ট্রেন্ডের ঝলক নয়, উত্তরাধিকারেই উৎসবের ফ্যাশন। মায়ের যত্নে রাখা শাড়ি আর গয়নায় সেজে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনকে স্মরণ করলেন মুনমুন সেন ও রাইমা সেন। তাঁদের সাজে মিশে রইল নস্টালজিয়া, আভিজাত্য আর তিন প্রজন্মের নারীর গল্প।
পুজোর সাজ মানেই কি নতুন পোশাক, নতুন গয়না, হালফ্যাশনের ছোঁয়া? মুনমুন সেন ও রাইমা সেন যেন বলছেন, সব সময়ে নয়। কখনও পুরনো শাড়ির ভাঁজে, যত্নে তুলে রাখা গয়নার ঝলকে ফিরে আসে এমন এক ফ্যাশন, যার আবেদন সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। আর সেই সাজের কেন্দ্রে যদি থাকেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন, তবে আবেগের সঙ্গে জুড়ে যায় বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিও।
মহালয়ার আবহে মায়ের শাড়ি ও গয়না পরে অন্য রকম এক স্মৃতিচারণে সামিল হলেন মুনমুন সেন এবং তাঁর মেয়ে রাইমা সেন। ‘মায়ের শাড়ি, মায়ের সাজ’—এই ভাবনাকে ঘিরেই তাঁদের সাজের গল্প। মুনমুনের পরনে মা সুচিত্রা সেনের ব্যবহার করা শিফন শাড়ি। রাইমার সাজে দিদিমার নকশা করা জড়োয়া দুল। পোশাক ও অলঙ্কারের মধ্য দিয়ে যেন ফিরে এলো পরিবারের একান্ত নিজস্ব ইতিহাস।
শাড়ির ভাঁজে ব্যক্তিত্বের ছাপ
সুচিত্রা সেনের পর্দার গ্ল্যামার নিয়ে আলোচনা চিরকালীন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত পোশাকের পছন্দে ছিল অন্য রকম সংযম। মুনমুনের স্মৃতিতে, সাধারণ সুতির শাড়ি আর সুতির ব্লাউজ়েও মাকে দেখাতো অনন্য। বিশেষ দিন বা পুজোর সময়ে অবশ্য সাজপোশাকে থাকতো আলাদা যত্ন। অর্থাৎ, আভিজাত্য মানেই যে বাহুল্য নয়, মহানায়িকার ব্যক্তিগত স্টাইলেই তার পরিচয় মিলতো।
শাড়িকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার প্রবণতাও ছিল তাঁর। একরঙা শাড়িতে আলাদা করে বেনারসি পাড় বসানো কিংবা নিজস্ব নকশায় পোশাক তৈরি এই খুঁটিনাটিই সুচিত্রার সাজকে দিতো স্বতন্ত্র পরিচয়। আজকের ফ্যাশনের ভাষায় যাকে বলা যায়, ব্যক্তিগত স্টাইল স্টেটমেন্ট।
গয়নায় জড়িয়ে পারিবারিক উত্তরাধিকার
রাইমার কানে দিদিমার নকশা করা জড়োয়া দুল। এই অলঙ্কার যেন সাজের অনুষঙ্গের পাশাপাশি পরিবারের স্মৃতি বহনকারী এক টুকরো ঐতিহ্য। সুচিত্রা সেন নিজের শাড়ি ও গয়না নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন, পছন্দমতো নকশা তৈরি করাতেন। পরিবারের স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে সেই শৌখিনতার কথাও।
আজকের দিনে ভিন্টেজ ফ্যাশন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গয়না এবং পুরনো পোশাক নতুনভাবে পরার প্রবণতা ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। মুনমুন ও রাইমার সাজও সেই ভাবনাকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। পুরনো জিনিসকে বাতিল না করে তার আবেগ ও ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে চলাই হয়ে উঠতে পারে উৎসবের বিশেষ ফ্যাশন-বার্তা।
ফ্যাশনের বাইরেও মা-মেয়ের গল্প মুনমুনের স্মৃতিতে সুচিত্রা শুধু মহানায়িকা নন, সংসারের নিয়মকানুনে যত্নশীল এক মা। পূজার আয়োজন থেকে অতিথি আপ্যায়ন, পোশাকের নির্বাচন থেকে দৈনন্দিন জীবনযাপন সব কিছুতেই ছিল তাঁর নিজস্ব ছাপ। মেয়ের সাজ নিয়েও ভাবতেন তিনি। অন্য দিকে, রাইমার কাছে ‘আম্মা’র স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে তাঁর শৌখিনতা, রুচি এবং পারিবারিক আদবকায়দার সঙ্গে।
তাই এই সাজের তাৎপর্য কেবল তারকাদের ফ্যাশন-নির্বাচনে আটকে নেই। বরং প্রজন্মান্তরে কীভাবে একজন নারীর রুচি, স্মৃতি ও ব্যক্তিত্ব পরিবারের অন্য নারীদের মধ্যে বেঁচে থাকে, তারই ছবি হয়ে উঠেছে মুনমুন ও রাইমার উপস্থিতি।
ফ্যাশন বদলায়, ট্রেন্ড আসে-যায়। কিন্তু কিছু শাড়ি, কিছু গয়না থেকে যায় সময়ের বাইরে। সুচিত্রা সেনের শাড়ি ও অলঙ্কারে মুনমুন-রাইমার এই সাজ যেন মনে করিয়ে দিলো, উৎসবের সবচেয়ে মূল্যবান অনুষঙ্গ সব সময়ে নতুন নয়। কখনও তা মায়ের আলমারিতে যত্নে তুলে রাখা এক টুকরো ভালোবাসা।