ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসবগুলের ভুসি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ একে বলছেন ‘পেটের জন্য অলৌকিক সাপ্লিমেন্ট’, কেউ বলছেন ‘প্রকৃতির ওজেম্পিক’, আবার কারও মতে এটি ‘বিশ্বের অন্যতম অবমূল্যায়িত সাপ্লিমেন্ট’।
হজমের সমস্যা কমানো থেকে শুরু করে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, রক্তে শর্করার মাত্রা কমানো এবং ওজন কমানোর আশায় অনেকেই নিয়মিত ইসবগুল খাচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো,ইসবগুলের ভুসির এসব উপকারিতা কি সত্যিই গবেষণায় প্রমাণিত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসবগুলের কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সমর্থিত হলেও, এর সব জনপ্রিয় দাবির পক্ষে সমান শক্ত প্রমাণ নেই।
ইসবগুলের ভুসি কীভাবে কাজ করে
ইসবগুলের ভুসি তৈরি হয় একটি উদ্ভিদের বীজের আবরণ থেকে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে মিউসিলেজ থাকে, যা এক ধরনের দ্রবণীয় আঁশ। এটি যা পানির সংস্পর্শে এলে জেলের মতো ঘন পদার্থ তৈরি করে।
বাজারে এটি সাধারণত পুরো ভুসি, গুঁড়ো করা ভুসি এবং ক্যাপসুল আকারে পাওয়া যায়।
হজমের জন্য ইসবগুল: বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
মিশিগান মেডিসিনের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান ডা. উইলিয়াম ডি. চে বলেন, ইসবগুল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের কাছে অন্যতম নির্ভরযোগ্য আঁশজাতীয় সাপ্লিমেন্ট।
তার মতে, “কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস)” সমস্যায় ইসবগুল কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে বলেই চিকিৎসকেরা এটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
তবে শুধু কোষ্ঠকাঠিন্য নয়, আইবিএসের আরেকটি সাধারণ সমস্যা ডায়রিয়ার ক্ষেত্রেও এটি উপকারী হতে পারে।
বোস্টনের ডায়েটিশিয়ান কেট স্কারলাটা বলেন, ইসবগুল অন্ত্রের অতিরিক্ত তরল শোষণ করে ডায়রিয়ার সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তিনি আরও জানান, অন্য অনেক আঁশজাতীয় সাপ্লিমেন্টের তুলনায় ইসবগুলে গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা কম হতে পারে। কারণ, অন্ত্রের বেশিরভাগ অণুজীব ইসবগুলের আঁশ সহজে ভাঙতে পারে না। সাধারণত আঁশ ভাঙার সময়ই বেশি গ্যাস তৈরি হয়।
কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করায় প্রভাব
পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক পেনি ক্রিস-ইথারটন বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে ইসবগুল কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মাত্রা সামান্য কমাতে পারে।
২০১৮ সালে ২৮টি ছোট গবেষণার একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চ কোলেস্টেরলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রতিদিন প্রায় ১০ গ্রাম ইসবগুল অন্তত তিন সপ্তাহ গ্রহণ করলে তাদের এলডিএল বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ কিছুটা কমেছে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তদের নিয়ে ২০২৪ সালের আরেকটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসবগুল রক্তে শর্করার মাত্রা সামান্য কমাতে পারে।
ডায়েটিশিয়ান কেট স্কারলাটা ব্যাখ্যা করে বলেন, ইসবগুলের আঁশ অন্ত্রে কোলেস্টেরল থেকে তৈরি বাইল অ্যাসিডের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে শরীর থেকে এসব অ্যাসিড বেশি বের হয়ে যায় এবং রক্তের এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
এছাড়া ইসবগুল কার্বোহাইড্রেট হজমের গতি ধীর করে। ফলে গ্লুকোজ ধীরে ধীরে রক্তে প্রবেশ করে এবং রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে।
ডা. পেনি ক্রিস-ইথারটনের মতে, এসব প্রভাব উচ্চ কোলেস্টেরল, টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা প্রিডায়াবেটিসে থাকা ব্যক্তিদের জন্য উপকারী হতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু ইসবগুলের ওপর নির্ভর না করে পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ, ফল ও সবজির মতো প্রাকৃতিক আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া আরও বেশি উপকারী।
ওজন কমাতে কি ইসবগুল কার্যকর
ইসবগুল অন্ত্রে ফুলে ওঠে এবং কার্বোহাইড্রেট হজমের গতি ধীর করে। ফলে এটি খাওয়ার পর কিছু সময় পেট ভরা অনুভূতি হতে পারে।
ম্যাস জেনারেল ব্রিঘামের ডায়েটিশিয়ান জুলিয়া লয়েড বলেন, ইসবগুল খাওয়ার পর এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত পেট ভরা অনুভূতি হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা যায়, এই অনুভূতি সবসময় ওজন কমানোর ফলাফলে রূপ নেয় না।
২০২০ সালের ২২টি ছোট গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসবগুল গ্রহণকারীদের ওজন, বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) বা কোমরের পরিধি কমানোর ক্ষেত্রে প্লাসিবো গ্রহণকারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
কীভাবে খাবেন ইসবগুল
জুলিয়া লয়েড বলেন, আঁশ পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উৎস হলো প্রাকৃতিক খাবার। তবে যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য, আইবিএস, উচ্চ কোলেস্টেরল, টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা প্রিডায়াবেটিস রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ইসবগুল ব্যবহার করতে পারেন।
যারা খাবার থেকে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ২৫ থেকে ৩৮ গ্রাম আঁশ গ্রহণ করতে পারছেন না, তাদের জন্য ইসবগুল একটি সহায়ক উৎস হতে পারে।
ডায়েটিশিয়ান কেট স্কারলাটা প্রথমে অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করার পরামর্শ দেন। তার মতে, প্রথম এক বা দুই সপ্তাহ প্রতিদিন প্রায় ৫ গ্রাম করে শুরু করলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি কম হতে পারে।
তিনি স্মুদি, ওটমিল ও মাফিনের সঙ্গে ইসবগুলের গুঁড়ো মিশিয়ে খাওয়ার কথাও বলেন। তবে বেশিরভাগ মানুষ পানি বা জুসের সঙ্গে মিশিয়েই এটি গ্রহণ করেন।
পানি পান করা জরুরি
জুলিয়া লয়েড বলেন, ইসবগুল পানি শোষণ করে বলে এটি খাওয়ার সময় অন্তত এক থেকে দুই কাপ পানি পান করা উচিত। পাশাপাশি সারা দিন পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
কারা সতর্ক থাকবেন
ডা. উইলিয়াম ডি. চে বলেন, ইসবগুল প্রতিদিন গ্রহণ করা সাধারণত নিরাপদ। তবে ওষুধ খাওয়ার দুই ঘণ্টার আগে বা পরে এটি না খাওয়াই ভালো, কারণ এটি কিছু ওষুধের শোষণ কমিয়ে দিতে পারে।
যাদের গ্যাস্ট্রোপেরেসিস (পাকস্থলী খালি হতে দেরি হওয়া) বা আগে অন্ত্রে ব্লক হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের ইসবগুল গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।
ইসবগুল কোনও জাদুকরী ওষুধ নয়, আবার শুধুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ডও নয়। গবেষণা বলছে, এটি একটি কার্যকর দ্রবণীয় আঁশ, যা বিশেষ করে হজমের সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং কিছু ক্ষেত্রে কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শের সঙ্গে মিলিয়েই ইসবগুল ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো।