বছরের কাটলফিশের প্রজনন মৌসুম অবশ্য এর প্রভাব থেকে অনেকটাই মুক্ত ছিল। তখনও শৈবাল ফুলে ওঠার প্রভাব ‘কাটলফিশ কোস্টে’ পৌঁছায়নি। তবে গত বছরের শেষ দিক থেকে ওই এলাকায় বিষাক্ত শৈবালের উপস্থিতি শনাক্ত করা হচ্ছে।
কাটলফিশের জন্য বিষয়টি আরও উদ্বেগের, কারণ অক্টোপাস ও স্কুইডের মতো অন্যান্য সেফালোপডও এই বিষাক্ত শৈবালের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
কাটজের ভাষায়, গত দেড় বছর ধরে সামুদ্রিক আবাসস্থলগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে যে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র “সত্যিই বড় ধরনের বিপদের” মধ্যে রয়েছে।
‘বিপন্ন’ তালিকায় রাখার দাবি
জায়ান্ট অস্ট্রেলিয়ান কাটলফিশের সংখ্যা এতটা কমে যাওয়ায় প্রজাতিটিকে বিপন্ন প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার দাবি উঠেছে।
গ্রেট সাদার্ন রিফ ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টেফান অ্যান্ড্রুজ মনে করেন, বিষাক্ত শৈবাল এই পতনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য কারণ। তবে তাঁর মতে, এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে কাটলফিশের পুরো পতনের জন্য শুধু এই শৈবালই দায়ী।
এত কম সংখ্যক পূর্ণবয়স্ক কাটলফিশ এবং কম প্রজনন কার্যক্রমের কারণে পরবর্তী প্রজন্মের সংখ্যাও কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সবকিছুই যে অন্ধকার, তা নয়।
অতীত দিচ্ছে আশার আলো
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রাথমিক শিল্প ও অঞ্চলবিষয়ক দফতর জানিয়েছে, পরিবেশগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে কাটলফিশের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামা করে।
আগের জরিপগুলোর তথ্যেও তার প্রমাণ মেলে। ২০১৩ সালে কাটলফিশের সংখ্যা নেমে গিয়েছিল মাত্র ১৩ হাজার ৫০০-তে। আবার ২০২০ সালে রেকর্ড করা হয়েছিল ২ লাখ ৪৭ হাজার কাটলফিশ।
আরও আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, ২০১৩ সালের নিম্নসংখ্যার মাত্র দুই বছর পরই কাটলফিশের আনুমানিক সংখ্যা আবার ১ লাখের বেশি হয়ে গিয়েছিল।
সাউথ অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মাইক স্টিয়ার এ বছরের নজিরবিহীন কম সংখ্যাকে ‘হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে আশাবাদী।
তাঁর মতে, পরিবেশ অনুকূল হলে এই জনসংখ্যার আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে। এবারও কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে পূর্ণবয়স্ক কাটলফিশ এখনও ডিম পাড়ছে।
ফলে আগামী কয়েক বছরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকেরা।
সামনে কঠিন সময়
তবে এই আশার পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে। চলতি প্রজনন মৌসুমে মাত্র ৪৪০টি ডিম পাওয়া গেছে। পূর্ণবয়স্ক কাটলফিশের সংখ্যাও অস্বাভাবিকভাবে কম।
কাটজ মনে করেন, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই বোঝা যাবে এবারের পতন সাময়িক কোনো ধাক্কা, নাকি সত্যিই একটি ‘বিপর্যয়কর পতনের’ শুরু।
সমুদ্রের অগভীরে রং বদলে, শরীরের আকৃতি পাল্টে সঙ্গী খুঁজে বেড়ানো লাখো কাটলফিশের দৃশ্য একসময় ছিল দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার শীতের অন্যতম বিস্ময়। এবার সেই পানির নিচে নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা।
প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত এই অসাধারণ প্রাণীদের আবারও আগের মতো ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, এখন সেই উত্তরই খুঁজছেন গবেষকেরা।
সূত্র: বিবিসি