সন্তান কি আগের মতো খেলাধুলা করছে না? স্কুল থেকে ফিরে অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না কিংবা চেহারা আগের চেয়ে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে? এসব লক্ষণকে অনেক সময় সাধারণ দুর্বলতা বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। অথচ শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলেও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বেড়ে ওঠার সময়ে শিশুদের শরীরে আয়রনের প্রয়োজন বাড়ে। তাই নিয়মিত খাবারের তালিকায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখা জরুরি।
আয়রন শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে যায়। ফলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, ফ্যাকাশে ভাবের পাশাপাশি মনোযোগের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।
শিশুরোগ চিকিৎসক প্রিয়ঙ্কর পাল মনে করেন, শুধু একটি বা দুটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা জরুরি। ভাত, ডাল, শাকসবজি এবং মাছ, মাংস বা ডিমের মতো আমিষ খাবার মিলিয়ে সুষম খাবারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর পাতে থাকুক আয়রনের জোগান
একই খাবার বারবার না দিয়ে ভিন্নভাবে পরিবেশন করলে শিশুর খাওয়ার আগ্রহও বাড়তে পারে।
শাকসবজির মধ্যে পালংশাক আয়রনের একটি পরিচিত উৎস। ডাল কিংবা তরকারির সঙ্গে পালংশাক মিশিয়ে রান্না করা যায়। আবার বড়া, পরোটা বা স্যুপের সঙ্গেও এটি ব্যবহার করা সম্ভব। শিশুর পছন্দ অনুযায়ী রান্নার ধরন বদলে দিলে শাক খাওয়ানো সহজ হতে পারে।
গুড়েও কিছু পরিমাণ আয়রন থাকে। চিনি বা মিষ্টির বিকল্প হিসেবে অল্প পরিমাণ গুড় খাবারে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে গুড় মিষ্টি হওয়ায় অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ানো উচিত নয়।
খেজুরেও আয়রন ও পটাশিয়াম রয়েছে। সরাসরি খাওয়ানোর পাশাপাশি পায়েস, ফলের সালাদ বা পানীয়ের সঙ্গে খেজুর মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে এতে প্রাকৃতিক চিনি থাকায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
প্রোটিনের পাশাপাশি আয়রন পেতে রাজমা রাখা যেতে পারে শিশুর খাবারের তালিকায়। ভালোভাবে সেদ্ধ করে রান্না করলে এটি নরম হয় এবং বিভিন্ন তরকারির সঙ্গেও খাওয়ানো যায়। দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতেও সহায়ক হতে পারে এই খাবার।
আয়রন শোষণেও নজর দিন
শুধু আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেলেই হবে না, শরীর যেন সেই আয়রন ঠিকভাবে শোষণ করতে পারে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভিটামিন সি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমলকিতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকায় আয়রনযুক্ত খাবারের সঙ্গে এটি খাওয়া যেতে পারে। আমলকি সরাসরি খাওয়া কিংবা এর রসও পান করা যায়।
ডিমও শিশুর নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। বিশেষ করে ডিমের কুসুমে আয়রন ও প্রোটিন রয়েছে। সেদ্ধ ডিম কিংবা ডিমের ভাজি করে শিশুকে খাওয়ানো যেতে পারে।
সকালের নাশতা কিংবা বিকালের হালকা খাবার হিসেবে চিঁড়া ভালো বিকল্প হতে পারে। এর সঙ্গে সবজি, বাদাম ও সামান্য লেবুর রস যোগ করলে খাবারটি আরও পুষ্টিকর হবে। দই-চিঁড়া কিংবা দুধ-চিঁড়াও দেওয়া যেতে পারে।
কুমড়োর বীজেও আয়রনের পাশাপাশি বিভিন্ন খনিজ উপাদান ও উপকারী চর্বি রয়েছে। হালকা ভেজে সরাসরি খাওয়ানো যেতে পারে কিংবা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়। তবে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বীজ খাওয়ানোর সময় বয়স অনুযায়ী নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি।
লেবু-কমলালেবু কেন জরুরি
উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে পাওয়া আয়রন শরীরে শোষণের জন্য ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার উপকারী। তাই আয়রনযুক্ত খাবারের সঙ্গে লেবু, কমলালেবু কিংবা টমেটোর মতো খাবার রাখা যেতে পারে। এতে খাবার থেকে আয়রন শোষণের প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
অন্যদিকে খাবারের সঙ্গে চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমানো ভালো। এসব পানীয় আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে। তাই শিশুর খাবারের সময় ও পানীয়ের সময়ের মধ্যে ব্যবধান রাখা যেতে পারে।
প্রতিদিন একই ধরনের খাবার না দিয়ে খাবারে রং ও বৈচিত্র্য রাখাও জরুরি। এতে শিশুর খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
আয়রনের ওষুধ নিজে থেকে নয়
শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি আছে কি না, তা শুধু চেহারা বা আচরণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। দীর্ঘদিন দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ফ্যাকাশে ভাব বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
আয়রনের ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হবে। শুধু খাবার থেকেই সব সময় ঘাটতি পূরণ সম্ভব নাও হতে পারে। আবার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আয়রনের ওষুধ বা পরিপূরক খাওয়ানোও ঠিক নয়।