জ্বর হলে ঠান্ডা নাকি গরম পানিতে গোসল? কী বলছেন চিকিৎসকেরা

জ্বর এলেই অনেকের মনে প্রথম প্রশ্ন আসে এ অবস্থায় কি গোসল করা যাবে? কেউ বলেন, জ্বরের সময় একেবারেই গোসল করা উচিত নয়। আবার কেউ শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমাতে ঠান্ডা বা বরফ-ঠান্ডা পানিতে গোসল করার পরামর্শ দেন। বিপরীতে কেউ কেউ খুব গরম পানি দিয়ে শরীর ধুয়ে নেন।

আসলে জ্বরের সময় গোসল করা পুরোপুরি নিষেধ নয়। তবে কী ধরনের পানি ব্যবহার করছেন এবং শরীরের অবস্থা কেমন সেটি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিষয়ক গাইডলাইনগুলোতে জ্বরের সময় আরাম দেওয়ার জন্য কুসুম গরম পানিতে গোসল বা স্পঞ্জিংয়ের কথা বলা হয়েছে।

বরফ-ঠান্ডা পানিতে স্নান করবেন

জ্বরের সময় শরীরের তাপমাত্রা কমানোর আশায় হিমশীতল পানিতে নেমে পড়া ভালো ধারণা নয়। ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে শরীরে কাঁপুনি বা শিরশিরানি শুরু হতে পারে। কাঁপুনি আসলে শরীরের নিজস্ব তাপ উৎপাদনের একটি প্রক্রিয়া। ফলে ঠান্ডা পানি ব্যবহার করে আরাম পাওয়ার বদলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।

তাই সাধারণ জ্বরের ক্ষেত্রে শরীর ঠান্ডা করার জন্য বরফ-ঠান্ডা পানি ব্যবহার না করাই ভালো।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হিটস্ট্রোক বা অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেলে দ্রুত ঠান্ডা করার জন্য ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া চিকিৎসার অংশ হতে পারে। এটি সাধারণ জ্বরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং হিটস্ট্রোক হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

খুব গরম পানিও কি ঠিক নয়

জ্বরের সময় অতিরিক্ত গরম পানিতে দীর্ঘক্ষণ গোসল করাও আরামদায়ক নাও হতে পারে। গরম পরিবেশে ঘাম ও তরলক্ষয় বাড়তে পারে, আর জ্বরে এমনিতেই পানিশূন্যতার ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত গরম পানি দুর্বলতা বা মাথা ঘোরার মতো অস্বস্তিও বাড়াতে পারে।

তাই শরীরের তাপমাত্রা কমানোর জন্য খুব গরম পানি ব্যবহার করারও প্রয়োজন নেই। বরং আরামদায়ক উষ্ণ বা কুসুম গরম পানি বেছে নেওয়াই ভালো।

তাহলে জ্বর হলে কীভাবে স্নান করবেন

জ্বর থাকলেও যদি শরীরের অবস্থা মোটামুটি ভালো থাকে এবং স্নান করতে অসুবিধা না হয়, তাহলে কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ের জন্য গোসল করা যেতে পারে। এতে জ্বরের মূল কারণ সেরে যায় না, তবে ঘাম, অস্বস্তি ও শরীরের ভারী লাগার অনুভূতি কিছুটা কমতে পারে।

স্নানের সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন, পানি যেন খুব ঠান্ডা বা খুব গরম না হয়, দীর্ঘ সময় ধরে গোসল না করাই ভালো, শরীর দুর্বল লাগলে একা বাথরুমে না যাওয়াই নিরাপদ, গোসলের পর শরীর ভালোভাবে মুছে শুকনো পোশাক পরুন এবং স্নানের পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল পান করুন।

খুব দুর্বল হলে স্নান না করাই ভালো

জ্বরের সঙ্গে যদি অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, অচেতন ভাব, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, বারবার বমি, তীব্র মাথাব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকে, তখন শুধু স্নান করা যাবে কি না এই প্রশ্নে আটকে না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের অন্য কোনও গুরুতর শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে জ্বরের কারণ ও অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

জ্বর কমানোর চেয়ে কারণটা জানা বেশি জরুরি

মনে রাখতে হবে, জ্বর নিজে কোনও রোগ নয়। এটি শরীরে কোনও সমস্যা বা সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজ করার সময় তাপমাত্রা বেড়ে যায়।

তাই শুধু গোসল করে শরীরের তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করলেই হবে না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরের সঙ্গে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

তাহলে সহজ উত্তর

জ্বর হলেই গোসল বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। আবার বরফ-ঠান্ডা পানি বা ফুটন্ত গরম পানিও নয়। শরীরের অবস্থা ভালো থাকলে কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ের জন্য গোসল করা যেতে পারে।

আর জ্বরের সঙ্গে যদি গুরুতর কোনও উপসর্গ থাকে, তখন ঘরোয়া উপায়ে জ্বর কমানোর চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

 

তথ্যসূত্র: মেডলাইনপ্লাস, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকস, মায়ো ক্লিনিক।