প্রাচীন চীনের রানিদের রূপচর্চা, আজকের স্কিনকেয়ারে কতটা ফিরে এসেছে

আজকের সৌন্দর্যচর্চায় যখন ‘গ্লাস স্কিন’, ফেস রোলার, রাইস ওয়াটার কিংবা প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার নিয়ে এত আলোচনা, তখন এসবের কিছু শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় বহু পুরোনো চীনা সৌন্দর্যচর্চায়। রাজপরিবারের নারীদের রূপচর্চায় ভেষজ ও প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার নিয়ে নানা ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে। পদ্ম, চাল, মুক্তো কিংবা বিভিন্ন উদ্ভিদ ও ছত্রাকজাত উপাদানকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নানা ধরনের পরিচর্যার পদ্ধতি।

সময়ের সঙ্গে সেই পদ্ধতিগুলোর অনেকটাই বদলে গেছে। প্রাচীনকালের ঘরোয়া উপকরণের জায়গায় এসেছে আধুনিক প্রসাধনী, স্কিনকেয়ার ফর্মুলা, মেশিন ও বিশেষায়িত থেরাপি। তবে কিছু উপাদান ও ধারণা এখনও আধুনিক সৌন্দর্যচর্চায় নতুন নামে ফিরে এসেছে।

জেড রোলার

গুয়া শা থেকে জেড রোলার: চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও সৌন্দর্যচর্চার সঙ্গে ‘গুয়া শা’-র নাম দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। বিশেষ ধরনের পাথর বা সরঞ্জাম দিয়ে ত্বকের ওপর নির্দিষ্ট কায়দায় চাপ প্রয়োগ করে মালিশ করা হয় এই পদ্ধতিতে।

আধুনিক সৌন্দর্যচর্চায় এর সঙ্গে মিল রয়েছে জেড রোলার ব্যবহারের। পাথরের রোলার দিয়ে মুখে হালকা চাপ দিয়ে মালিশ করা হয়। এতে সাময়িকভাবে মুখের ফোলা ভাব কম দেখা যেতে পারে এবং ত্বকে আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

তবে জেড রোলার ব্যবহার করলেই মুখের ত্বক স্থায়ীভাবে টানটান হয়ে যাবে বা বলিরেখা দূর হবে—এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। তাই এটিকে ত্বকের আরাম ও ম্যাসাজের একটি পদ্ধতি হিসেবেই দেখা ভালো।

মুক্তোর গুড়ো (সংগৃহীত ছবি)।

মুক্তোর গুঁড়ো বা পার্ল পাউডার: প্রাচীন চীনা সৌন্দর্যচর্চায় মুক্তোর গুঁড়োর ব্যবহারের কথা বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী বর্ণনায় পাওয়া যায়। সূক্ষ্মভাবে গুঁড়ো করা মুক্তোকে বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে ত্বকে ব্যবহারের রীতি ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

আধুনিক সময়ে ‘পার্ল পাউডার’ বিভিন্ন সৌন্দর্যপণ্যে ব্যবহার করা হয়। তবে মুক্তোর গুঁড়ো ত্বককে রাতারাতি উজ্জ্বল করে দেবে বা দাগ দূর করবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে ত্বকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে পণ্যের মান, উপাদান এবং ত্বকের সংবেদনশীলতা বিবেচনা করা জরুরি।

স্নো ফাঙ্গাস (সংগৃহীত ছবি)।

স্নো ফাঙ্গাসের নতুন পরিচয়: চীনা খাদ্য ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবহারে পরিচিত স্নো ফাঙ্গাস বা সাদা মাশরুম বর্তমানে সৌন্দর্যপণ্যের উপাদান হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। এটি ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। এ কারণে কিছু আধুনিক স্কিনকেয়ার ফর্মুলায় এর নির্যাস ব্যবহার করা হয়।

স্নো ফাঙ্গাসকে কখনও কখনও প্রাকৃতিক ‘হায়ালুরোনিক অ্যাসিড’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের মতো একই কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে এমন দাবি করার আগে নির্দিষ্ট পণ্যের বৈজ্ঞানিক তথ্য দেখা প্রয়োজন।

বোজিন থেরাপি (সংগৃহীত ছবি)।

বোজিন থেরাপি ও আকুপাংচারের যোগসূত্র: চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার আরেকটি পরিচিত পদ্ধতি হলো আকুপাংচার। শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে সূক্ষ্ম সুচ প্রয়োগ করে এই চিকিৎসা করা হয়। আধুনিক সময়েও নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্যসমস্যায় প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে আকুপাংচার ব্যবহার করা হয়।

মুখের সৌন্দর্যচর্চায় আকুপাংচার বা অনুরূপ কিছু পদ্ধতি ব্যবহার নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। তবে ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখা, বলিরেখা দূর করা বা স্থায়ীভাবে ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণার ফল একেবারে নিশ্চিত নয়।

তাই মুখে সুচ প্রয়োগের মতো কোনো থেরাপি নেওয়ার আগে অবশ্যই প্রশিক্ষিত ও যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চাল ধোয়া পানিতে মুখের যত্ন (সংগৃহীত ছবি)।

চাল ধোয়া জল থেকে ‘রাইস ওয়াটার’: চাল ধোয়া বা ভেজানো জল দিয়ে ত্বক ও চুলের পরিচর্যার প্রবণতা এশিয়ার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের। বর্তমানে এটি ‘রাইস ওয়াটার’ নামে সৌন্দর্যচর্চায় বেশ জনপ্রিয়।

চালের পানিতে বিভিন্ন উপাদান থাকতে পারে, তবে এটি ব্যবহার করলেই ত্বকের দাগ চলে যাবে বা ‘গ্লাস স্কিন’ পাওয়া যাবে এমন দাবি অতিরঞ্জিত। ত্বকে কোনও ঘরোয়া উপাদান ব্যবহারের আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘক্ষণ রেখে দেওয়া বা অপরিষ্কারভাবে তৈরি করা পানি ত্বকে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

পদ্মের বীজ। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন কোলাজ।

পদ্মের বীজের ব্যবহার: পদ্ম চীনা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতীক। পদ্মের বিভিন্ন অংশ খাবার ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবহারে রয়েছে। পদ্মের বীজও চীনা খাদ্যসংস্কৃতিতে পরিচিত।

আধুনিক স্কিনকেয়ার পণ্যে পদ্মের নির্যাস ব্যবহার করা হলেও এর অর্থ এই নয় যে পদ্মের বীজ সরাসরি ত্বকে লাগালেই বার্ধক্যের ছাপ দূর হয়ে যাবে। কোনও প্রসাধনীতে পদ্মের নির্যাস থাকলে সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং অন্য কী উপাদান রয়েছে, তা জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লাল খেজুরের চা (সংগৃহীত ছবি)।

লাল খেজুর ও গোজি বেরির পানীয়: চীনা খাদ্যসংস্কৃতিতে লাল খেজুর বা জুজুব এবং গোজি বেরি বেশ পরিচিত। এগুলো দিয়ে চা বা অন্যান্য পানীয় তৈরির চল রয়েছে।

ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে কোনো একটি চা বা পানীয় খেলেই শরীর ‘ডিটক্স’ হয়ে যাবে কিংবা ত্বকের জেল্লা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে এমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ত্বকের সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাবার, ঘুম এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন রূপচর্চা, আধুনিক বিজ্ঞান

প্রাচীন চীনের সৌন্দর্যচর্চার অনেক উপাদান আজও আধুনিক প্রসাধনীতে ফিরে এসেছে। তবে একই উপাদান ব্যবহার করা মানেই প্রাচীন পদ্ধতিটির সব দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এমন নয়।

আজকের স্কিনকেয়ারে কোনও প্রাকৃতিক উপাদান জনপ্রিয় হওয়ার আগে তার নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং ত্বকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে মুখের ত্বক সংবেদনশীল হওয়ায় ঘরোয়া মিশ্রণ বা অপরীক্ষিত পণ্য ব্যবহারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

প্রাচীন রূপচর্চার গল্প তাই শুধু সৌন্দর্যের ইতিহাস নয়, এটি সময়ের সঙ্গে মানুষের সৌন্দর্যবোধ, চিকিৎসা ও ত্বকের যত্নের ধারণা কীভাবে বদলেছে, তারও একটি আকর্ষণীয় অধ্যায়। মুক্তোর গুঁড়ো, চালের পানি কিংবা পাথরের রোলার নামগুলো পুরোনো হলেও আধুনিক রূপচর্চায় তাদের উপস্থিতি নতুন আঙ্গিকে এখনও দেখা যায়।