পূজার ভিড়ে দমবন্ধ লাগলে আতঙ্ক সামলাবেন কী ভাবে?

পূজার মৌসুমে শহরের রাস্তাঘাট, মণ্ডপ, বাজার কিংবা গণপরিবহণে উপচে পড়ে মানুষের ভিড়। অনেকের কাছে এই পরিবেশ আনন্দের হলেও কারও কারও ক্ষেত্রে তা তীব্র উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। ভিড়ের মধ্যে আটকে পড়ার চিন্তা, সেখান থেকে বেরোতে না পারার আশঙ্কা কিংবা বদ্ধ জায়গায় দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি আচমকাই আতঙ্ক বাড়িয়ে দিতে পারে। দেখা দিতে পারে বুক ধড়ফড় করা, ঘাম হওয়া, মাথা ঘোরা, হাত-পা কাঁপা কিংবা শ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়ার মতো উপসর্গও।

মনোরোগ চিকিৎসক আলতাফ হোসেনের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে মূলত দু’ধরনের ভয়ের কথা উঠে আসে। এক, অ্যাগোরাফোবিয়া ও দুই, ক্লস্ট্রোফোবিয়া। দু’টির ক্ষেত্রেই উদ্বেগ তীব্র হতে পারে, তবে ভয় তৈরি হওয়ার পরিস্থিতি এক নয়। তাই পূজার ভিড়ে অস্বস্তি হলে সমস্যাটির ধরন বোঝার পাশাপাশি কী ভাবে নিজেকে সামলানো যায়, তা জানা জরুরি।

ভিড়ের মধ্যে ভয় কেন বাড়ে?

কোনও পরিস্থিতিতে আটকে পড়লে সাহায্য পাওয়া যাবে কি না, দ্রুত বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে কি না- এমন চিন্তা থেকে উদ্বেগ শুরু হতে পারে। ভয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সেই শারীরিক উপসর্গ দেখে আবার মনে হতে পারে, সত্যিই বড় কোনও বিপদ ঘটছে। ফলে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় এবং পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারও ক্ষেত্রে তীব্র আতঙ্কের পর মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে।

তবে ভিড়ে অস্বস্তি হলেই যে কারও অ্যাগোরাফোবিয়া বা ক্লস্ট্রোফোবিয়া রয়েছে, এমন নয়। এই সমস্যাগুলি নির্ণয়ের জন্য উপসর্গের ধরন, স্থায়িত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অ্যাগোরাফোবিয়া: বেরিয়ে আসতে না পারার ভয়

অ্যাগোরাফোবিয়ার ক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তি এমন পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগে ভুগতে পারেন, যেখানে বিপদে পড়লে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে অথবা প্রয়োজনের সময়ে সাহায্য পাওয়া যাবে না বলে তার মনে হয়। ভিড় বাস, বাজার, শপিং মল, সিনেমা হল কিংবা জনসমাগমপূর্ণ জায়গায় যাওয়ার চিন্তা তার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। কারও ক্ষেত্রে একা বাড়ির বাইরে বেরোনো বা বাড়ি থেকে দূরে যাওয়াও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আগে কোনও জায়গায় তীব্র আতঙ্কের অভিজ্ঞতা হলে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ভয়ও তৈরি হতে পারে।

ক্লস্ট্রোফোবিয়া: বদ্ধ জায়গায় আটকে পড়ার আশঙ্কা

ক্লস্ট্রোফোবিয়া বলতে সীমাবদ্ধ বা বদ্ধ জায়গায় আটকে পড়ার তীব্র ভয়কে বোঝায়। লিফ্‌ট, ছোট ঘর, এমআরআই মেশিনের ভেতর কিংবা বন্ধ দরজা-জানলাওয়ালা জায়গায় কারও কারও উদ্বেগ বেড়ে যেতে পারে। মনে হতে পারে, সেখান থেকে বেরোনোর পথ নেই বা শ্বাস নিতে পারবেন না।

পূজার সময়ে ছোট মণ্ডপ, অতিরিক্ত ভিড়ের মেট্রো, বাস কিংবা ট্রেনেও এমন ভয় জাগতে পারে।

আতঙ্ক বাড়লে কী করবেন?

ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তি শুরু হলে ধীরে ধীরে তুলনামূলক ফাঁকা ও নিরাপদ জায়গায় সরে যান। তাড়াহুড়ো করে ঠেলাঠেলি না করে কাছের পরিচিত ব্যক্তি, নিরাপত্তাকর্মী বা স্বেচ্ছাসেবকের সাহায্য নিন। ভিড়ের চাপে আটকে পড়লে নিজেকে জোর করে ঠেলে বেরোনোর চেষ্টা না করে নিরাপদে বেরিয়ে আসার জন্য সহায়তা চান।

আতঙ্কের সময়ে শ্বাস ধীর ও স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন। পাশাপাশি মনকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে ‘৫-৪-৩-২-১ গ্রাউন্ডিং’ পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে। চারপাশে দেখা যাচ্ছে এমন পাঁচটি জিনিস খেয়াল করুন, স্পর্শ করতে পারছেন এমন চারটি জিনিস শনাক্ত করুন, তিনটি শব্দ শুনুন, দুটি গন্ধের দিকে মনোযোগ দিন এবং একটি স্বাদ অনুভব করার চেষ্টা করুন। এই অনুশীলন মনোযোগকে ভয় ধরানো চিন্তা থেকে সরিয়ে আশপাশের পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

ভিড় বা বদ্ধ জায়গার ভয় যদি বার বার ফিরে আসে, পূজায় বাইরে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তা হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোচিকিৎসা, বিশেষ করে জ্ঞানীয় আচরণভিত্তিক থেরাপি (সিবিটি), এবং ধাপে ধাপে ভয় সামলানোর প্রশিক্ষণ উপকারী হতে পারে। নিজে থেকে আপৎকালীন ওষুধ খাওয়ার বদলে চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলাই নিরাপদ।

আর শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অন্য কোনও তীব্র শারীরিক উপসর্গকে শুধু আতঙ্ক বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এমন উপসর্গ নতুন করে দেখা দিলে, তীব্র হলে বা না কমলে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিন।