জল আর আগুনের সহাবস্থান! প্রকৃতির এই রহস্যময় দৃশ্য কোথায়?

পাথরের গা বেয়ে নেমে আসছে জল। আর সেই জলপ্রপাতের পাদদেশে ছোট্ট একটি গুহার ভেতর জ্বলছে আগুনের শিখা! আশপাশে নেই কোনও আগ্নেয়গিরি, তবু বছরের বেশির ভাগ সময়ই জ্বলতে দেখা যায় সেই আগুন। প্রকৃতির এমনই এক বিস্ময়কর দৃশ্যের সাক্ষী হতে চাইলে যেতে পারেন আমেরিকার নিউ ইয়র্কের ‘ইটার্নাল ফ্লেম ফলস’-এ।

কোথায় রয়েছে এই জলপ্রপাত?

আমেরিকার নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অর্চার্ড পার্ক এলাকায় চেস্টনাট রিজ পার্কের শেল ক্রিক প্রিজার্ভে রয়েছে ইটার্নাল ফ্লেম ফলস। এটি আকারে ছোট জলপ্রপাত হলেও এর পাদদেশের আগুনই পর্যটকদের কাছে বিশেষ কৌতূহলের বিষয়। জলপ্রপাতের নীচে একটি ছোট গুহা থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস বেরিয়ে আসে। সেই গ্যাসে আগুন ধরালে তৈরি হয় ছোট্ট একটি শিখা। জল আর আগুনের এমন সহাবস্থানই এই জায়গাটিকে অন্য রকম করে তুলেছে। শিখাটি বছরের বেশির ভাগ সময় জ্বলতে দেখা যায়।

আগুন জ্বলে কী ভাবে?

এই দৃশ্যের পেছনে রয়েছে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। ২০১৩ সালে ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় ব্লুমিংটন এবং ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ জিওফিজ়িক্স অ্যান্ড ভলক্যানোলজির গবেষকেরা জলপ্রপাতের গ্যাস নিয়ে পরীক্ষা করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, এখানকার প্রাকৃতিক গ্যাসে ইথেন ও প্রোপেনের অনুপাত তুলনামূলক বেশি। গবেষকদের অনুমান, জলপ্রপাতের প্রধান গ্যাস নির্গমনস্থল থেকে প্রতিদিন প্রায় এক কিলোগ্রাম মিথেন নির্গত হয়।

এলাকার ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরের ফাটল দিয়ে গ্যাস ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে বলে মনে করা হয়। গবেষকেরা গ্যাসের উৎস হিসেবে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৪০০ মিটার নীচে থাকা রাইনস্ট্রিট শেল স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন। এই গ্যাসই গুহার মুখে আগুন জ্বালানোর সুযোগ তৈরি করে।

জলপ্রপাতের পথে কী কী মাথায় রাখবেন?

ইটার্নাল ফ্লেম ফলসে পৌঁছতে হলে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হয়। পথের কিছু অংশ পিচ্ছিল ও খাড়া হওয়ায় যাত্রাপথ সহজ নয়। ২০২৩ সালের অগস্টে প্রধান ট্রেইলে সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার পর সেটি ফের খুলে দেওয়া হয়। পথের কঠিন অংশ পার হতে ১৩৯টি বক্স স্টেপ বসানো হয়েছিল। পাশাপাশি খালের তলদেশ পর্যন্ত পথের ধারে প্রায় ১২০ ফুট রেলিংও তৈরি করা হয়।

তবে সংস্কারের পরেও জলধারার কাছে নামার পথটি কঠিন হতে পারে। তাই উপযুক্ত গ্রিপযুক্ত জুতো পরে যাওয়া জরুরি। বৃষ্টির পরে পথ আরও পিচ্ছিল হয়ে উঠতে পারে। হাঁটার সময় তাড়াহুড়ো না করে সাবধানে এগোন।

প্রকৃতির বিস্ময় দেখতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি নয়

ইটার্নাল ফ্লেম ফলস একসময় স্থানীয়দের কাছে অনেকটাই অপরিচিত ছিল। পরে সংবাদমাধ্যমে প্রচার এবং যাতায়াতের পথের উন্নতির ফলে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে দর্শনার্থীর ভিড়ের সঙ্গে বেড়েছে আবর্জনা, দূষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপের মতো সমস্যাও।

তাই সেখানে গেলে কোনও আবর্জনা ফেলে আসবেন না, গাছপালা বা পাথরের ক্ষতি করবেন না এবং নির্দিষ্ট পথ মেনেই হাঁটবেন। আগুনের শিখা দেখতে গিয়ে গুহার ভেতরে হাত দেওয়া বা নিজের মতো করে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করাও উচিত নয়।

জলপ্রপাতের অবিরাম জলধারা আর তার নীচে জ্বলতে থাকা ক্ষুদ্র আগুন—ইটার্নাল ফ্লেম ফলসের এই দৃশ্য প্রকৃতির জটিল ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার এক বিরল উদাহরণ। প্রকৃতিপ্রেমী ও ভূতত্ত্ব নিয়ে কৌতূহল রয়েছে, এমন পর্যটকদের কাছে জায়গাটি বিশেষ অভিজ্ঞতার হয়ে উঠতে পারে।