জীবনের কোনও কোনও দিন অন্য দিনের তুলনায় বেশি কঠিন হয়। কিছু কিছু সময় সবারই একটু বিরতির প্রয়োজন পড়ে। আর সেই বিরতি অনেক সময় আসে ছোট্ট কোনও আনন্দ, নিজের জন্য রাখা বিশেষ কোনও মুহূর্ত বা সামান্য বিলাসিতার মাধ্যমে—যা দিনের বাকি সময়টুকু কিংবা কঠিন কাজ সামলানোর শক্তি জোগায়।
বার্নাডেট পিটার্স, ডিচেন ল্যাকম্যান, ডেলিয়া এফ্রনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরিচিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কঠিন সময় পার করতে তারা কীভাবে ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত খুঁজে নেন।
লেখক আইরিস মারডক ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত বুকার পুরস্কারজয়ী উপন্যাস দ্য সি, দ্য সি-তে বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “সুখী জীবনের অন্যতম রহস্য হলো নিয়মিত ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করা। আর সেগুলোর কিছু যদি কম খরচে ও সহজে পাওয়া যায়, তাহলে তো আরও ভালো।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জনপ্রিয় হয়েছে এই ধারণা। বিশেষ করে টিকটকে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে ‘লিটল ট্রিট কালচার’ বা ছোট ছোট আনন্দ উপভোগের প্রবণতা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তারা জীবনের ছোটখাটো আনন্দ উপভোগ করতে উৎসাহ দিচ্ছে এবং এ নিয়ে অপরাধবোধে না ভুগতে বলছে।
উচ্চচাপের পেশায় থাকা লেখক, অভিনেতা, উদ্যোক্তা ও শিল্পাঙ্গনের আরও অনেক পরিচিত ব্যক্তির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল—মানসিক চাপের সময়ে তাদের ছোট্ট আনন্দ বা ‘লিটল ট্রিট’ কী। তাদের উত্তরগুলো ছিল সহজ, কিন্তু তৃপ্তিদায়ক।
(উদ্ধৃতিগুলো দৈর্ঘ্য ও স্পষ্টতার জন্য সংক্ষেপিত ও সম্পাদনা করা হয়েছে।)
১. শরীরের যত্ন, মনেরও যত্ন
সোফি বাডল, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান ও লেখক
“নিজেকে দেওয়া আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো কোনও অ্যালার্ম ছাড়াই যতক্ষণ ইচ্ছা ঘুমাতে দেওয়া। অ্যালার্ম না দিলে আমি কখনোই সময়মতো উঠবো না। তাই নিজেকে একটু বেশি সময় ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিলাসিতা।”
২. পল টাজওয়েল, অস্কারজয়ী কস্টিউম ডিজাইনার (উইকড)
“আমি ম্যানিকিউর-পেডিকিউর করাই, তবে পালিশ নয়—বাফড ফিনিশ পছন্দ করি। কারণ, নিজের হাতের দিকে তাকালে মনে হয়, আমি নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় দিয়েছি।”
৩. মার্কাস স্যামুয়েলসন, শেফ
“আমার এমন কিছু মুহূর্ত দরকার হয়, যখন আমি সবকিছু থেকে নিজেকে কিছুটা সরিয়ে নিতে পারি। দিনের শুরুতে আমি নাশতা তৈরি করি, ছেলেকে স্কুলে পাঠাই। এরপর স্ত্রীকে নিয়ে পার্কে হাঁটতে যাই। অনেক সময় এটিই দিনের একমাত্র সময়, যখন আমরা দুজন একসঙ্গে সময় কাটাতে পারি।”
৪. নাটালি ভেনেশিয়া বেলকন, ব্রডওয়ে অভিনেত্রী (বুয়েনা ভিস্তা সোশ্যাল ক্লাব)
“সিপি কাপে পানীয় নিয়ে স্টিম শাওয়ার নেওয়া আমার কাছে বিশেষ আনন্দের বিষয়। আমার একটি শাওয়ার স্টুলও আছে। শাওয়ার নেওয়ার সময় অযথা বেশি পরিশ্রম করার প্রয়োজন নেই। সবকিছুর পর নিজের অ্যাপার্টমেন্টে তিন ঘণ্টার ম্যাসাজ নেওয়াও আমার জন্য বড় এক বিলাসিতা।”
৫. রিচার্ড কিন্ড, অভিনেতা
“হৃদ্স্বাস্থ্য ও ওজনের দিকে নজর রাখার এই সময়ে মাঝে মাঝে নিজেকে পুরস্কার দিই—সবকিছু দেওয়া ব্যাগেলে চেডার চিজ ও বেকনসহ ডিমের স্যান্ডউইচ দিয়ে। এর স্বাদ সত্যিই দারুণ।”
৬. কার্টিস সিটেনফেল্ড, লেখক
“আমার ক্ষেত্রে অবশ্যই ডার্ক চকোলেট। এটি সত্যিই এক ধরনের ছোট্ট আনন্দ। আর আমি প্রতিদিনই এটি খাই।”
৭. হিদার পুল, ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ও লেখক
“যাত্রাবিরতির সময়ে একা ভালো কোনও জায়গায় বসে খাবার খাওয়া আমার কাছে বিলাসিতা। এর জন্য কারও সঙ্গ প্রয়োজন হয় না। নিজের জন্য রাখা এই সময়টুকুই আমার ছোট্ট আনন্দ।”
৮. কনি বাটলার, মোএমএ পিএস ১-এর পরিচালক
“আমার কাছে পিলাটিস এক ধরনের গভীর মনোযোগের অনুশীলন, অনেকটা ধ্যানের মতো। এটি আমার আত্মযত্নের অংশ এবং মহামারির সময় এটি আমাকে মানসিকভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।”
৯. ইন্ডিয়ানা উডওয়ার্ড, নিউইয়র্ক সিটি ব্যালে’র প্রধান নৃত্যশিল্পী
“যখন মনে হয় নিজের জন্য সময় দরকার, তখন আমি কোনও বাথহাউসে যাই। রাশিয়ান বাথগুলো আমার খুব ভালো লাগে। সেখানে ফোন থাকে না, প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
১০. মস্তিষ্ক ও মনকে খোরাক দেওয়া
ড্যান বুলা, স্যাটারডে নাইট লাইভের লেখক
“আমি যখন গভীর রাত পর্যন্ত লিখি এবং কয়েক ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করি, তখন কিছু সময়ের জন্য কাজ থেকে সরে গিয়ে অনলাইনে দ্রুতগতির দাবা খেলি। এটি আমাকে সম্পূর্ণ অন্য কিছুর দিকে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।”
১১. বার্নাডেট পিটার্স, অভিনেত্রী ও গায়িকা
“আমি নাক দিয়ে শ্বাস নিই, চার গুনে ধরে রাখি এবং মুখ দিয়ে ছাড়ি। এভাবে ছয়বার করি। এটি আমাকে সত্যিই শান্ত করে।”
১২. সারা ম্যাকন্যালি, ম্যাকন্যালি জ্যাকসন বুকসের মালিক
“আমার ছেলেকে জড়িয়ে ধরা আমাকে অপ্রত্যাশিতভাবে স্থিরতা দেয়। মধ্যবয়সের একটি বড় উপহার হলো—আমি এমন একটি জীবন তৈরি করেছি, যা আমার দুর্বল দিনগুলোতেও আমাকে সমর্থন করে।”
১৩. ডিচেন ল্যাকম্যান, সেভারেন্স-এর অভিনেত্রী
“একটি সুন্দর মোমবাতি জ্বালানো এবং নিজের জায়গাটি গভীরভাবে পরিষ্কার করা আমার অনুভূতিকে মুহূর্তেই বদলে দেয়। এরপর ধীরে রান্না করা খাবার তৈরি করা বা তাজা ফুল সাজানো আমার কাছে ছোট্ট একটি শিল্পকর্ম তৈরির মতো লাগে।”
১৪. ড্যান হ্যারিস, ১০ ভাগ হ্যাপিয়ার উইথ ড্যান হ্যারিস পডকাস্টের উপস্থাপক
“টিকটকে আমার অ্যালগরিদম মূলত কমেডি ও প্রাণীদের ভিডিও দেখায়। এটি আমার জন্য দারুণ একটি বিরতি। এসব ভিডিও দেখে আমি কত জোরে হাসি, তা দেখে আমার স্ত্রী ও ছেলে প্রায়ই মজা করে।”
১৫. জেসি উইলনার, ডিসকোথেক ফ্র্যাগরেন্সেসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা
“আমি সব জায়গায় একটি স্কেচবুক সঙ্গে রাখি। এটি কাজের জন্য নয়, বরং সামনে দেখা সুন্দর বিষয়গুলো আঁকার জন্য। এটি আমার ছোট্ট একটি স্মৃতির খাতা।”
১৬. মাইকেল চেকি-আজোলিনা, লেখক ও সেচ্চি’স রেস্তোরাঁর মালিক
“প্রতিদিন সকালে সংবাদপত্র পাওয়া আমার জন্য বিশেষ আনন্দের বিষয়। কফি খেতে খেতে সংবাদপত্র পড়া শুধুই নিজের জন্য রাখা কিছু সময়।”
১৭. বেনজামিন অ্যাডলার, নিউইয়র্ক ফিলহারমনিকের ক্ল্যারিনেট বাদক
“সম্প্রতি আমি কে-পপের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছি। ধ্রুপদি সংগীতের শিল্পীরাও কে-পপ পছন্দ করেন। মাঝে মাঝে আমি কে-পপ পরিবেশনার ভিডিও দেখি।”
১৮. রুটিনের মাধ্যমে প্রশান্তি
শিলা ব্রিজেস, ফার্নিচার ডিজাইনার
“রোমে থাকার সময় প্রতি রবিবার ফ্লি মার্কেটে যেতাম। সঙ্গে মাত্র ৫০ ইউরো রাখতাম এবং এর মধ্যেই কিছু খুঁজে নিতাম। প্রতি সপ্তাহেই দারুণ কিছু পেতাম। সেটিই ছিল নিজের জন্য আমার ছোট্ট উপহার।”
১৯. ডেলিয়া এফ্রন, লেখক
“চাপের সময়ে আমি ব্রিটিশ গোয়েন্দা সিরিজ দেখি। এসব সিরিজের গল্প সাধারণত পুরোনো ইংরেজ শহরকে ঘিরে হলেও সবকিছু নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক মনে হয়।”
২০. নিকি টসকানো, লং ব্রাইট রিভার-এর শোরানার
“সঙ্গী, সাবেক স্বামী ও সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সঙ্গে বরফঠান্ডা মার্টিনি পান করা, এরপর সন্তানদের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়া—আমার কাছে এটাই আনন্দ। এর সঙ্গে যদি ওটিস রেডিংয়ের গান যোগ হয়, মুহূর্তটি প্রায় নিখুঁত হয়ে ওঠে।”
২১. স্কাই লাকোটা-লিঞ্চ, ব্রডওয়ে অভিনেতা (দ্য আউটসাইডার্স)
“আমার ছোট্ট আনন্দ হলো থ্রিফটিং বা পুরোনো জিনিসের দোকানে ঘোরা। ব্রুকলিনের স্টেলা ডালাসে গিয়ে ভালো কোনও শার্ট, প্যান্ট বা মোমবাতি খুঁজে পেলেই আমার পুরো দিন বদলে যায়।”