মসৃণ ও উজ্জ্বল ত্বক, ছোট দেখানো লোমকূপ (পোরস), বাড়তি আর্দ্রতা এসব কারণেই অনেকের কাছে ত্বকের পরিচর্যার অন্যতম জনপ্রিয় উপায় ‘ফেসিয়াল’। তার সঙ্গে রয়েছে প্রায় এক ঘণ্টার আরামদায়ক ম্যাসাজ, যা শরীর ও মন দুই-ই প্রশান্ত করে।
ফেসিয়ালের পর ত্বক সাধারণত সতেজ ও উজ্জ্বল দেখায়। তবে এই পরিবর্তন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় না। তাই বিউটিশিয়ানরা প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি ফল পেতে নিয়মিত ফেসিয়াল করার পরামর্শ দেন।
কিন্তু সত্যিই কি নিয়মিত ফেসিয়াল ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি ঘটায়? এ বিষয়ে তিনজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের মতামত জেনে নেওয়া যাক।
ফেসিয়াল কীভাবে কাজ করে
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ওয়েক্সনার মেডিকেল সেন্টারের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুসান ম্যাসিক জানান, সাধারণ একটি ফেসিয়ালে ত্বক গভীরভাবে পরিষ্কার করা, মৃত কোষ দূর করা (এক্সফোলিয়েশন), ময়েশ্চারাইজিং, মুখে ম্যাসাজ এবং প্রয়োজনে লোমকূপে জমে থাকা তেল ও ময়লা পরিষ্কার (এক্সট্রাকশন) করা হয়।
অনেক ফেসিয়াল আবার ব্রণ, ত্বকের কালচে দাগ বা অসম ত্বকের রঙের মতো নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যেও করা হয়।
ফেসিয়ালের উপকারিতা কী
নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই আইকান স্কুল অব মেডিসিনের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলেন হে বলেন, ফেসিয়ালে মৃত ত্বক কোষ দূর হওয়ায় ত্বকের নতুন কোষ তৈরির প্রক্রিয়া কিছুটা ত্বরান্বিত হতে পারে। ফলে ত্বক আরও উজ্জ্বল ও মসৃণ দেখায় এবং পোরস তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হয়।
এ ছাড়া মুখে ম্যাসাজ করার ফলে রক্তসঞ্চালন ও লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ বাড়তে পারে, যা সাময়িকভাবে মুখের ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে।
শুধু ত্বকের জন্যই নয়, মানসিক স্বস্তির জন্যও ফেসিয়াল উপকারী হতে পারে।
সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বাসিয়া মিচালস্কি-ম্যাকনিলি বলেন, এটি এমন একটি সময়, যখন মানুষ নিজের যত্ন নেওয়ার সুযোগ পায় এবং কিছুটা চাপমুক্ত হতে পারে।
নিয়মিত ফেসিয়ালে কি দীর্ঘস্থায়ী উপকার পাওয়া যায়
ডা. মিচালস্কি-ম্যাকনিলি বলেন, একটি ফেসিয়ালের প্রভাব সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে। কারণ ত্বকের বাইরের স্তর বা এপিডার্মিস প্রায় প্রতি মাসেই নতুন করে তৈরি হয়। এই সময়ে আবারও মৃত কোষ জমে পোরস বন্ধ হতে পারে, যা ব্রণ ও ত্বকের মলিনতার কারণ হয়।
ডা. হে বলেন, প্রতি চার থেকে আট সপ্তাহ পরপর ফেসিয়াল করালে ত্বকের স্বাভাবিক কোষ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় সহায়তা মিলতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে কোলাজেন উৎপাদন কিছুটা বাড়তে পারে, যা ত্বকের দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ডা. ম্যাসিকের মতে, ত্বকের ধরন ও সমস্যার সঙ্গে মিল রেখে ফেসিয়াল নির্বাচন করলে উপকারও বেশি পাওয়া যায়। যেমন—
- ব্রণপ্রবণ ত্বকের জন্য এক্সট্রাকশনসহ ফেসিয়াল
- শুষ্ক ত্বকের জন্য অতিরিক্ত ময়েশ্চারাইজিং ফেসিয়াল
তবে তিনি বলেন, গভীর বলিরেখা বা ঝুলে যাওয়া ত্বকের মতো সমস্যায় শুধু ফেসিয়ালের ওপর নির্ভর করলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আশা করা ঠিক নয়।
বিশেষ চিকিৎসা যুক্ত থাকলে ফল কেমন
বর্তমানে অনেক ফেসিয়ালের সঙ্গে কেমিক্যাল পিল, এলইডি লাইট থেরাপি বা অন্যান্য চিকিৎসা-পদ্ধতিও যুক্ত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো নিয়মিত ও সঠিকভাবে করলে সাধারণ ফেসিয়ালের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী ফল পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ব্রণ, কালো দাগ বা ত্বকের রঙের অসমতা কমাতে এগুলো কার্যকর হতে পারে।
ফেসিয়াল কি সবার জন্য নিরাপদ
ডা. ম্যাসিক বলেন, বেশিরভাগ মানুষের জন্য ফেসিয়াল নিরাপদ হলেও কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।
তার মতে, যদি ত্বকে সক্রিয় সংক্রমণ, কোল্ড সোর, শিংলস, খোলা ক্ষত বা গুরুতর প্রদাহ থাকে, তাহলে ফেসিয়াল না করাই ভালো।
এ ছাড়া রোসেশিয়া, একজিমা, সোরিয়াসিস বা অতিসংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে আগে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শুধু ফেসিয়ালই কি যথেষ্ট
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দর ত্বকের জন্য নিয়মিত ফেসিয়ালের চেয়ে দৈনন্দিন ত্বকের যত্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এর মধ্যে রয়েছে—
- প্রতিদিন মুখ পরিষ্কার করা
- নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার
- প্রতিদিন অন্তত SPF ৩০-এর সানস্ক্রিন লাগানো
- প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে রেটিনল বা রেটিনয়েড ব্যবহার
ডা. ম্যাসিক বলেন, এসব অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের বার্ধক্যের লক্ষণ কমাতে শুধু ফেসিয়ালের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
অন্যদিকে, কোলাজেন বাড়ানো, সূক্ষ্ম বলিরেখা কমানো বা ব্রণের দাগ হালকা করার ক্ষেত্রে বোটক্স, মাইক্রোনিডলিং ও লেজার রিসারফেসিংয়ের মতো চিকিৎসা-পদ্ধতি ফেসিয়ালের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে এসব চিকিৎসা অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করানো উচিত।
ফেসিয়াল করানোর আগে যা জানবেন
ফেসিয়াল করানোর আগে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ ত্বক পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ বেছে নেওয়া জরুরি। কোন পণ্য ব্যবহার করা হবে, কী ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে এবং পরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে—এসব বিষয় আগে থেকেই জেনে নিন।
এ ছাড়া কোনও প্রসাধনী উপাদানে অ্যালার্জি থাকলে তা অবশ্যই আগে জানিয়ে দিন।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেসিয়াল ত্বককে সাময়িকভাবে উজ্জ্বল, সতেজ ও পরিচ্ছন্ন দেখাতে পারে এবং মানসিক প্রশান্তিও দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ ও সুন্দর ত্বকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত ত্বকের যত্ন, সূর্যের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ। তাই ফেসিয়ালকে ত্বকের যত্নের একটি সহায়ক অংশ হিসেবে দেখা উচিত, একমাত্র সমাধান হিসেবে নয়।