একটি আশ্রয়, একটুখানি ভালোবাসায় বাঁচতে পারে একটি প্রাণ

প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণী হারিয়ে যায়, পরিত্যক্ত হয় কিংবা এমন সব আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই পায়, যেগুলো মূলত দাতব্য সংস্থা ও মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত অর্থ, জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে এসব প্রতিষ্ঠানকে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বিপুলসংখ্যক প্রাণীর যত্ন নিতে হয়। একই সঙ্গে গৃহহীন ও পরিত্যক্ত প্রাণীদের দুরবস্থা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও তারা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। আজ তাদের পাশে দাঁড়ানোর দিন। অর্থাৎ আজ আন্তর্জাতিক গৃহহীন প্রাণী দিবস।

শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও দিবসটি পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পোষা প্রাণী পরিত্যাগের সমস্যা, পথভ্রষ্ট ও গৃহহীন প্রাণীদের দুর্দশা এবং গৃহপালিত প্রাণীর বন্ধ্যাকরণের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।

আন্তর্জাতিক গৃহহীন প্রাণী দিবসের ইতিহাস

১৯৯২ সালে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর অ্যানিম্যাল রাইটস (আইএসএআর) এই দিবসের সূচনা করে। রাস্তায় অসহায় অবস্থায় বেঁচে থাকা প্রাণীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য উদ্ধারকেন্দ্র ও প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে দিবসটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

গৃহপালিত কুকুর ও বিড়াল খাবার, আশ্রয় ও যত্নের জন্য মানুষের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা যখন গৃহহীন হয়ে পড়ে, তখন তাদের জীবন নেমে আসে অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে। এই বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং গৃহহীন প্রাণীদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি স্থানীয় প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমেও তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।

আশ্রয়কেন্দ্রের ওপর বাড়ছে চাপ

গৃহহীন প্রাণীদের যত্ন নিতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো যথাসাধ্য চেষ্টা করে। কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা, জনবল ও অর্থের অভাবে সব প্রাণীকে দীর্ঘদিন নিরাপদে রাখা অনেক সময় সম্ভব হয় না। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেলে অনেক কুকুর ও বিড়ালের জন্য নতুন পরিবার খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু প্রাণীকে ইউথানেশিয়া বা মানবিকভাবে মৃত্যুবরণ করানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়। 

আশ্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত প্রাণীর চাপের কারণে প্রতি বছর ২৫ লাখেরও বেশি কুকুর ও বিড়াল প্রাণ হারায়।

তাই আন্তর্জাতিক গৃহহীন প্রাণী দিবস কেবল একটি দিবস পালনের উপলক্ষ নয়, বরং অসহায় প্রাণীদের জন্য মানুষকে একত্রিত করা, দায়িত্বশীল পোষা প্রাণী পালনকে উৎসাহিত করা এবং তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

কীভাবে পালন করবেন

গৃহহীন প্রাণীদের পাশে দাঁড়ানোর অনেক উপায় রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু ও সমাজের অন্যদেরও এ কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।

আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পোষা প্রাণী দত্তক নিন

পরিবারের নতুন সদস্য হিসেবে কোনও ব্রিডারের কাছ থেকে প্রাণী কেনার পরিবর্তে একটি প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র থেকে দত্তক নেওয়ার কথা বিবেচনা করুন। এতে একটি গৃহহীন প্রাণী যেমন নিরাপদ আশ্রয় পাবে, তেমনি আশ্রয়কেন্দ্রেও নতুন একটি প্রাণীর জন্য জায়গা তৈরি হবে।

গৃহহীন প্রাণীদের সম্পর্কে আরও জানুন

গৃহহীন প্রাণীদের দুর্দশা সম্পর্কে জানার পাশাপাশি এসব তথ্য পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে অন্যদেরও সচেতন করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো— প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ লাখেরও বেশি পোষা প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে আসে। তাদের বেশিরভাগই আর তাদের মালিকের কাছে ফিরে যেতে পারে না। আশ্রয়কেন্দ্রে আসা পোষা প্রাণীর মাত্র ১০ শতাংশ বন্ধ্যাকরণ করা থাকে। ফলে অনিয়ন্ত্রিত প্রজননের কারণে পরিত্যক্ত প্রাণীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। জন্ম নেওয়া প্রতি ১০টি কুকুরের মধ্যে মাত্র একটি স্থায়ীভাবে একটি বাড়ি খুঁজে পায়। ধারণা করা হয়, যেকোনো সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭ কোটি পথভ্রষ্ট বা গৃহহীন বিড়াল থাকতে পারে।

আর্থিক অনুদান দিন

সবাই পোষা প্রাণী দত্তক নিতে পারেন না। কারও বাড়িতে ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত পোষা প্রাণী রয়েছে, আবার কেউ হয়তো সময়, জায়গা বা সামর্থ্যের অভাবে নতুন প্রাণীর দায়িত্ব নিতে পারেন না। তবুও তারা আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে গৃহহীন প্রাণীদের পাশে দাঁড়াতে পারেন।

স্থানীয় প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে আর্থিক অনুদান দিলে তা প্রাণীদের খাবার, চিকিৎসা, টিকা, বন্ধ্যাকরণ এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াই হতে পারে আন্তর্জাতিক গৃহহীন প্রাণী দিবস পালনের অন্যতম মানবিক উদ্যোগ।