স্কুলের পুনর্মিলনীতে কেন ফেরেন মানুষ, টান কি শুধুই স্মৃতির?

স্কুলজীবন শেষ হওয়ার বহু বছর পর পুরোনো সহপাঠীদের সঙ্গে আবার দেখা করার সুযোগ আসে পুনর্মিলনীতে। কারও কাছে এটি স্মৃতিময় সময়ের কাছে ফিরে যাওয়া, কারও কাছে পুরোনো বন্ধুদের নতুন করে চেনা। আবার কেউ কেউ এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন অতীতের কোনও ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে, কিংবা কৈশোরে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে।

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্কুলের পুনর্মিলনী ঘিরে মানুষের এমন নানা অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতির দিক তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুনর্মিলনী কখনও আনন্দময়, কখনও বিব্রতকর, আবার কখনও অতীতের সঙ্গে বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি করে।

অতীতের ভুল শুধরে নেওয়ার চেষ্টা

প্রতিবেদনে মেলবোর্নের ৪০ বছর বয়সী এক অগ্নিনির্বাপণকর্মী মাইকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। স্কুলের ২০তম পুনর্মিলনীতে তাঁর যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করা নয়, বরং অতীতের একটি ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়া।

স্কুলে তাঁর এক বন্ধুকে সমকামবিদ্বেষী আচরণের মাধ্যমে নিগ্রহ করা হয়েছিল। মাইক নিজে সেই নিগ্রহে অংশ না নিলেও বন্ধুটির পক্ষে যথেষ্ট ভূমিকা না রাখার জন্য দীর্ঘদিন অপরাধবোধে ভুগেছেন। পুনর্মিলনীতে গিয়ে তিনি সেই বন্ধুর কাছে ক্ষমা চাইতে চেয়েছিলেন।

দুজনের দেখা হয়, কথাও হয়। তবে মাইকের উপলব্ধি ছিল, অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে গেলেও কথোপকথন সব সময় প্রত্যাশামতো এগোয় না। বরং কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে যার কাছে ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে, তাকেই ক্ষমাপ্রার্থীর অপরাধবোধ সামলাতে হয়। তবু পুরোনো বন্ধুত্ব নতুন করে গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তাঁদের সাক্ষাৎ ইতিবাচক পরিণতি পায়।

পুনর্মিলনীতে যাওয়া কি জরুরি?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, স্কুলের পুনর্মিলনীতে যোগ দেওয়া কারও জন্য বাধ্যতামূলক নয়। কেউ যেতে আগ্রহী হলেও দ্বিধায় ভুগলে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকগুলো লিখে দেখতে পারেন। এতে সম্ভাব্য অস্বস্তি বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতার ভয় কিছুটা সামলানো সহজ হতে পারে।

স্কুলের পুনর্মিলনীতে গিয়ে অনেকেই নিজের জীবনকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। কে কতটা সফল, কার বিয়ে হয়েছে, কে সন্তান নিয়ে ব্যস্ত কিংবা কার পেশাগত অবস্থান কেমন- এমন প্রশ্ন কখনও অদৃশ্য প্রতিযোগিতার অনুভূতি তৈরি করে। বয়স ও জীবনের পর্যায় অনুযায়ী এই চাপের ধরনও বদলাতে পারে।

তাই অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তা নিয়ে অপরাধবোধে ভোগার প্রয়োজন নেই। নিজের মানসিক স্বস্তি ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

অস্বস্তি কাটানোর প্রস্তুতি

পুনর্মিলনীতে যাওয়ার আগে কিছু প্রস্তুতি সামাজিক অস্বস্তি কমাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অনুষ্ঠানের আগে কিছু খেয়ে নেওয়া, পরিচিত কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া এবং পরার জন্য এমন পোশাক বেছে নেওয়া যাতে নিজের আত্মবিশ্বাস বজায় থাকে। এসব ছোট বিষয়ও কাজে আসতে পারে।

সম্ভব হলে কারা অনুষ্ঠানে আসবেন, তা আগেই দেখে নিন। কয়েকটি সহজ কথোপকথনের বিষয়ও ভেবে রাখুন। তবে সহপাঠীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে তাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে অতিরিক্ত অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই পৌঁছানো ভালো। তবে প্রথম ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে গেলে দেখা যায়, অন্যরাও তখন পরিচিতদের খুঁজছেন এবং কথাবার্তা শুরু করার চেষ্টা করছেন। ফলে একা গিয়ে অস্বস্তিতে পড়ার আশঙ্কা কিছুটা কমে।

বহু বছর পর পুরোনো সহপাঠীর নাম বা মুখ মনে করতে না পারাও স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে বিব্রত না হয়ে বিনয়ের সঙ্গে নিজের পরিচয় দিয়ে অন্যজনের নাম জানতে চান। কথোপকথন থেমে গেলে নিজের সাফল্যের বিবরণ দেওয়ার বদলে অন্যজনের জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করা ভালো। এতে আলাপ সহজ হয় এবং অপর পক্ষও নিজেকে গুরুত্ব পাওয়া মানুষ হিসেবে অনুভব করেন।

পুরোনো ক্ষত নিয়ে কথা বলা কতটা ঠিক?

পুনর্মিলনীতে গিয়ে কারও কারও মনে হতে পারে, স্কুলজীবনে ঘটে যাওয়া অপমান বা নিগ্রহের বিষয়টি এবার তুলে ধরা দরকার। তবে মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো, অতীতের ঘটনা নিয়ে কথা বলতে হলে নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি প্রকাশের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত, উত্তপ্ত তর্কে জড়িয়ে পড়া নয়।

যার কাছে ক্ষমা বা অন্যায়ের স্বীকৃতি প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তিনি তা নাও দিতে পারেন। কারণ অন্যের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে আলোচনা থেকে সরে আসাও গ্রহণযোগ্য।

অন্যদিকে, কেউ যদি বুঝতে পারেন যে স্কুলজীবনে তাঁর আচরণে অন্য কেউ কষ্ট পেয়েছিলেন, তাহলে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়াই শ্রেয়। সেই ক্ষমাপ্রার্থনায় অজুহাত দেওয়া কিংবা ‘তুমি কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখিত’ ধরনের শর্তযুক্ত ভাষা ব্যবহার না করাই ভালো।

ফিরে এসে যে উপলব্ধি

পুনর্মিলনী শেষ হওয়ার পর মানুষের অনুভূতি মিশ্র হতে পারে। কেউ পুরোনো বন্ধুত্ব ফিরে পান, কেউ অতীতের কোনও অধ্যায়ের সমাপ্তি টানতে পারেন, আবার কেউ এমন কিছু জানতে পারেন যা তার পুরোনো ধারণাকে বদলে দেয়।

মাইকের মতো কেউ স্কুলজীবনের পরিবেশকে নতুন চোখে দেখতে শেখেন। বয়স বাড়ার পর শৈশবের স্মৃতির মূল্য, তখনকার সুযোগ-সুবিধা কিংবা জীবনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন নিয়মিত পুনর্মিলনীতে অংশ নেওয়া মার্জি ষাটতম আয়োজনের পর আর না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো সহপাঠীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন তাঁকে জীবনকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

স্কুলের পুনর্মিলনী কেবল পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলা কিংবা স্মৃতিচারণের আয়োজন নয়। এটি নিজের অতীতকে নতুন করে বোঝা, পুরোনো সম্পর্কের অর্থ খুঁজে দেখা এবং জীবনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ভাবারও সুযোগ।