বাঁশ দিবসে বাঁশের কদর বাড়ুক, বাঁশ দেওয়া কমুক!

বাঁশ—নামটা শুনলেই কারও মনে পড়ে গ্রামবাংলার সবুজ প্রকৃতি, আবার কারও মনে পড়ে জীবনে পাওয়া সেই ঐতিহাসিক ‘বাঁশ’গুলোর কথা! আজ বাঁশ দিবস। তাই আজকের দিনে বাঁশের গুণগান হোক, বাঁশের সঠিক ব্যবহার হো।ক তবে একটা অনুরোধ, বাঁশটা গাছেই থাকুক, মানুষের জীবনে নয়!

এই পরিচিত গাছটির গল্প যে এতটা বড়, তা হয়তো অনেকেই জানেন না। দ্রুত বেড়ে ওঠা বাঁশ শুধু গ্রামবাংলার চেনা উদ্ভিদ নয়, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সম্পদ হিসেবেও এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

বাঁশের চাষে তুলনামূলকভাবে কম পানি লাগে, এটি দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং এর নানা অংশ দিয়ে জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী, কাগজ, কাপড়সহ অসংখ্য পণ্য তৈরি করা যায়। অর্থাৎ, যে গাছকে আমরা অনেক সময় স্রেফ ‘বাঁশ’ বলে পাশ কাটিয়ে যাই, তার কাজের তালিকাটা কিন্তু বেশ লম্বা।

বাঁশের এই বহুমুখী ব্যবহার ও পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই পালিত হয় বিশ্ব বাঁশ দিবস। আজকের এই দিনটি মনে করিয়ে দেয়, টেকসই ভবিষ্যতের খোঁজে খুব দূরে তাকানোর দরকার নেই। চারপাশের পরিচিত কিছু উদ্ভিদও হতে পারে তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশ্ব বাঁশ দিবসের শুরু

বিশ্ব বাঁশ দিবসের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালে। সে বছর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড বাম্বু কংগ্রেসে থাইল্যান্ডের রয়াল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে দিবসটি ঘোষণা করা হয়।

এরপর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাঁশের গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে দিনটি পালন করে আসছে।

বাঁশ সম্পর্কে একটু জানুন

বিশ্ব বাঁশ দিবসে বাঁশ নিয়ে নতুন কিছু জানা হতে পারে বেশ মজার অভিজ্ঞতা। কারণ বাঁশ শুধু দ্রুত বাড়েই না, খাবার থেকে চা বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তার ব্যবহার রয়েছে।

বাঁশের কচি অঙ্কুর নরম থাকতেই সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেগুলো দিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, বাঁশের ‘ছোটবেলা’ও বেশ কাজে লাগে!

বাঁশের পাতাও কিন্তু একেবারে ফেলনা নয়। কিছু জায়গায় বাঁশের পাতা দিয়ে চা তৈরি করা হয়, যার স্বাদ অনেকটা গ্রিন টির মতো বলে মনে করা হয়।

খরার সময়ও বাঁশ বেশ কৌশলী। পানির সংকট বা অতিরিক্ত গরমে এর পাতা কুঁকড়ে যেতে পারে, যা উদ্ভিদটিকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, প্রকৃতির প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশলও বাঁশের জানা আছে।

আর বাঁশের পরিবারও মোটেই ছোট নয়। বিশ্বজুড়ে দেড় হাজারের বেশি প্রজাতির বাঁশ রয়েছে বলে জানা যায়। তাই ‘বাঁশ’ বললেই যে শুধু একটি ধরনের গাছকে বোঝায়, তা নয়।

ঘরে একটু বাঁশ ঢুকুক

টেকসই জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে দৈনন্দিন ব্যবহারের কিছু পণ্যের বিকল্প হিসেবেও বাঁশ বেছে নেওয়া যেতে পারে। ধীরে বেড়ে ওঠা কাঠ কিংবা অন্য কিছু উপকরণের বদলে বাঁশ ব্যবহার করা গেলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রান্নাঘরেই শুরু করা যায় এই পরিবর্তন। বাঁশের চামচ, কাঁটাচামচ, কাটিং বোর্ড, থালা-বাটি কিংবা অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করা যায়। এমনকি বাঁশ দিয়ে তৈরি আসবাব ও মেঝের উপকরণও পাওয়া যায়।

শুধু ঘরেই নয়, পোশাকেও ঢুকে পড়েছে বাঁশ। বাঁশ থেকে তৈরি রেয়ন বা লিনেনজাত কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করা হয়। যারা বোনা বা হাতের কাজ করতে ভালোবাসেন, তারা বাঁশের সুতো ব্যবহার করে নানা ধরনের ক্রাফটও তৈরি করতে পারেন।

বাড়িতে বাঁশ লাগাবেন?

বিশ্ব বাঁশ দিবসে চাইলে উপযুক্ত জায়গায় বাঁশের চারা লাগিয়েও দিনটি উদ্‌যাপন করা যায়। আর্দ্র ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত মাটিতে বাঁশ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। আবার অনেক পরিবেশেই এটি মানিয়ে নিতে পারে এবং সাধারণত খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না।

বাঁশ পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ কিছু গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ করতে পারে। দ্রুত বৃদ্ধির কারণে বাঁশকে পরিবেশবান্ধব উদ্ভিদ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনেক প্রজাতির বাঁশ পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামলাতে পারে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে এর চাষে কীটনাশকের প্রয়োজন কম হতে পারে। বাগানে লাগানোর ক্ষেত্রেও তাই উপযুক্ত প্রজাতি বেছে নিয়ে বাঁশ ব্যবহার করা যেতে পারে।

হাজার বছরের পুরোনো ‘বাঁশের গল্প’

মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে বাঁশ ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, যেমন চীন ও ভারতে, বাঁশের ব্যবহার বহু পুরোনো। দ্রুত বেড়ে ওঠার ক্ষমতার কারণে বাঁশকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল স্থল উদ্ভিদগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়।

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ঘরবাড়ি নির্মাণ, খাবার তৈরি, আসবাব বানানো এমনকি বাদ্যযন্ত্র তৈরিতেও বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক টেকসই পণ্যের যুগ আসার বহু আগেই মানুষ বাঁশের বহুমুখী ক্ষমতা চিনে ফেলেছিল।

বর্তমানে পরিবেশের ওপর তুলনামূলক কম চাপ তৈরি করে এমন বহুমুখী সম্পদের প্রয়োজন আরও বেড়েছে। সেই জায়গায় বাঁশ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্মাণসামগ্রী থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে এর ব্যবহার বাড়ছে।

বাঁশের উপকারিতা ও ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছে ওয়ার্ল্ড বাম্বু অর্গানাইজেশন। বাঁশকে টেকসই সম্পদ হিসেবে পরিচিত করার পাশাপাশি এর নানা ব্যবহার সম্পর্কেও মানুষকে জানিয়ে আসছে সংস্থাটি।

বাঁশের গল্প শুধু ‘বাঁশ দিয়ে কী বানানো যায়’ এতটুকুতে শেষ নয়। দ্রুত বেড়ে ওঠা, নানা কাজে ব্যবহারযোগ্যতা এবং পরিবেশবান্ধব সম্ভাবনা মিলিয়ে ভবিষ্যতের টেকসই পৃথিবীতে বাঁশের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কে জানে, আজ যে বাঁশটা বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, কাল সেটিই হয়তো পরিবেশবান্ধব জীবনের গল্পের বড় অংশ হয়ে উঠবে!