ওজন কমানোর ওষুধ নিয়ে ম্যারাথনে দৌড়ানো কি বিপজ্জনক?

ওজন কমানোর জন্য জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধের ব্যবহার বাড়ছে। তবে এই ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ের প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন অনেকে। বমি বমি ভাব, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা থেকে শুরু করে হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ তাদের দৌড়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। ম্যারাথনের প্রস্তুতির সঙ্গে ওজন কমানোর ওষুধের ব্যবহার কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞেরা।

দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে প্রতিযোগিতায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক মহিলা। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর ২৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধে তার পুরো নাম প্রকাশ করা হয়নি।

ওই মহিলা এর আগে একাধিক হাফ ম্যারাথন ও চারটি পূর্ণ ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ফিলাডেলফিয়া ম্যারাথনে ভালো ফল করে চলতি বছরের শিকাগো ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করেন। কিন্তু জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ তিরজেপাটাইড নেওয়ার পর তার অভিজ্ঞতা বদলে যায়। প্রতিযোগিতার এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে ওষুধটির প্রাথমিক মাত্রা নেওয়ার পর দৌড় চলাকালীন বমি বমি ভাব শুরু হয়। দৌড়ের সময় শক্তি জোগাতে যে এনার্জি জেল খেতেন, তা-ও শরীরে রাখতে পারছিলেন না। তার কথায়, হাফ ম্যারাথনের পর তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

কীভাবে প্রভাব ফেলে এই ওষুধ?

তিরজেপাটাইড এবং সেমাগ্লুটাইডের মতো জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ ক্ষুধা কমাতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কিন্তু ম্যারাথনের মতো দীর্ঘ সময়ের শারীরিক পরিশ্রমের জন্য শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি ও পানি থাকা জরুরি। ওষুধের কারণে খাওয়ার ইচ্ছা কমে গেলে প্রয়োজনীয় ক্যালোরি ও পুষ্টি গ্রহণ কঠিন হতে পারে। তার সঙ্গে বমি বমি ভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ক্লান্তির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যোগ হলে দৌড়ের প্রশিক্ষণ ব্যাহত হতে পারে।

প্রতিবেদনে ওরেগনের ৪৪ বছর বয়সি স্টিভের অভিজ্ঞতার কথাও রয়েছে। তিরজেপাটাইড নেওয়া শুরু করার পর তার কাছে পাঁচ মাইল দৌড়ানোও আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছিল। বারবার বিরতি নিতে হচ্ছিল এবং হৃদ্‌স্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাচ্ছিল।

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ মেলানি জে-র বক্তব্য অনুযায়ী, জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ বিশ্রামের সময় হৃদ্‌স্পন্দন মিনিটে দুই থেকে ১০ বার পর্যন্ত বাড়াতে পারে। ব্যায়ামের সময় এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে। তবে নতুন প্রজন্মের এই ওষুধগুলি শরীরচর্চা ও হৃদ্‌স্পন্দনে কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা এখনও সীমিত।

ম্যারাথনের আগে ওষুধ নেওয়া কি এড়ানো উচিত?

বিশেষজ্ঞদের মত এক নয়। কেউ কেউ মনে করেন, পর্যাপ্ত খাবার ও জল গ্রহণ করতে পারলে ওষুধ ব্যবহার করেও দীর্ঘ দূরত্বের দৌড় সম্ভব। অন্যদিকে, ক্রীড়া পুষ্টিবিদদের একাংশের পরামর্শ, ম্যারাথনের প্রস্তুতি চলাকালীন এই ওষুধ শুরু করার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।

দৌড়বিদদের ক্ষেত্রে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তি না পাওয়া দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর ফলে ‘রিলেটিভ এনার্জি ডেফিসিয়েন্সি ইন স্পোর্ট’ বা আরইডিএস নামের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই অবস্থায় হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে পারে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুচক্রেও অনিয়ম দেখা দিতে পারে।

প্রতিবেদনে টেক্সাসের ৩২ বছর বয়সি কাইলি কিটনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওজন কমানোর জন্য ওষুধ নেওয়ার পর বমি বমি ভাবের কারণে তার দৌড়ের প্রশিক্ষণ ব্যাহত হয়। এমনকি একটি হাফ ম্যারাথন থেকেও সরে দাঁড়াতে হয়েছিল তাকে। পরে তিনি ওষুধ নেওয়া বন্ধ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের মাত্রা কমানো, বাড়ানো বা সাপ্তাহিক মাত্রাকে ভাগ করে নেওয়া ঠিক নয়। কখন ওষুধ নেওয়া হচ্ছে, তার ওপরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাব নির্ভর করতে পারে। তাই ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহার করার পাশাপাশি ম্যারাথনের প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে চিকিৎসক ও ক্রীড়া পুষ্টিবিদের পরামর্শ জরুরি। পর্যাপ্ত খাবার, পানি এবং শরীরের সংকেতের দিকে নজর দেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ের সঙ্গে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। তাই ওজন কমানোর লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে শরীরের শক্তি, পুষ্টি ও সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে আপস না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।

সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান