আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনে গ্রামবাংলার অনেক লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও পিরোজপুরের নেছারাবাদে এখনও টিকে আছে বাঁশের তৈরি ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার ফাঁদ ‘চাই’। মুলি ও মোড়ল বাঁশের সরু সলা, সুতা আর গ্রামীণ নারীদের নিপুণ হাতের বুননে তৈরি এই ‘চাই’ শুধু মাছ ধরার উপকরণ নয়, দক্ষিণাঞ্চলের জলজ সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
নেছারাবাদ উপজেলার করফা, চীনা-বুনিয়া, বলদিয়া, জলাবাড়ি, মাহমুদকাটি, আটঘর-কুড়িয়ানা, কাটাখালি, কাঁটা-বুনিয়া, চিলতলাসহ অন্তত ১৮টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ‘চাই’ তৈরি, বিক্রি ও এর মাধ্যমে মাছ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। কেউ বাঁশ সংগ্রহ ও সলা তৈরির কাজ করেন, কেউ ‘চাই’ বোনেন, আবার কেউ নৌকা, ট্রলারে কিংবা স্থানীয় বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন।
অনেক পরিবার নিজেরাই ‘চাই’ তৈরি করে বর্ষাকালে খাল-বিল, নালা ও নিচু জমিতে পেতে দেশীয় মাছ শিকার করে। পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে আয়ও করেন তারা। ফলে মাছ ধরা ও ‘চাই’ তৈরি- দুইভাবেই এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই ঐতিহ্য।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নেছারাবাদের বিশারকান্দি ইউনিয়নের উমারের পাড় গ্রামের মানুষ বংশপরম্পরায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘চাই’ তৈরি ও এর মাধ্যমে মাছ শিকার করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে ধাপ পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও মাছ শিকারের কারণে ‘চাই’ তৈরির কৌশল এখন তাদের কাছে অনেকটাই সহজাত।
স্থানীয়রা জানান, জন্মের পর থেকেই তারা এ ধরনের ভাসমান ও জলনির্ভর জীবনযাপন দেখে আসছেন। পরিবারের প্রায় সব সদস্যই কোনও না কোনোভাবে ‘চাই’ তৈরির কাজে যুক্ত। বিশেষ করে নারীরা এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে শেখা পদ্ধতিতেই এখনও তৈরি করা হচ্ছে ‘চাই’।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারা কৃষি বিভাগের কাছ থেকে তেমন কোনও সহায়তা পান না। বরং কৃষি বিভাগের লোকজন বিভিন্ন সময় এসে ‘চাই’ তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান।
বাঁশ থেকে তৈরি হয় মাছ ধরার ফাঁদ
‘চাই’ তৈরির প্রধান উপকরণ মুলি ও মোড়ল বাঁশ এবং সুতা। প্রথমে প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁশ কেটে ছাঁচা হয়। এরপর বাঁশের টুকরোগুলো কয়েক দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পরে রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় সরু ও নমনীয় সলা। সেই সলা দিয়ে নির্দিষ্ট নকশায় কাঠামো তৈরি করে সুতা দিয়ে বুনে তৈরি করা হয় মাছ ধরার ‘চাই’।
স্থানীয় কারিগর সাইফুল হাওলাদার বলেন, ছোট কচুরিপানা ও দুলালীলতার মধ্যে নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া দিয়ে এক ধরনের আধার তৈরি করা হয়। স্থানীয়ভাবে যাকে ‘দৌল্লা’ বলা হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন সবজির অঙ্কুরিত বীজ পুঁতে রাখা হয়। তবে ‘চাই’ তৈরির ক্ষেত্রে বাঁশের সলা নির্দিষ্ট মাপে ও কৌশলে তৈরি করতে হয়।
স্থানীয়ভাবে মাছের ধরন ও আকার অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ‘চাই’ তৈরি করা হয়। ছোট দেশীয় মাছ ধরার জন্য মুলি বাঁশের ‘চাই’ বেশি ব্যবহার করা হয়। তুলনামূলক বড় মাছ ধরার জন্য মোড়ল বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয় বড় আকৃতির ‘চাই’।
বোয়াল, গজার, শোল, মাগুর, ট্যাংরা, কৈ, ভেদা, বাইন, টাকি, ফুটি ও বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় দেশীয় মাছ ধরতে আলাদা ধরনের ‘চাই’ তৈরি করা হয়।
নারীর হাতে বোনা, পুরুষের হাতে বাজারজাত
‘চাই’ তৈরির সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে যুক্ত গ্রামীণ নারীরা। পুরুষরা সাধারণত বাঁশ কাটা, সলা তৈরি ও কাঠামো প্রস্তুতের কাজ করেন। এরপর নারীরা সেই সরু সলা দিয়ে ধৈর্য ও নিপুণতার সঙ্গে ‘চাই’ বুনে শেষ করেন। পরে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তৈরি করা ‘চাই’ নৌকা, ট্রলার কিংবা ভ্যানযোগে স্থানীয় হাট-বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন।
স্থানীয় কারিগররা জানান, একটি ‘চাই’ আকার ও মানভেদে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। স্থানীয় হাট-বাজারের পাশাপাশি আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকায় ‘চাই’ কেনাবেচার আলাদা বাজারও রয়েছে। ফলে এই শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি ক্ষুদ্র গ্রামীণ অর্থনৈতিক বলয়।
বলদিয়ার আব্দুল গফুর আলী বলেন, ‘বাপ-দাদার সময় থেকেই এলাকায় চাই তৈরির প্রচলন রয়েছে। বর্ষা এলে খাল-বিল ও নিচু জমিতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাইয়ের ব্যবহারও বেড়ে যায়। মাছ ধরার পাশাপাশি চাই বিক্রি করেও বহু পরিবার আয় করে।’
পানির স্রোত বুঝে বসানো হয় ‘চাই’
বর্ষা মৌসুমে খাল-বিল, নালা ও নিচু জমিতে পানি বাড়লে শুরু হয় ‘চাই’ দিয়ে মাছ ধরার ব্যস্ততা। পানির স্রোত ও মাছের চলাচলের পথ বুঝে নির্দিষ্ট জায়গায় ‘চাই’ পেতে রাখা হয়। ভোরে গিয়ে সেই ‘চাই’ উঠিয়ে দেখা যায় কৈ, ট্যাংরা, শোল, মাগুর, বাইন, টাকি ও অন্যান্য দেশীয় মাছ আটকা পড়েছে।
চিমতলার আব্দুর রহিম বলেন, ‘পানির স্রোত ও মাছের চলাচলের পথ বুঝে নির্দিষ্ট জায়গায় চাই পেতে রাখা হয়। বর্ষায় ফসলি জমি, খাল, বিল ও নালায় দেশীয় মাছ চলাচল করলে সেখানে চাই বসিয়ে মাছ ধরা হয়। ভোরে গিয়ে চাই উঠালে অনেক সময় ভালো মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছ পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে আয় করা হয়।’
চীনা-বুনিয়ার ফারুক হোসেন বলেন, ‘চাই দিয়ে মাছ ধরা তুলনামূলক সহজ। এটি গ্রামবাংলার দীর্ঘদিনের পরিচিত পদ্ধতি। আমাদের এলাকায় এখনও অনেকে এই পদ্ধতিতে মাছ ধরেন।’
চাহিদা আছে বাজারেও
নেছারাবাদের বিভিন্ন গ্রামে তৈরি ‘চাই’ স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়। বর্ষায় মাছ ধরার মৌসুমে এর চাহিদা আরও বেড়ে যায়। পরিবারের প্রয়োজনের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও ‘চাই’ বিক্রি করেন অনেক কারিগর।
স্থানীয়রা জানান, শুধু ‘চাই’ তৈরি নয়, এটি তৈরিতে ব্যবহৃত মুলি ও মোড়ল বাঁশের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গেও কিছু মানুষ যুক্ত। কচুরিপানা, দুলালী বন, শ্যাওলা ও ফ্যানা ঘাসসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে নৌকায় ‘চাই’ তৈরির সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়।
বিশারকান্দির খালে প্রতিদিন ভোরে বসে জলজ উদ্ভিদ বিক্রির ভাসমান হাট। সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব উপকরণ কিনে নেন ‘চাই’ তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
১৫ হাজার মানুষের জীবিকার সঙ্গে ঐতিহ্যের বন্ধন
নেছারাবাদের এই লোকজ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ। কারও জীবিকা বাঁশ সংগ্রহ ও সলা তৈরিকে ঘিরে, কেউ ‘চাই’ বুনে আয় করেন, আবার কেউ তা বাজারজাত করেন। পাশাপাশি বর্ষাকালে ‘চাই’ দিয়ে মাছ ধরে অনেক পরিবার নিজেদের খাদ্য চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় করে।
স্থানীয়দের মতে, আধুনিক মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ বাজারে এলেও নেছারাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ‘চাই’ এখনও তার জায়গা ধরে রেখেছে। কারণ এটি সহজলভ্য উপকরণে তৈরি, দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় এবং বর্ষায় দেশীয় মাছ ধরার জন্য কার্যকর।
৪০০-৫০০ পরিবারে বাণিজ্যিক চারা উৎপাদন
নেছারাবাদে ঐতিহ্যবাহী ‘চাই’ শিল্পের পাশাপাশি একই জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলনির্ভর কৃষিপদ্ধতিও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের বাশাইল ও আহুতি-বাটরা গ্রামেও ভাসমান ধাপে চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।
আগৈলঝাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা বলেন, বর্তমানে প্রায় ২০০ হেক্টর ভাসমান বেডে চাষাবাদ হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবার যুক্ত। সেখানে বাণিজ্যিকভাবে লাউ, শিম, বেগুন, ফুলকপি, ওলকপি, বরবটি, করলা, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, ধনেপাতা, ডাঁটা, টমেটো, আদা, হলুদ, পেঁপে ও মরিচসহ বিভিন্ন চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে তাদের আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। চারা ও সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগে নিম্নাঞ্চলের কৃষকরা বছরে একবার জমিতে চাষাবাদ করতে পারতেন। বাকি সময় জমি পানিতে ডুবে থাকতো। বোরো ধান কাটার পর বর্ষায় ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেলে কৃষকরা হাত গুটিয়ে না থেকে ভাসমান ধাপে চারা ও ফসল উৎপাদনের পদ্ধতি কাজে লাগান।
বানারীপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসনাইন বলেন, বর্তমানে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ চলছে। তবে এর সঙ্গে কত পরিবার জড়িত, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
দুই কৃষি কর্মকর্তা জানান, বরিশালের পাশাপাশি পিরোজপুরেও এ ধরনের ভাসমান ধাপে চাষাবাদ হচ্ছে। বছরের বেশিরভাগ সময় যেসব এলাকা পানিতে ডুবে থাকে, সেসব এলাকায় ধীরে ধীরে এই পদ্ধতির চাষাবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষকদেরও এ ধরনের চাষাবাদে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
নেছারাবাদের ‘চাই’ শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবনও যেন একইভাবে পানি, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঁধা। আধুনিকতার চাপে গ্রামবাংলার অনেক পুরোনো পেশা হারিয়ে গেলেও মুলি ও মোড়ল বাঁশের সরু সলায়, নারীর নিপুণ হাতে আর বর্ষার পানিতে এখনও টিকে আছে নেছারাবাদের ২০০ বছরের ‘চাই’ ঐতিহ্য। এটি শুধু মাছ ধরার একটি উপকরণ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা একটি লোকজ শিল্প ও মানুষের জীবিকার গল্প।