তরুণ বয়সেই বাড়ছে অন্ত্রের ক্যানসার, কোন অভ্যাসগুলো দায়ী?

ক্যানসার মানেই যে বয়সের সঙ্গে আসবে, এমন ধারণা এখন আর পুরোপুরি সত্য নয়। বিশেষ করে পাচনতন্ত্রের বিভিন্ন অঙ্গে কম বয়সী মানুষের মধ্যেও ক্যানসারের প্রবণতা বাড়ছে। ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে অন্ত্রের ক্যানসারের ঘটনা বৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এর পেছনে বংশগত কারণের পাশাপাশি বদলে যাওয়া জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্প্রতি ক্যানসার রিসার্চ ইউকে-র গবেষকেরা একটি সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছেন। সেই গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যে অন্ত্রের ক্যানসারের হার বাড়ছে। ব্রিটেনসহ প্রায় ৫০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০০৭ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এ প্রবণতার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ধরা পড়েছিল। সেই তালিকায় ভারতও রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই ধরনের ক্যানসারের সংখ্যা আরও বাড়ার বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের নজরে এসেছে।

খাবারের অভ্যাসে বড় পরিবর্তন

ব্যস্ত জীবনে ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবারের বদলে প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-নুনযুক্ত খাবার এবং জাঙ্ক ফুডের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। নিয়মিত এ ধরনের খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বিপাকক্রিয়া ও পাচনতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শারীরিক পরিশ্রমের অভাব। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে কাজ করা, নিয়মিত ব্যায়াম না করা, অনিয়মিত ঘুম এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপসহ আধুনিক জীবনযাত্রা শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে অন্ত্রে প্রদাহের পরিবেশ তৈরি হতে পারে এবং অন্ত্রের জীবাণুর স্বাভাবিক ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুর পরিবর্তে ক্ষতিকর জীবাণুর আধিক্য দেখা দিলে দীর্ঘমেয়াদে পাচনতন্ত্রের স্বাস্থ্যে তার প্রভাব পড়তে পারে।

শুধু অন্ত্র নয়, ঝুঁকিতে পাচনতন্ত্রের অন্য অঙ্গও

অন্ত্রের ক্যানসারের পাশাপাশি পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয় ও পিত্তথলির ক্যানসার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান এবং মদ্যপানের মতো অভ্যাস এ ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কিছু সংক্রমণও পাচনতন্ত্রের বিভিন্ন ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রমণের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে। আবার হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ লিভারের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অতিরিক্ত আঁচে রান্না করা মাংসেও সতর্কতা

ওজন কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকেই নিয়মিত গ্রিল করা মাংস বা উচ্চ তাপে রান্না করা খাবার খাচ্ছেন। কিন্তু মাংস অতিরিক্ত তাপে রান্না করলে কিছু রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

বিশেষ করে উচ্চ তাপমাত্রায় মাংস রান্নার সময় হেটারোসাইক্লিক অ্যামাইনস বা এইচসিএ তৈরি হতে পারে। মাংসের অ্যামিনো অ্যাসিড, শর্করা ও ক্রিয়েটিনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে এই যৌগ তৈরি হয়। তাই স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হিসেবেও রান্নার পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

গ্যাস-অম্বল ভেবে উপসর্গ এড়িয়ে যাবেন না

অন্ত্রের ক্যানসারের প্রাথমিক কিছু লক্ষণ সাধারণ হজমের সমস্যার মতো মনে হতে পারে। পেট ব্যথা, অম্বল, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা ওজন কমে যাওয়াকে অনেকেই সাময়িক সমস্যা ভেবে গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।

মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, দীর্ঘদিন পেটের অস্বস্তি থাকা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা ক্ষুধার পরিবর্তনের মতো লক্ষণ বারবার দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা ঘুমের সমস্যাকেও অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সব ধরনের পেটের সমস্যা ক্যানসারের লক্ষণ নয়। তবে কোনও উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বারবার ফিরে এলে নিজে থেকে কারণ ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। রোগ যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করার সুযোগও তত বেশি থাকে।