রাতের আকাশে একের পর এক বিদ্যুতের ঝলকানি। কখনও কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান, কখনও আবার এক মিনিটে কয়েক ডজন বার! অথচ এই আলোর খেলা কোনও শহরের আতশবাজি নয়। প্রকৃতির নিজস্ব কাণ্ড। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলায় মারাকাইবো হ্রদের ওপর দেখা যায় এমনই এক বিরল প্রাকৃতিক ঘটনা, যার নাম ‘কাটাতুম্বো বজ্রপাত’। প্রায় সারা বছরই এই অঞ্চলের আকাশে ঝড়ের মেঘ জমে, আর তার বুক চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যায়। তাই এই অঞ্চল পরিচিত ‘চিরস্থায়ী ঝড়ের দেশ’ হিসাবেও।
কোথায় দেখা যায় এই দৃশ্য?
ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো হ্রদের পশ্চিম দিকে, কাটাতুম্বো নদী যেখানে হ্রদে মিশেছে, তার আশপাশের জলাভূমি অঞ্চলে এই বজ্রপাতের ঘটনা বেশি দেখা যায়। স্থানীয় বারি জনগোষ্ঠীর ভাষায় ‘কাটাতুম্বো’ শব্দের অর্থ ‘বজ্রের ঘর’। নামের সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রকৃতির যেন অদ্ভুত মিল রয়েছে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১৪০ থেকে ১৬০ রাত এই অঞ্চলে বজ্রঝড় হতে পারে। কোনও কোনও রাতে প্রায় নয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যায়। এক মিনিটে ১৬ থেকে ৪০ বার পর্যন্ত বজ্রপাতের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। স্যাটেলাইট-ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে প্রায় ২৫০ বার বজ্রপাত হতে পারে। পৃথিবীর অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে তাই কাটাতুম্বোর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।
কেন বার বার বিদ্যুতের ঝলকানি?
এই অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও বায়ুমণ্ডলের বিশেষ পরিস্থিতি। মারাকাইবো হ্রদ ও তার আশপাশের জলাভূমি থেকে বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প জমা হয়। অন্য দিকে, আন্দিজ় পর্বতমালা, পেরিজা পর্বতমালা এবং মেরিডা কর্ডিলেরার মতো উঁচু পর্বতশ্রেণি ঘিরে রেখেছে এই অঞ্চলকে।
উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে পর্বত থেকে নেমে আসা অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাসের সংঘাতে বায়ুমণ্ডল অস্থির হয়ে ওঠে। তৈরি হয় শক্তিশালী বজ্রঝড়ের অনুকূল পরিস্থিতি। ঝড়ের মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ জমতে থাকলে ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যায়। এই বজ্রপাতের অধিকাংশই মেঘের ভেতরে ঘটে।
কেন কাটাতুম্বোতেই এমন ঘটনা এত ঘন ঘন ঘটে, তা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণা চলছে। স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা, ঋতু পরিবর্তন এবং এল নিনোর মতো বৃহত্তর জলবায়ুগত প্রভাবও এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। তবে একটি মাত্র কারণ দিয়ে এই ঘটনার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায়নি।
কখন দেখা যায় বজ্রপাত?
কাটাতুম্বো অঞ্চলে বজ্রপাতের তীব্রতা সারা বছর এক রকম থাকে না। ঋতু ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী এর ঘনত্ব বাড়ে বা কমে। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। সে সময়ে খরার প্রভাবকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি এই প্রাকৃতিক ঘটনা স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে গেলো কি না, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছিল। পরে আবার বজ্রপাতের ঘটনা দেখা যায়।
গবেষকেরা মনে করেন, স্থানীয় বাতাসের গতিপ্রকৃতি এবং বৃহত্তর জলবায়ুগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে এই অঞ্চলে বজ্রপাতের সম্ভাবনা কয়েক মাস আগেও কিছুটা অনুমান করা সম্ভব। তবে নির্দিষ্ট কোনও রাতে ঠিক কতটা বজ্রপাত হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
‘মারাকাইবোর বাতিঘর’ নাম কেন?
এই অঞ্চলের বজ্রপাতের ইতিহাস বহু পুরনো। ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন বিবরণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮২৬ সালে প্রুশীয় প্রকৃতিবিদ ও অভিযাত্রী আলেকজান্ডার ভন হামবোল্ট এই প্রাকৃতিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন। ১৮৪১ সালে ইতালীয় ভূগোলবিদ অগাস্টিন কোডাজ্জিও মারাকাইবো হ্রদের মাঝামাঝি অঞ্চলে এই আলোর ঝলকানির কথা উল্লেখ করেন।
রাতের আকাশে দূর থেকে দেখা যেত বলে এই বজ্রপাতকে একসময় ‘মারাকাইবোর বাতিঘর’ বলা হত। নাবিকদের কাছে এই আলোর ঝলকানি ছিল পরিচিত দৃশ্য। স্থানীয় ওয়ায়ু, ইউকপা ও বারি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসেও এই প্রাকৃতিক ঘটনার বিশেষ জায়গা রয়েছে। ভেনেজুয়েলার জুলিয়া রাজ্যের পতাকা ও প্রতীকেও বজ্রপাতের চিহ্ন দেখা যায়।
পর্যটকদের কাছে কেন বিশেষ?
রাতের অন্ধকারে একের পর এক বিদ্যুতের ঝলকানি, দূরে হ্রদের জল আর চারপাশের জলাভূমির কারণে কাটাতুম্বো অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্য অনন্য। তবে এটি কোনও সাধারণ পর্যটনস্থলের মতো নয়। বজ্রঝড়ের সময় সেখানে থাকা বিপজ্জনক। তাই এই ঘটনা দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নিরাপত্তা নির্দেশিকা এবং অভিজ্ঞ গাইডের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।
প্রকৃতির এই বিস্ময় মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে ভূপ্রকৃতি, জলীয় বাষ্প ও বায়ুপ্রবাহের বিশেষ সমন্বয়ে তৈরি হতে পারে এমন এক দৃশ্য, যা বছরের পর বছর ধরে মানুষকে বিস্মিত করে চলে। ভেনেজ়ুয়েলার কাটাতুম্বো বজ্রপাত তারই এক অসাধারণ উদাহরণ।