বয়ঃসন্ধি কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় শরীরে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। শুরু হয় মাসিক। ফলে নিয়মিত রক্তক্ষরণের কারণে শরীরে আয়রনের চাহিদাও বেড়ে যায়। খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি না থাকলে দেখা দিতে পারে আয়রনের ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতা।
মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, খেলাধুলায় অনীহা কিংবা সারাক্ষণ দুর্বল লাগার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। তবে এসব লক্ষণের অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
খাবারে কী রাখবেন
বয়ঃসন্ধির মেয়েদের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, ভিটামিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা দরকার। ঘরের স্বাভাবিক খাবারেই এর বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব।
সকালের শুরু
দিন শুরু করা যেতে পারে এক গ্লাস পানি দিয়ে। এরপর কয়েকটি ভেজানো বাদাম ও খেজুর দেওয়া যেতে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট পানীয় বা উপাদানকে আয়রনের ঘাটতি পূরণের একমাত্র উপায় হিসেবে না দেখে সামগ্রিক খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দিতে হবে।
নাশতায় বৈচিত্র্য আনুন
প্রতিদিন একই খাবার না দিয়ে নাশতায় পরিবর্তন আনুন। দুধ ও ওটস, ডিম, চিড়া, দোসা, ইডলি, সবজি দিয়ে তৈরি খাবার কিংবা ডালভিত্তিক নাশতা হতে পারে ভালো বিকল্প। ডাল, ডিম ও দুধজাত খাবার থেকে কিশোরীরা প্রয়োজনীয় প্রোটিনও পেতে পারে।
দুপুরের খাবার
দুপুরের খাবারে ভাত বা রুটি, ডাল, সবজি এবং মাছ, মাংস বা ডিমের মতো প্রোটিনের উৎস রাখুন। শাকসবজি ও ডাল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
মাছ বা মাংসের সঙ্গে সবজি দিয়ে ঝোল রান্না করা যেতে পারে। খাবারের পর পরিমাণমতো টক দই দেওয়া যেতে পারে।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার রাখলে উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীরে শোষণে সহায়তা করে। তাই খাবারের সঙ্গে লেবু, পেয়ারা, আমলকী বা অন্যান্য ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল রাখুন।
বিকালের নাশতা
বিকালে চিপস, ফাস্টফুড বা অতিরিক্ত ভাজাপোড়ার পরিবর্তে চিড়া, ছাতু, দই, দুধ, ফল, বাদাম বা ঘরে তৈরি হালকা নাশতা দিন। খেজুর ও বাদাম দিয়ে দুধের সঙ্গে একটি পুষ্টিকর পানীয়ও তৈরি করুন। তবে অতিরিক্ত চিনি যোগ না করাই ভালো।
রাতের খাবার
রাতে দুই ধরনের রুটি, ভাত কিংবা অন্য কোনও শস্যের সঙ্গে ডাল ও সবজি রাখা যেতে পারে। এর সঙ্গে মাছ, মাংস, ডিম, পনির বা সয়াবিনের মতো প্রোটিনের উৎস যোগ করতে পারেন।
কিশোরীর বয়স, শারীরিক গঠন ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। শুধু ওজন কমানোর জন্য খাবার বাদ দেওয়া বা খুব কম খাওয়ার অভ্যাস এ বয়সে ঠিক নয়।
ফাস্টফুড কমিয়ে ঘরের খাবারে অভ্যস্ত করুন
কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পিজ্জা, বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ বিভিন্ন ধরনের ফাস্টফুডের প্রতি আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে এসব খাবার খাওয়া নিয়ে সমস্যা না থাকলেও এগুলো যেন নিয়মিত খাবারের বিকল্প হয়ে না যায়, সেদিকে অভিভাবকদের নজর রাখা দরকার।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে নিজের মতো করে কঠোর ডায়েট শুরু করা থেকে কিশোরীদের বিরত রাখা উচিত। এ বয়সে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ও সুষম খাবার প্রয়োজন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
দীর্ঘদিন ধরে দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, ফ্যাকাশে ত্বক কিংবা মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতা সন্দেহ হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করতে পারেন। শুধু খাবারের ওপর নির্ভর না করে পরীক্ষার ফল ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই নিরাপদ।
কিশোরীর প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য, পর্যাপ্ত পুষ্টি ও নিয়মিত খাবারের অভ্যাস নিশ্চিত করাই এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।