সিঙাড়া কি সত্যিই অস্বাস্থ্যকর? উত্তর লুকিয়ে আছে তৈরির পদ্ধতিতে

বিকালের নাশতায় গরম গরম সিঙাড়া বাঙালির কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি খাবার। চায়ের সঙ্গে মুচমুচে সিঙাড়া দেখলে অনেকেই না বলতে পারেন না। তবে সিঙাড়ার নাম শুনলেই অনেকে একে ‘অস্বাস্থ্যকর খাবার’ বলে এড়িয়ে চলেন। আসলেই কি সিঙাড়া সবসময় অস্বাস্থ্যকর?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও খাবারকে শুধু তার নাম দিয়ে স্বাস্থ্যকর বা অস্বাস্থ্যকর বলা ঠিক নয়। খাবারটি কী উপকরণে তৈরি হচ্ছে, কতটা তেল ব্যবহার করা হচ্ছে, তেল কতবার ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কতটা পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

সিঙাড়াকে অস্বাস্থ্যকর মনে করার অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত তেল। বিশেষ করে একই তেল বারবার ব্যবহার করে ভাজা খাবার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তেল বারবার উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করলে তাতে নানা রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং খাবারের গুণমানও কমতে পারে।

তবে বর্তমানে অনেক ছোট দোকান বা বাসাবাড়ির সামনে তৈরি করা খাবারের দোকানে নতুন তেলে সিঙাড়া ভেজে বিক্রি করা হয়। এ ক্ষেত্রে পুরোনো তেলের সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। তবে শুধু নতুন তেল ব্যবহার করলেই সিঙাড়া স্বাস্থ্যকর খাবারে পরিণত হয় না।

কারণ সিঙাড়া সাধারণত ময়দার আবরণ ও তেলেভাজা হওয়ায় এতে ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে।

একটি সিঙাড়ার স্বাস্থ্যগত দিক নির্ভর করে এর ভেতরের পুরের ওপরও। আলু, মটরশুঁটি, বিভিন্ন সবজি, ডাল কিংবা মসলা দিয়ে তৈরি পুরের পুষ্টিমান এক রকম নয়।

শুধু আলু ও মশলা দিয়ে তৈরি পুরের তুলনায় বিভিন্ন সবজি বা ডাল যুক্ত পুরে আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান বেশি থাকতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত কী পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন তেলে ভাজা খাবার পুরোনো বা বারবার ব্যবহৃত তেলে ভাজা খাবারের তুলনায় ভালো বিকল্প হতে পারে। কিন্তু তেলের পরিমাণ বেশি হলে খাবারে ক্যালরিও বেশি থাকবে।

এ ছাড়া তেল কতটা পরিষ্কার, কী ধরনের তেল ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ভাজার সময় তেলের তাপমাত্রা কেমন রাখা হচ্ছে এসব বিষয়ও বিবেচনা করা দরকার।

তাই দোকানে সিঙাড়া ভাজার সময় যদি দেখা যায় তেল অত্যন্ত কালচে, ঘন বা দীর্ঘ সময় ধরে একই তেলে বিভিন্ন খাবার ভাজা হচ্ছে, তাহলে সে খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।

সিঙাড়া খেতে ভালোবাসলে মাঝে মাঝে বাড়িতেও তৈরি করা যেতে পারে। এতে ময়দার পরিমাণ, পুরের উপকরণ এবং তেলের ব্যবহার সবকিছু নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আলুর সঙ্গে মটরশুঁটি, গাজর, ফুলকপি বা অন্যান্য সবজি যোগ করলে পুরে বৈচিত্র্য আনা যায়। চাইলে ভাজার পরিবর্তে অল্প তেলে তৈরি করার পদ্ধতিও বেছে নেওয়া যেতে পারে।

সিঙাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো খাওয়ার পরিমাণ। মাঝে মধ্যে একটি সিঙাড়া খাওয়া এবং নিয়মিত একাধিক সিঙাড়া খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

বিশেষ করে যাদের ওজন নিয়ন্ত্রণ, রক্তে শর্করা বা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের মতো বিষয় নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়, তাদের নিয়মিত তেলে ভাজা খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণের দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সিঙাড়া খেতে চাইলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা যেতে পারে, একই তেল বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে এমন দোকান এড়িয়ে চলুন। অতিরিক্ত বড় সিঙাড়া না খাওয়াই ভালো। কারণ পরিমাণ যত বেশি হবে, ক্যালরিও তত বাড়তে পারে। শুধু আলুর বদলে সবজি বা ডালযুক্ত পুর বেছে নিতে পারেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখুন। খাবার ঢেকে রাখা হচ্ছে কি না এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন কি না, সেদিকে নজর দিন। তেলে ভাজা খাবারকে প্রতিদিনের নাশতার বদলে মাঝে মধ্যে খাওয়াই ভালো।

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, ‘তাহলে সিঙাড়া কি একেবারেই বাদ।’ সিঙাড়া খাওয়াকে একেবারে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং খাবারের ধরন, তৈরির পদ্ধতি, তেলের মান এবং খাওয়ার পরিমাণ সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ, সিঙাড়া মানেই পুরোনো তেলে ভাজা অস্বাস্থ্যকর খাবার, এমন ধারণা ঠিক নয়। নতুন তেলে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি সিঙাড়া তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে এটি তেলে ভাজা খাবার হওয়ায় পরিমিত খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সুস্থ থাকার মূল কথা হলো পছন্দের খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং কী খাচ্ছেন, কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং কতটা খাচ্ছেন এই তিন বিষয়ে সচেতন থাকা।