৭ মিনিটের স্ট্রেস কমানোর ব্যায়াম

পৃথিবী এখন নানা অনিশ্চয়তায় ভরা। রাজনীতি, কর্মজীবন কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিষয়—সবকিছুতেই যেন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। এই অস্থিরতা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মন ও শরীর এক ধরনের স্থায়ী সতর্ক অবস্থায় চলে যেতে পারে।

উদ্বেগের এই মানসিক অভিজ্ঞতা শরীরে নানা উপসর্গ তৈরি করতে পারে। যেমন—হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়া এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অগভীর হয়ে যাওয়া।

কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির (সিবিটি) মতো পদ্ধতি উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে পারে। তবে এমন কিছু কৌশলও রয়েছে, যা শরীরের মাধ্যমে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান দিয়েগোর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক ও সেন্টার ফর মাইন্ডফুলনেসের পরিচালক ক্যাসান্দ্রা ভিয়েটেন বলেন, “শরীর ও মনের মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী করা একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া।”

তার মতে, যেমন চিন্তাভাবনা শরীরকে প্রভাবিত করতে পারে, তেমনি শরীরের নড়াচড়াও চিন্তা ও অনুভূতির ওপর প্রভাব ফেলে। এটি অনেকটা মাইন্ডফুলনেসকে উল্টো দিক থেকে তৈরি করার মতো।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিটনেস ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এমন কিছু শারীরিক অনুশীলন নিয়ে কাজ করছেন, যা প্রয়োজনের সময় মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। প্রচলিত ব্যায়ামের মতো এসব অনুশীলনের লক্ষ্য সাধারণত হৃদস্পন্দন বাড়ানো নয়, বরং শরীর ও মনকে শান্ত করা।

এসব অনুশীলন সোমাটিক মুভমেন্ট, এমবডিড এক্সারসাইজ বা যোগ থেরাপি নামেও পরিচিত। সাধারণভাবে এগুলোকে ‘মাইন্ডফুল মুভমেন্ট’ বা সচেতন শারীরিক অনুশীলনের অংশ হিসেবে ধরা হয়। এ বিষয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও বেশিরভাগ অনুশীলন সহজ, কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং কম তীব্রতার।

এই বিষয়টি মাথায় রেখে দ্য টাইমস শিকাগোভিত্তিক নৃত্য ও মুভমেন্ট থেরাপিস্ট এরিকা হর্নথালসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সহায়তায় তৈরি করেছে সাত মিনিটের একটি সহজ ব্যায়ামধারা। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে এটি দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ করা যেতে পারে।

যা যা প্রয়োজন

  • একটি মেডিসিন বল বা বালিশ
  • পছন্দের কিছু গানের ছোট প্লেলিস্ট

কত ঘন ঘন করবেন

এই ব্যায়াম আলাদা রুটিন হিসেবে করা যায়। চাইলে নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি অতিরিক্ত অনুশীলন হিসেবেও যোগ করা যেতে পারে।

প্রতিদিন একই সময়ে করার জন্য অ্যালার্ম সেট করতে পারেন। আবার যখনই নিজেকে উদ্বিগ্ন, চাপগ্রস্ত বা অস্থির মনে হবে, তখনও এটি করতে পারেন।

নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী মানিয়ে নিন

এগুলোকে প্রাথমিক নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী অনুশীলনগুলো মিলিয়ে নিতে পারেন বা আলাদাভাবেও করতে পারেন। যে ব্যায়ামগুলো বেশি কার্যকর মনে হবে, সেগুলো রাখুন। যেগুলো তেমন উপকার দিচ্ছে না, সেগুলো বাদ দিতে পারেন।

ব্যায়ামগুলো দাঁড়িয়ে করা যায়। ভারসাম্যের প্রয়োজন হলে চেয়ারে বসেও করা সম্ভব। স্কোয়াট করতে অসুবিধা হলে শুধু হাত সামনে ও ওপরে প্রসারিত করেও অনুশীলন করা যাবে।

ওয়ার্ম আপ

গভীর শ্বাস নিন: ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া শুরু করুন। একটি হাত বুকের ওপর এবং অন্য হাত পেটের ওপর রাখুন।

নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সময় পেট ফুলে উঠবে। এরপর মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়ার সময় পেট ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে যাবে। এভাবে তিনবার করুন।

কেন করবেন: এই পদ্ধতিকে ডায়াফ্র্যাগম্যাটিক ব্রিদিং বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় করতে সাহায্য করতে পারে, যা হৃদস্পন্দন ধীর করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

ধাক্কা দেওয়া ও টেনে আনা: দুই হাত বুকের সামনে রাখুন। নাক দিয়ে শ্বাস নিন এবং মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়ার সময় হাতের তালু সামনে দিকে ঠেলে দিন।

এরপর হাত মুঠো করে শ্বাস নিতে নিতে আবার বুকের দিকে টেনে আনুন।

মনে করুন, আপনি চাপ ও দুশ্চিন্তাকে দূরে সরিয়ে শান্তিকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করছেন। তিনবার পুনরাবৃত্তি করুন।

কেন করবেন: ডা. ভিয়েটেন বলেন, শরীরের মাধ্যমে শান্ত ও স্থির থাকার অনুভূতি প্রকাশ করলে মস্তিষ্কও সেই অনুভূতি গ্রহণ করতে পারে।

তিনি বলেন, “মস্তিষ্ক শুধু শরীরের অন্য অংশে সংকেত পাঠায় না, শরীর থেকেও সংকেত গ্রহণ করে।”

তীব্রতা বাড়ান

ঝাঁকিয়ে নিন: মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধীরে ধীরে শরীর ঝাঁকান। নিজের স্বস্তি অনুযায়ী গতি ও তীব্রতা ঠিক করুন।

কেন করবেন: মুভমেন্ট থেরাপিস্টদের মতে, এই অনুশীলন শরীরে জমে থাকা অস্থিরতা কমাতে এবং মানসিক চাপ কিছুটা প্রশমিত করতে সাহায্য করতে পারে।

এক পাশ থেকে অন্য পাশে দুলুন: দুই পা মাটিতে রেখে হাঁটু সামান্য ভাঁজ করুন। কাঁধ শিথিল রাখুন। চিন্তার গতির সঙ্গে মিলিয়ে শরীরকে এক পাশ থেকে অন্য পাশে দোলান।

মন দ্রুত ছুটলে শুরুতে দ্রুত দুলুন, এরপর ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে আনুন।

কেন করবেন: ছন্দময় ও স্থির নড়াচড়া স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে পারে এবং শরীরে স্থিতিশীলতার অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করে।

একাই নাচের আসর: পছন্দের একটি গান চালিয়ে গান শেষ হওয়া পর্যন্ত মাঝারি তীব্রতায় নাচুন বা ছন্দ মিলিয়ে হাঁটুন।

কেন করবেন: নাচ বা ছন্দময় নড়াচড়া জমে থাকা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এটি ডোপামিন ও এন্ডোরফিনের মতো মেজাজ ভালো করা রাসায়নিক নিঃসরণেও ভূমিকা রাখতে পারে।

কোমর নড়াচড়া করুন: ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড পর্যন্ত কোমর ঘোরান, ফ্লস ড্যান্সের মতো নড়াচড়া করুন অথবা হুলার মতো শরীর দোলান।

কেন করবেন: চাপের কারণে কোমরের পেশিতে টান তৈরি হতে পারে। কোমর নড়াচড়া করলে সেই চাপ কমে শরীর আরও শিথিল অনুভব করতে পারে।

মেডিসিন বল ছুড়ে মারা: একটি হালকা মেডিসিন বল বা বালিশ হাতে নিন। দুই পা কোমর-প্রস্থ দূরে রেখে দাঁড়ান এবং হাঁটু সামান্য ভাঁজ করুন।

বলটি মাথার ওপর তুলে ধীরে ধীরে পায়ের মাঝ বরাবর নামিয়ে মেঝেতে আছড়ে ফেলুন। চাইলে বসেও করা যেতে পারে। এক থেকে তিনবার করুন।

কেন করবেন: মিস হর্নথালের মতে, তীব্র আবেগ শারীরিকভাবে প্রকাশ করা অনেক সময় সেই  অনুভূতি থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে।

হাত ওপরে তুলে স্কোয়াট: ধীরে স্কোয়াট করুন। এরপর দাঁড়ানোর সময় দুই হাত ওপরের দিকে প্রসারিত করুন। শরীরকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত অনুভব করার দিকে মনোযোগ দিন। পাঁচবার পুনরাব্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার ও প্রশৃত্তি করুন।

কেন করবেন: ট্রমা ইনফর্মড ওয়েট লিফটিংয়ের সহ-পরিচালক ক্যান্ডেস লাইগারের মতে, স্কোয়াট শরীরে স্থিতিশীলতার অনুভূতি তৈরি করে। উদ্বেগের কারণে অস্থির বা বিচ্ছিন্ন অনুভূতি হলে এটি সহায়ক হতে পারে।

কুল ডাউন

স্বস্তির নিঃশ্বাস নিন এবং নিজেকে জড়িয়ে ধরুন: নাক দিয়ে শ্বাস নিন। এরপর শ্বাস ছাড়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলুন। তিন থেকে ছয়বার করুন। প্রতিবার দীর্ঘশ্বাস আরও গভীর করার চেষ্টা করুন।

এরপর দুই হাত দিয়ে নিজের শরীর জড়িয়ে ধরে অন্তত ১০ সেকেন্ড থাকুন।

কেন করবেন: মিস হর্নথালের মতে, দীর্ঘশ্বাস নেওয়া ডায়াফ্র্যাগম্যাটিক ব্রিদিংয়ের মতো শরীরকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। এটি অক্সিজেন গ্রহণ বাড়ায় এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক করতে ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, নিজেকে জড়িয়ে ধরা শরীরে নিরাপত্তা ও স্বস্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে।

এই ব্যায়ামধারা তৈরিতে দ্য টাইমস ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার ও প্রশিক্ষক এমিলি ইয়ং এবং ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক ডার্লিন মার্শালের পরামর্শও নেওয়া হয়েছে।