বেশি সময় পানিতে থাকলে হাত-পায়ের আঙুল কুঁচকে যায় কেন?

গোসল করতে গিয়ে, দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কাটলে কিংবা পানিতে কাপড় ধোয়ার সময় অনেকেই লক্ষ করেছেন, কিছুক্ষণ পর হাত ও পায়ের আঙুলের চামড়া কুঁচকে যায়। আঙুলের ডগায় ছোট ছোট ভাঁজ তৈরি হয়, ত্বকও দেখতে অনেকটা কিশমিশের মতো লাগে। পানি থেকে উঠে এলে ধীরে ধীরে সেই ভাঁজ মিলিয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমনটা কেন ঘটে? ত্বক কি পানি শুষে নেয় বলেই আঙুল কুঁচকে যায়, নাকি এর পেছনে রয়েছে শরীরের অন্য কোনও প্রক্রিয়া?

বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, এর পেছনে শুধু ত্বকের বাইরের স্তরে পানি শোষিত হওয়ার বিষয়টি কাজ করে না। বরং স্নায়ুতন্ত্র ও আঙুলের সূক্ষ্ম রক্তনালির পরিবর্তনও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পানি লাগলে আঙুলে ভাঁজ পড়ে কেন?

দীর্ঘক্ষণ পানিতে হাত-পা ডুবিয়ে রাখলে আঙুলের ডগা, হাতের তালু এবং পায়ের পাতার ত্বকে ভাঁজ দেখা দিতে পারে। শরীরের অন্য অংশের তুলনায় এই জায়গাগুলিতে এমন পরিবর্তন বেশি লক্ষ করা যায়।

২০০৩ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা সাময়িকী মাসল অ্যান্ড নার্ভ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, পানিতে ডুবে থাকার পর আঙুল কুঁচকে যাওয়ার সঙ্গে আঙুলের ডগার রক্তনালিগুলির সংকোচনের সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন’। অর্থাৎ, রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়ার ফলে ওই অংশে রক্তের প্রবাহ ও টিস্যুর আয়তনে পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে ত্বকের ওপরের স্তরে ভাঁজ তৈরি হয়।

এই প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি অংশ, বিশেষ করে সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। শরীরের যেসব কাজ সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না, সেগুলির অনেক কিছুই এই স্নায়ুতন্ত্র পরিচালনা করে। পানিতে থাকার প্রতিক্রিয়ায় স্নায়ুর সংকেত আঙুলের রক্তনালির পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করে।

এটি কি শুধু ত্বকে পানি ঢোকার ফল?

অনেকের ধারণা, ত্বক পানি শুষে ফুলে ওঠে বলেই আঙুল কুঁচকে যায়। ত্বকের বাইরের স্তর পানি শোষণ করতে পারে ঠিকই, তবে গবেষণায় দেখা গেছে, পানিতে আঙুল কুঁচকে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও জটিল। এর সঙ্গে স্নায়ুর কার্যকলাপ ও রক্তনালির সংকোচনের সরাসরি যোগ রয়েছে।

১৯৭৯ সালে আর্কাইভস অব নিউরোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, হাতের সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে পানিতে ডোবানোর পর ত্বকে স্বাভাবিকভাবে ভাঁজ তৈরি নাও হতে পারে। পরবর্তী গবেষণাতেও এই স্নায়বিক ভূমিকার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আঙুল কুঁচকে যাওয়ার কি কোনও উপকার আছে?

পানিতে থাকার কারণে আঙুলে তৈরি হওয়া ভাঁজের একটি সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা হলো, এই ভাঁজ ভেজা বস্তু ধরার সময় পানি সরিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে। ফলে পিচ্ছিল কোনও বস্তু হাতে ধরে রাখার সুবিধা হতে পারে।

২০১৩ সালে বায়োলজি লেটার্স সাময়িকীতে প্রকাশিত নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখিয়েছিলেন, কুঁচকে যাওয়া আঙুল ব্যবহার করে পানির মধ্যে থাকা কিছু বস্তু তুলতে অংশগ্রহণকারীরা তুলনামূলক দ্রুত কাজ করতে পেরেছিলেন।

২০২১ সালে পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, আঙুলের ভাঁজ ভেজা বস্তু ধরার সময় প্রয়োজনীয় গ্রিপ বা ধরার শক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যাকে আঙুল কুঁচকে যাওয়ার একমাত্র নিশ্চিত কারণ বলা যায় না, এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

কতক্ষণ পর আঙুল কুঁচকে যায়?

সবার ক্ষেত্রে একই সময়ে আঙুল কুঁচকে যায় না। পানির তাপমাত্রা, কতক্ষণ হাত-পা ডুবিয়ে রাখা হচ্ছে এবং ব্যক্তির শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর এই পরিবর্তন নির্ভর করতে পারে। সাধারণত কিছুক্ষণ পানিতে থাকার পর আঙুলে ভাঁজ দেখা দেয়। পানি থেকে উঠে এলে এবং ত্বক শুকিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভাঁজও ধীরে ধীরে কমে যায়।

কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?

দীর্ঘক্ষণ পানিতে থাকার পর আঙুল কুঁচকে যাওয়া সাধারণত স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। তবে অল্প সময় পানিতে থাকলেই যদি আঙুল অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়, ত্বকে সাদা দানা বা গুটি দেখা দেয়, চুলকানি, ব্যথা কিংবা জ্বালাপোড়া হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে পানি থেকে উঠে আসার পরও যদি অস্বস্তি বা ত্বকের পরিবর্তন দীর্ঘক্ষণ থাকে, তা অবহেলা করা ঠিক নয়।

সব মিলিয়ে, পানিতে হাত-পায়ের আঙুল কুঁচকে যাওয়া শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এটি শুধু ত্বকে পানি শোষিত হওয়ার ফল নয়, এর সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তনালির পরিবর্তনেরও সম্পর্ক রয়েছে। তাই গোসল বা সাঁতারের পর আঙুলে ভাঁজ দেখলে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

 

তথ্যসূত্র

মাসল অ্যান্ড নার্ভ — আঙুল কুঁচকে যাওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণা, ২০০৩।

আর্কাইভস অব নিউরোলজি — স্নায়ুতন্ত্র ও আঙুলের ত্বকের পরিবর্তন, ১৯৭৯।

বায়োলজি লেটার্স — ভেজা বস্তু ধরতে আঙুলের ভাঁজের ভূমিকা, ২০১৩।

পিএলওএস ওয়ান — আঙুলের ভাঁজ ও বস্তু ধরার দক্ষতা নিয়ে গবেষণা, ২০২১।