মালয়েশিয়ায় একদিন এমন কাণ্ড ঘটেছিল, যখন মানুষকে বলা হয়েছিল, “ইন্টারনেট থেকে একটু দূরে থাকুন!” তবে এটি কোনও ইন্টারনেট বিল না দেওয়ার শাস্তি ছিল না। বরং অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যই ছিল অভিনব প্রতিবাদ।
১৪ আগস্ট ২০১২, মালয়েশিয়ায় পালিত হয় ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ডে’। বিতর্কিত এভিডেন্স অ্যাক্ট-এর সেকশন ১১৪এ-এর বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদের আয়োজন করে সেন্টার ফর ইনডিপেন্ডেন্ট জার্নালিজম (সিআইজে)।
আইনের বিষয়টি ছিল বেশ মজার। আপনি কোনও ওয়েবসাইটের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু কোনও পোস্ট আপনি করেননি। তারপরও সেই পোস্টের জন্য আপনাকে দায়ী করা হতে পারে! অর্থাৎ, “পোস্ট আমি করিনি, কিন্তু দায়িত্ব আমার!”—এমন পরিস্থিতির আশঙ্কাই তৈরি হয়েছিল।
ওয়েবসাইটে অন্ধকার, কিন্তু প্রতিবাদে আলো: প্রতিবাদের অংশ হিসেবে অনেক ওয়েবসাইট তাদের স্বাভাবিক পেজের বদলে কালো পর্দা বা প্রতিবাদী ব্যানার দেখায়। সাধারণত ওয়েবসাইট খুললেই যেখানে খবর, ছবি আর নানা রকম পোস্ট দেখা যেত, সেদিন সেখানে যেন বলা হচ্ছিল, “আজ একটু অন্ধকার, কারণ অনলাইনের স্বাধীনতা নিয়ে আমরা চিন্তিত।”
নেতা-ব্লগার সবাই মাঠে: এই আন্দোলনে বিরোধী দলের নেতা, অধিকারকর্মী, ব্লগারসহ বিভিন্ন মহলের মানুষ সমর্থন জানান। ফলে বিষয়টি সাধারণ মানুষের পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও নজরে আসে। জনগণের চাপ বাড়তে থাকায় সরকারও বিতর্কিত আইনটি পুনর্বিবেচনার দিকে যায়। অর্থাৎ, নেট বন্ধ করে প্রতিবাদ, আর সেই প্রতিবাদেই সরকারের নজর খুলে গেল।
ইন্টারনেট ছাড়া দিন কাটাবেন কীভাবে: ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ডে পালন করতে চাইলে কয়েক ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে পারেন।
তারপর কী করবেন: বই পড়ুন। বোর্ড গেম খেলুন। হাঁটতে বের হন। পরিবারের সঙ্গে গল্প করুন।
তবে সাবধান! দুই ঘণ্টা পর কেউ যদি বলে, “ওয়াইফাই চলছে তো?” তাহলে বুঝবেন আসল পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
সচেতনতা পোস্ট করুন: ডিজিটাল অধিকার নিয়ে মিম বা গ্রাফিক তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারেন।
যদিও এখানে একটা ছোট সমস্যা আছে। ইন্টারনেট স্বাধীনতার পোস্ট দিতে গিয়ে ইন্টারনেটই বন্ধ করে দিলে পোস্টটি দেখবে কে?
পরিবারে আলোচনা করুন: বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে ইন্টারনেটের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করুন। কে কী মনে করেন, তা শুনুন। তবে পরিবারের কেউ যদি বলেন, “ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে তো তোমাকে সারাদিন ফোনে পাওয়া যাবে না!”, তখন আলোচনার বিষয় হঠাৎ পারিবারিক হয়ে যেতে পারে।
ডিজিটাল অধিকার সংগঠনকে সহায়তা: ডিজিটাল অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করতে পারেন। এতে অনলাইন স্বাধীনতা নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ এগিয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আন্দোলন থেকেও অনুপ্রেরণা: মালয়েশিয়ার এই আন্দোলন একই বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে SOPA ও PIPA-এর বিরুদ্ধে হওয়া অনলাইন প্রতিবাদ থেকেও অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। অর্থাৎ, প্রতিবাদের ভাষা ছিল আলাদা, কিন্তু বার্তা অনেকটাই একই, “ইন্টারনেট আছে বলেই কথা বলছি, তাই ইন্টারনেটের স্বাধীনতাটাও চাই।”
মালয়েশিয়ার ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ডে দেখিয়েছিল, অনলাইন জগতে মানুষ একসঙ্গে কোনও বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তার প্রভাব বাস্তব রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণেও পড়তে পারে।
আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা ইন্টারনেট বন্ধ করে প্রতিবাদ করা যায়, কিন্তু প্রতিবাদের খবর ছড়াতে আবার ইন্টারনেটই দরকার।
সুতরাং, নেটিজেনদের জীবন সত্যিই জটিল, নেট থাকলেও সমস্যা, নেট না থাকলেও সমস্যা।