ক্ষুর-কাঁচির পুরনো সেই ছন্দে ছেদ, সংকটে ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর পেশা

একসময় গ্রামবাংলার হাট-বাজারে কেনাকাটার পাশাপাশি চুল-দাড়ি কাটিয়ে নেওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। কাঠের পিঁড়ি, ক্ষুর-কাঁচি, চিরুনি ও ছোট্ট আয়না নিয়ে হাটে বসতেন ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দররা। কেউ আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুল-দাড়ি কেটে দিতেন। কৃষক, শ্রমিকসহ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কম খরচে চুল-দাড়ি কাটার সহজলভ্য সেবাও ছিল এটি। আয়ও হতো ভালো।

সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। গ্রামগঞ্জে বেড়েছে আধুনিক সেলুন। নতুন প্রজন্মও বেছে নিচ্ছে অন্য পেশা। ফলে ক্ষুর-কাঁচি, চিরুনি আর কাঠের পিঁড়ি নিয়ে হাটে বসা ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের সেই পুরনো ছন্দে পড়েছে ছেদ। সংকটে পড়েছে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশা।

লালমনিরহাটের বিভিন্ন হাটে একসময় বংশপরম্পরায় অনেকেই ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর হিসেবে কাজ করতেন। কৃষক, শ্রমিকসহ নিম্নআয়ের মানুষের কাছে তাদের সেবা ছিল সহজলভ্য। কিন্তু আধুনিক সেলুনের সংখ্যা বাড়ায় এবং নতুন প্রজন্মের অনেকেই অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ায় হাটকেন্দ্রিক এই পেশার পরিসর আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।

কমেছে কাজ, কমেছে আয়

লালমনিরহাট শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় নরসুন্দর মোজাম্মেল হক ও রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের পরিচিত অনেকেই বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকে এ কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের সন্তানদেরও বেশিরভাগই পূর্বপুরুষের পেশায় আগ্রহী নন।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী হাটের প্রবীণ নরসুন্দর পরিমল চন্দ্র শীল প্রায় ৪০ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত। তিনি বলেন, আগে কাজের চাহিদা বেশি ছিল, এখন কমেছে। আয়ও আগের মতো নেই। নতুন প্রজন্ম কাঠের পিঁড়ি, ক্ষুর-কাঁচি ও চিরুনি নিয়ে হাটে বসে এ পেশায় আসতে আগ্রহী নয়।

একই হাটে বংশপরম্পরায় এ পেশা ধরে রেখেছেন বাবুল চন্দ্র শীল। তিনি বলেন, ‘আগে হাটে মানুষের ভিড় বেশি থাকত, কাজও পাওয়া যেত। এখন আধুনিক সেলুন বেড়ে যাওয়ায় কাজ কমেছে। সারাদিন কাজ করে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এ আয় দিয়ে সংসার চালানো এবং ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তার ভাষায়, ‘সরকারি সহায়তা বা সুযোগ পেলে একটি ছোট দোকান নিয়ে স্থায়ীভাবে কাজ করতে পারতাম।’

এখনও আস্থার জায়গা

তবে ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের সেবা এখনও কিছু শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক কম খরচে চুল-দাড়ি কাটার সুযোগ থাকায় তারা এখনও হাটের নরসুন্দরদের সেবা নিয়ে থাকেন।

বড়বাড়ী হাটের গ্রাহক আনিসুর রহমান বলেন, ‘এভাবে চুল-দাড়ি কাটাতে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। পরিচিত পরিবেশে ভালোও লাগে, খরচও তুলনামূলক কম।’

একই হাটের আরেক গ্রাহক হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের জন্য কম খরচে চুল-দাড়ি কাটার সুযোগটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘদিন ধরে এখানেই চুল কাটাই।’

ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পেশাটি

লালমনিরহাট নরসুন্দর সমিতির সভাপতি দিনোনাথ শীল বলেন, ‘এই পেশার সঙ্গে গ্রামবাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। যারা এখনও এ পেশায় আছেন, তাদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এতে তারা এ পেশাকে আধুনিকভাবে এগিয়ে নিতে পারবেন।’

মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সংস্কৃতিব্যক্তিত্ব মো. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দর গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের অংশ। সময়ের পরিবর্তনে এ পেশার রূপ বদল গ্রামীণ জীবনযাত্রার পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।’

সরকারি সহায়তার সুযোগ

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘নিম্নআয়ের ও অসচ্ছল পেশাজীবীদের স্বাবলম্বী করতে সরকার বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।’

যোগ্যতা অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদেরও এসব কর্মসূচির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগ্রহীরা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক বলেন, ‘আধুনিকতার প্রভাবে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে। কেউ সহযোগিতার আবেদন করলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।’

টিকে থাকার লড়াই

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী কর্মস্থলের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এতে পেশাজীবীদের আয় ও কর্মপরিবেশের উন্নতির পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে যুক্ত এই ঐতিহ্যটিরও পরিবর্তিত রূপে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।

কাঠের পিঁড়ি, ক্ষুর-কাঁচি, চিরুনি আর ছোট্ট আয়না নিয়ে হাটের এক কোণে বসার সেই দৃশ্য হয়তো আগের মতো নেই। তবু কিছু শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন আর কিছু মানুষের বংশপরম্পরায় ধরে রাখা পেশায় এখনও টিকে আছে সেই পুরনো ছন্দ। তবে আধুনিক সেলুন আর বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার ভিড়ে সেই ছন্দ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।