ভিসুভিয়াসের ছাইয়ে চাপা পড়েছিল ১ হাজার ৮০০ বই, ২ হাজার বছর পর মিলল হারানো গ্রিক গ্রন্থ!

ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে প্রায় দুই হাজার বছর আগে পুড়ে গিয়েছিল একটি শহর। সেই শহরের সঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়ে একটি বড় গ্রন্থাগারও। সেখানে ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০০টি প্যাপিরাসের পুঁথি। আগুনে পুড়ে পুঁথিগুলো কালো হয়ে যায়। অনেক দিন ধরে এগুলোকে পড়ার অযোগ্য মনে করা হতো।

এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেই পুঁথিগুলো থেকে লেখা উদ্ধার করা হচ্ছে। গবেষকেরা কয়েকটি হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন গ্রন্থের লেখা পড়তে পেরেছেন। এতে প্রাচীন গ্রিসের দর্শন ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটেছিল ইতালির প্রাচীন শহর হেরকুলেনিয়ামে। খ্রিস্টীয় ৭৯ সালে মাউন্ট ভিসুভিয়াসে বড় ধরনের অগ্ন্যুৎপাত হয়। আগ্নেয় ছাই ও পাথরের নিচে চাপা পড়ে পুরো শহরটি। শহরের একটি বড় বাড়িতে ছিল এই গ্রন্থাগার।

আগুনে পুড়ে পুঁথিগুলো কয়লার মতো কালো হয়ে যায়। তবে বাতাসের অভাবে সেগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। এ কারণেই প্রায় দুই হাজার বছর পরও পুঁথিগুলো টিকে আছে।

পুঁথিগুলো ১৭৫০-এর দশকে আবিষ্কৃত হয়। এরপর সেগুলো পড়ার চেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু পুঁথিগুলো খুবই ভঙ্গুর ছিল। খুলতে গেলেই সেগুলো ভেঙে যেত। এভাবে অনেক পুঁথি নষ্ট হয়ে যায়।

অষ্টাদশ শতকে আন্তোনিও পিয়াজ্জিও নামে একজন সন্ন্যাসী পুঁথি খোলার জন্য একটি যন্ত্র তৈরি করেন। সেই যন্ত্র দিয়ে খুব ধীরে পুঁথি খোলা হতো। তবু পুঁথিগুলো রক্ষা করা কঠিন ছিল।

তখন গবেষকদের সামনে দুটি পথ ছিল। পুঁথি খুললে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আবার না খুললে ভেতরের লেখা চিরদিন অজানা থেকে যাবে।

শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিই এই সমস্যার সমাধান করে। যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ব্রেন্ট সিলস দীর্ঘদিন ধরে এই পুঁথিগুলো পড়ার উপায় নিয়ে কাজ করছেন। শক্তিশালী রশ্মির সাহায্যে পুঁথির ভেতরের স্তরগুলোর ছবি তোলা হয়। এরপর কম্পিউটারের সাহায্যে সেই ছবিগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।

পুঁথির কালো পাতার ওপর থাকা কালির খুব ক্ষীণ দাগও এভাবে শনাক্ত করা যায়। ফলে পুঁথি না খুলেই তার ভেতরের লেখা দেখা সম্ভব হচ্ছে। ২০২৩ সালে এই কাজ আরও এগিয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এর লক্ষ্য ছিল পুঁথির ভেতরের লেখা উদ্ধার করা।

ওই বছরের অক্টোবরে নেব্রাস্কার ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লুক ফারিটর একটি বন্ধ পুঁথির ভেতর থেকে একটি সম্পূর্ণ শব্দ পড়তে সক্ষম হন। প্রায় দুই হাজার বছর পর সেই শব্দ প্রথমবারের মতো মানুষের সামনে আসে। শব্দটির অর্থ ছিল ‘বেগুনি’।

এরপর আরও বড় সাফল্য আসে। ২০২৪ সালে তিন তরুণ গবেষক একটি পুঁথি থেকে দুই হাজারের বেশি অক্ষর উদ্ধার করেন। সেখানে আনন্দ, খাবার ও সংগীত নিয়ে আলোচনা ছিল।

সম্প্রতি আরও কয়েকটি পুঁথি থেকে গুরুত্বপূর্ণ লেখা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পুঁথিতে নীতিশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সেখানে মানুষের কাজ করার ইচ্ছা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে লেখা হয়েছে।

গবেষকেরা মনে করছেন, এটি প্রাচীন স্টোয়িক দর্শনের একটি হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থ হতে পারে। পুঁথিতে স্টোয়িক দার্শনিক ক্রিসিপ্পাসের একজন আত্মীয় ও শিষ্যের নামও পাওয়া গেছে। তাই গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ক্রিসিপ্পাসের হারিয়ে যাওয়া কোনো লেখাও পাওয়া যেতে পারে।

আরও দুটি পুঁথি থেকেও গুরুত্বপূর্ণ লেখা পাওয়া গেছে। সেখানে প্রাচীন দার্শনিক ফিলোদেমাসের দুটি গ্রন্থের অংশ শনাক্ত করা হয়েছে। একটি গ্রন্থে নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যটি দেবতাদের নিয়ে লেখা।

তবে এখনো অনেক পুঁথি পড়া সম্ভব হয়নি। গবেষকদের ধারণা, পুরো গ্রন্থাগারের মাত্র ১০ শতাংশ লেখা এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা গেছে। ছয় শতাধিক পুঁথি এখনো বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।

এসব পুঁথির ভেতরে আরও কত অজানা বই রয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। গবেষকেরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে এসব লেখা পড়া সম্ভব হবে।