রেস্টুরেন্টে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে মেনে চলুন এই নিয়মগুলো

রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া এখন শুধু খাবার উপভোগের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিকতা, শিষ্টাচার ও টেবিল এটিকেট। বিশেষ করে প্রিয়জন, বন্ধু, ব্যবসায়িক সহযোগী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গেলে আগে থেকেই কিছু নিয়ম জানা থাকলে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানো যায়। রেস্টুরেন্টে যাওয়ার আগে রিজার্ভেশন করা থেকে শুরু করে খাবারের টেবিলে বসার ধরন প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে কিছু সৌজন্যমূলক নিয়ম।

কোনও জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে প্রথমেই রিজার্ভেশন করে নেওয়া ভালো। কারণ আগে থেকে বুকিং না করে গিয়ে যদি দেখা যায় কাঙ্ক্ষিত সময়ে টেবিল খালি নেই, তাহলে সঙ্গীদের নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। আবার রিজার্ভেশন করার পর কোনও কারণে নির্ধারিত সময়ে সেখানে যাওয়া সম্ভব না হলে অবশ্যই বুকিং বাতিল করতে হবে। তবে শেষ মুহূর্তে রিজার্ভেশন বাতিল করা উচিত নয়। বুকিং করার সময়ই রেস্টুরেন্টের ক্যানসেলেশন পলিসি জেনে নেওয়া প্রয়োজন। কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের আগে বাতিল করলে কোনও চার্জ লাগে না, আবার কোথাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাতিল না করলে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হয়। তাই রিজার্ভেশন বাতিলের ক্ষেত্রেও নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

রেস্টুরেন্টে পৌঁছে ভ্যালেট সার্ভিসের ব্যবহার

রেস্টুরেন্টে যাওয়ার সময় অনেকেই সাধারণত চালকসহ গাড়ি ব্যবহার করেন। কিন্তু চালক না থাকলে নিজেকেই গাড়ি চালিয়ে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে ব্যস্ত রেস্টুরেন্ট বা হোটেলে পার্কিং নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে। ভালো মানের হোটেল ও রেস্টুরেন্টে এ ধরনের সমস্যা এড়াতে ভ্যালেট সার্ভিসের ব্যবস্থা থাকে।

ভ্যালেট সার্ভিসে গাড়ি নিয়ে রেস্টুরেন্টের প্রবেশপথে পৌঁছালে একজন ভ্যালেট অ্যাটেনডেন্ট এগিয়ে আসেন। গাড়ি থেকে নেমে তার কাছে গাড়ির চাবি বুঝিয়ে দিয়ে একটি টোকেন নিতে হয়। এরপর গাড়িটি নির্ধারিত পার্কিংয়ে রেখে দেওয়া হয় এবং অতিথি নিশ্চিন্তে রেস্টুরেন্টে যেতে পারেন।

খাওয়া শেষ করে মূল গেটে এলে টোকেনটি ভ্যালেট অ্যাটেনডেন্টের কাছে দিতে হয়। তিনি পার্কিং থেকে গাড়ি এনে দিলে গাড়ি বুঝে নিয়ে চলে আসা যায়। এ ধরনের সেবার ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ভ্যালেট অ্যাটেনডেন্টকে টিপস দেওয়াও সৌজন্যের অংশ।

আপনি হোস্ট নাকি গেস্ট জানুন আয়োজনের ধরন

আমরা সবসময় হোস্ট নই, অনেক সময় অতিথিও হই। তাই কোনও লাঞ্চ বা ডিনারের আমন্ত্রণ পেলে আয়োজককে আগে থেকেই জেনে নেওয়া ভালো, আয়োজনটি কী ধরনের। সাধারণ লাঞ্চের পাশাপাশি ফরমাল লাঞ্চও হতে পারে। একইভাবে ডিনারও হতে পারে সিট-ডাউন ডিনার কিংবা স্ট্যান্ডিং অ্যান্ড মিংগলিং ডিনার।

স্ট্যান্ডিং অ্যান্ড মিংগলিং ডিনারকে অনেক সময় ককটেল ডিনারও বলা হয়। এ ধরনের আয়োজনে সাধারণত নির্দিষ্ট আসন থাকে না। অতিথিরা দাঁড়িয়ে খাবার গ্রহণের পাশাপাশি একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হন, কথা বলেন এবং সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করেন। দূতাবাস, হাইকমিশন কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন আয়োজনে এ ধরনের অনুষ্ঠান দেখা যায়।

আপনি যদি হোস্ট হন, তাহলে অতিথিদের আগে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানো এবং মূল প্রবেশদ্বারে অবস্থান করা উচিত। ক্লাব, রেস্টুরেন্ট কিংবা হোটেল যেখানেই আয়োজন হোক, অতিথিদের স্বাগত জানানোর দায়িত্ব হোস্টের। অতিথিদের মধ্যে বয়স, গুরুত্ব কিংবা অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে যথাযথভাবে আসন নির্ধারণ করাও হোস্টের দায়িত্ব।

হোস্টের বসার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভব হলে এমন জায়গায় বসা উচিত, যেখান থেকে প্রবেশদ্বার দেখা যায়। কারণ সব অতিথি একই সময়ে আসেন না। কেউ দেরিতে এলে হোস্ট যেন সহজেই তাকে দেখতে ও স্বাগত জানাতে পারেন। আয়তাকার টেবিল কিংবা গোল টেবিল যেটিই হোক, এমন জায়গায় বসা ভালো, যেখান থেকে অধিকাংশ অতিথিকে দেখা যায় এবং সবার সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে আপনি যদি অতিথি হন, তাহলে নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানো উচিত। হোস্ট আপনাকে আপনার জন্য নির্দিষ্ট আসন দেখিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত নিজের মতো করে কোথাও বসে পড়া ঠিক নয়।

টেবিলে বসারও রয়েছে নির্দিষ্ট শিষ্টাচার

ডাইনিং টেবিলে বসার সময় সোজা হয়ে বসতে হবে। চেয়ারে অতিরিক্ত হেলান দিয়ে বসা কিংবা কনুই টেবিলের ওপর রাখা ভদ্রতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সুন্দর ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে খাবার গ্রহণ করাই টেবিল এটিকেটের অংশ।

ন্যাপকিন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে কিছু নিয়ম। হোস্ট যখন ন্যাপকিন খুলবেন বা খোলার ইঙ্গিত দেবেন, তখন অতিথিরাও ন্যাপকিন খুলবেন। ন্যাপকিন সাধারণত দুই ভাঁজ করে ভেতরের অংশটি ব্যবহার করা হয়। খাবারের সময় কিছুক্ষণের জন্য টেবিল ছেড়ে যেতে হলে ন্যাপকিন চেয়ারের ওপর রাখা উচিত। টেবিলের ওপর রেখে গেলে সার্ভার সেটিকে খাবার শেষ করার সংকেত হিসেবে ধরে নিতে পারেন।

কারও ন্যাপকিন অসাবধানতাবশত মেঝেতে পড়ে গেলে নিজে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সার্ভারকে ইশারা করলে তিনি সাধারণত নতুন ন্যাপকিন এনে দেবেন। তাকে ধন্যবাদ জানানোও সৌজন্যের অংশ।

টেবিলে বসার সময় নিজের গ্লাসটি চিনে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত পানীয়ের গ্লাস ডান দিকে ওপরের অংশে থাকে। তাই পাশের ব্যক্তির গ্লাস ভুল করে ব্যবহার করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

পানি বা অন্য কোনও পানীয় পান করার আগে ঠোঁট পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। এতে ঠোঁটে থাকা তেল বা খাবারের দাগ গ্লাসে লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে এবং অন্য অতিথিদের কাছেও বিষয়টি অস্বস্তিকর মনে হয় না।

খাবার মুখে নিয়ে কথা নয়

ডাইনিং টেবিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচারগুলোর একটি হলো খাবার মুখে থাকা অবস্থায় কথা না বলা। কেউ প্রশ্ন করলে মুখে খাবার থাকলে হাতের ইশারায় বোঝানো যেতে পারে যে একটু পরে উত্তর দেওয়া হবে। খাবার গিলে নেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে কথোপকথনে অংশ নেওয়াই ভদ্রতা।

রেস্টুরেন্টে যাওয়ার আগে মোবাইল ফোনও অবশ্যই সাইলেন্ট করে নেওয়া উচিত। ফোন কখনও ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা উচিত নয়। জরুরি কোনও কল এলে টেবিলে বসে কথা না বলে বাইরে গিয়ে কথা বলা ভালো। প্রয়োজন হলে রেস্টরুম বা রেস্টুরেন্টের নির্ধারিত অন্য জায়গায় গিয়ে কলটি গ্রহণ করা যেতে পারে।

সার্ভারকে সম্মান দেখানোও টেবিল এটিকেটের অংশ

রেস্টুরেন্টে যিনি খাবার পরিবেশন করেন, তাকে সম্মানের সঙ্গে সম্বোধন করা উচিত। নির্দিষ্টভাবে তিনি নিজেকে ওয়েটার বা ওয়েট্রেস হিসেবে পরিচয় না দিলে ‘সার্ভার’ শব্দটি ব্যবহার করা যেতে পারে। খাবার পরিবেশন, পানি দেওয়া কিংবা অন্য কোনও সেবা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকে ধন্যবাদ জানানো সৌজন্যের পরিচয়।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, রেস্টুরেন্ট এটিকেট মানে কেবল কঠোর কিছু নিয়ম মেনে চলা নয়। বরং নিজের পাশাপাশি অন্য অতিথি, হোস্ট এবং রেস্টুরেন্টের কর্মীদের প্রতি সম্মান ও বিবেচনাবোধ দেখানোই এর মূল কথা। সাধারণ রেস্টুরেন্ট হোক কিংবা হোয়াইট-টেবিলক্লথের ফরমাল ডাইনিং সঠিক শিষ্টাচার জানা থাকলে যেকোনও আয়োজনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশ নেওয়া সম্ভব।