সম্প্রতি এক গবেষণায় বাংলাদেশে প্রচলিত ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তবে এখানেও কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, বাজারে এখনও কিছু টুথপেস্ট পাওয়া যাচ্ছে যাতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। তবে এর মধ্যেও আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু টুথপেস্টে নয়, মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার করা টুথব্রাশেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক। যা মানবদেহে প্রবেশ করে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মেডিক্যাল বিষয়ক বিভিন্ন জার্নাল ঘেঁটে জানা গেছে, দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথব্রাশের পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক ব্রিসল বা আঁশগুলো সরাসরি মানুষের রক্তপ্রবাহে মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গত করে। পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক ডেন্টাল ফ্লসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। মুখের ভেতরের পরিবেশের যান্ত্রিক বল, তাপমাত্রা এবং পিএইচ-এর প্রভাবে টুথব্রাশের আঁশের ক্ষয় ঘটে থাকে, যেগুলো সাধারণত নাইলন বা পলিবিউটিলিন টেরেফথালেট দিয়ে তৈরি।
দ্য মাইক্রোকেমিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, টুথব্রাশ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৯টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গত হয়। তবে সবচেয়ে কম দামি ব্র্যান্ডগুলো বিভিন্ন রূপে (টুকরো, আঁশ, ফিল্ম ও পেলেট) সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কণা তৈরি করে।
জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল পলিউশনে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবার ব্রাশ করার সেশনে ১২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করে। আপনি যদি হিসাব করেন এবং ধরে নেন যে মানুষ দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করে, তবে তা বছরে ৮৮,০০০টি পর্যন্ত কণার সমান হবে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল পলিউশনে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে, টুথব্রাশ সূক্ষ্ম প্লাস্টিকের কণা ঝরাতে পারে এবং এই কণাগুলোকে স্পষ্ট দেখতে ও এদের ম্যাপ করতে একটি উন্নত রমন ইমেজিং কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, প্লাস্টিকের টুথব্রাশ মানুষের মুখে ছোট ছোট বর্জ্য বা টুকরো নির্গত করতে পারে, যা পরিপাকতন্ত্রে সম্ভাব্য ও প্রতিকূল প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এগুলো ব্যাকটেরিয়া, বিসফেনলের মতো প্লাস্টিসাইজার অ্যাডিটিভ— যা টুথপেস্টেও পাওয়া যেতে পারে, এবং অন্যান্য দূষণকারী উপাদানের পরিবহনের বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে এর জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে এই উপাদানের সংস্পর্শে থাকাটা প্রদাহ সৃষ্টি করে ও পেটের মাইক্রোবায়োমের ক্ষতি করে, যা দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্লাস্টিক টুথব্রাশ থেকে নির্গত মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে কমাবেন
বর্জ্য বা কণা নির্গত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার আগেই ঘন ঘন টুথব্রাশ পরিবর্তন করুন।
টুথব্রাশ ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকুন এবং আলতোভাবে ব্রাশ করুন।
ব্যবহারের আগে এবং পরে সবসময় আপনার টুথব্রাশ পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন।
সমস্যাটি পুরোপুরি দূর করতে, ব্রিসল বা আঁশসহ শতভাগ প্রাকৃতিক ও জৈব উপাদানে তৈরি টুথব্রাশে স্যুইচ করুন বা তা ব্যবহার শুরু করুন।
যে টুথব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন
বাঁশের তৈরি টুথব্রাশ: এগুলোর হ্যান্ডেল বা হাতল টেকসই উপায়ে সংগ্রহ করা বাঁশ থেকে তৈরি। এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই পানি-নিরোধক, জীবাণু-বিরোধী ও পুরোপুরি কম্পোস্টেবল বা মাটিতে পচনশীল।
নিম কাঠের টুথব্রাশ: নিম কাঠ দিয়ে তৈরি, যা মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া কমাতে শক্তিশালী ঐতিহ্যবাহী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বা জীবাণু-বিরোধী গুণাবলী বহন করে।
মিসওয়াক (সালভাডোরা পারসিকা) স্টিক: গাছের ডাল দিয়ে তৈরি প্রাচীনকালের ব্রাশ, যা কোনও বাড়তি সামগ্রী ছাড়াই সরাসরি দাঁত পরিষ্কার করতে এবং প্রাকৃতিক উপকারী খনিজ উপাদান সরবরাহ করতে ব্যবহৃত হয়।
ক্যাস্টর বিন অয়েল/উদ্ভিজ্জ উপাদানে তৈরি ব্রিস্টল: নবায়নযোগ্য উদ্ভিজ্জ তেল থেকে তৈরি, যা ফ্লেক্সিবল বা নমনীয়, পেট্রোলিয়াম-মুক্ত এবং জৈব-ভিত্তিক উপায়ে দাঁত পরিষ্কারের সুবিধা দেয়।
বিপিএ-মুক্ত নাইলন: এটি প্রায়শই বাঁশের হ্যান্ডেলের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, কারণ এটি বিপিএ-এর মতো ক্ষতিকর হরমোন-ভারসাম্যহীনতাকারী রাসায়নিক উপাদান থেকে মুক্ত থেকেই দাঁতের প্লাক বা ময়লা কার্যকরভাবে দূর করতে পারে। তবে বাঁশের অংশটি মাটিতে ফেলার বা কম্পোস্ট করার আগে হাতল থেকে নাইলনের আঁশগুলো টেনে খুলে নিতে হবে।
অ্যাক্টিভেটেড চারকোল-ইনফিউজড ব্রিস্টল: এতে প্রাকৃতিক চারকোল বা কয়লার গুঁড়ো যুক্ত করা থাকে, যা আলতোভাবে দাঁতের ওপরের অংশের দাগ দূর করতে সাহায্য করে।