একসময় ট্যাটুকে বিদ্রোহের প্রতীক মনে করা হলেও এখন এটি শরীর সাজানোর জনপ্রিয় মাধ্যম। তবে ত্বকের ভেতরে রং প্রবেশ করানোর এই প্রক্রিয়া কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা এখনও চলছে। ট্যাটুর কালি ও সূচের কারণে সংক্রমণ, অ্যালার্জি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এমনকি ট্যাটুর সঙ্গে ক্যানসারের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও এখনও নিশ্চিত নয়।
ট্যাটু করার সময় সূচের মাধ্যমে ত্বকের প্রায় ১ থেকে ৩ মিলিমিটার গভীরে কালি ঢোকানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় ত্বকে ক্ষত তৈরি হয়, ফলে সংক্রমণের সুযোগ থাকে। আবার কালির বিভিন্ন উপাদান শরীরে রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করতে পারে।
বিংহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ জন সোয়ের্কের মতে, ট্যাটুকে পুরোপুরি নিরাপদ বা অনিরাপদ কোনোটিই এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে গবেষণা চলছে এবং সময়ের সঙ্গে ঝুঁকি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
ট্যাটুর পর হতে পারে সংক্রমণ ও অ্যালার্জি
ট্যাটু করার কয়েক দিনের মধ্যেই সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, ক্ষতস্থান থেকে তরল বা পুঁজ বের হওয়া এবং জ্বর হওয়া এর লক্ষণ হতে পারে। দূষিত সরঞ্জাম, ত্বকের ব্যাকটেরিয়া কিংবা ট্যাটুর কালির মাধ্যমেও সংক্রমণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়।
ট্যাটু করার পরপরই শুধু নয়, কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরেও কালির কারণে অ্যালার্জি হতে পারে। বিশেষ করে লাল রঙের কালিতে অ্যালার্জির প্রবণতা বেশি দেখা যেতে পারে। আক্রান্ত স্থানে চুলকানি, লালচে ভাব বা ত্বক ফুলে ওঠার মতো সমস্যা হতে পারে। কখনও পুরো ট্যাটুতে নয়, নির্দিষ্ট একটি রঙের অংশেই অ্যালার্জি দেখা দেয়।
এ ছাড়া ট্যাটু করার বহু বছর পরও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ায় ত্বকে ছোট ছোট গুটি তৈরি হতে পারে। এসব সমস্যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
কালিতে থাকা উপাদান নিয়েও প্রশ্ন
ট্যাটুর কালিতে ঠিক কী কী উপাদান রয়েছে, তা নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় পরীক্ষিত ট্যাটুর কালির ৮৩ শতাংশে এমন রঞ্জক বা সংযোজক উপাদান পাওয়া যায়, যা পণ্যের গায়ে উল্লেখ করা ছিল না।
কিছু কালিতে ভারী ধাতুর মতো উপাদানও থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ট্যাটুর কালি থেকে কিছু উপাদান শরীরের লসিকাগ্রন্থিতে পৌঁছাতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।
ট্যাটু ও ক্যানসারের সম্পর্ক কি আছে?
ট্যাটু করলে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে কি না, এ প্রশ্নেরও এখনও নিশ্চিত উত্তর নেই। ২০২৪ সালের একটি বড় গবেষণায় ট্যাটু করা মানুষের মধ্যে লসিকাগ্রন্থির ক্যানসার বা লিম্ফোমার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই ফল ট্যাটুই ক্যানসারের কারণ এমন প্রমাণ দেয় না।
ট্যাটু ও লিম্ফোমার সম্পর্ক নিয়ে অন্যান্য গবেষণার ফলও এক নয়। একইভাবে ট্যাটু ও ত্বকের ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়েও এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ট্যাটু করালে কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
ট্যাটু করার আগে নির্ধারিত স্থানে কোনও খোলা ক্ষত বা ঘা আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ট্যাটু করার পর জায়গাটি পরিষ্কার রাখতে হবে এবং সূর্যের আলো থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। অ্যালার্জি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে লাল রঙের রঞ্জক এড়িয়ে চলার বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিজ্ঞ ও দক্ষ ট্যাটু শিল্পী বেছে নেওয়া। পরিচ্ছন্ন সরঞ্জাম ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। ট্যাটু করার পর ত্বক অস্বাভাবিকভাবে লাল হওয়া, পুঁজ বা তরল বের হওয়া, জ্বর, দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি কিংবা কয়েক মাস বা বছর পর ট্যাটুর জায়গায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ট্যাটু করানো শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং যেসব বিষয় সম্পর্কে বিজ্ঞান এখনও নিশ্চিত নয়, সেগুলো জানা থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।