বাড়ি কোথায়?—‘মাহিলারা’
‘জলের তরঙ্গ জলেতে মিলায়
চিদঘন শ্যামসুন্দর।’
অবশেষে সেই অনন্ত আদিম জলের তরঙ্গের মধ্যে রবিদা মিলিয়ে গেলেন। ২০০৯-এর ৩ রা ফেব্রুয়ারি তিনি তাঁর ঝিমধরা চেতনার ঘনত্বের গভীরে অন্তর্ধান করলেন। তাঁর পরমপ্রিয় অনুজপ্রতীম হীরেন মুখুজ্জে মলাই আগে ভাগেই বিদায় না নিলে, আমরা হয়ত তাঁর অনুকরণীয় ভাষা এবং ভঙ্গিতে এই শোকবার্তাটি পেতাম,
—“একটা ইন্দ্রপাত হয়ে গেল জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিশ্বে।”
অথবা মহাভারতের এই অমোঘ কাব্য উদ্ধৃত করতেন,
‘ন কালস্য প্রিয়ঃ কশ্চিন্ন দ্বেষ্য কুরুসোত্তম।
ন মধ্যস্থ ক্কচিৎ কালঃ সর্বং কালং প্রকর্ষতি।।’
—হে কুরুশ্রেষ্ঠ কালের কেউ প্রিয় বা অপ্রিয় নেই, কাল কারও প্রতি উদাসীন নয়, কাল সকলকেই আকর্ষণ করে নিয়ে যায়।
নাকি রবিদা সেই পরমাশ্চর্য কালরূপ অনির্দিষ্ট অনির্বচনীয় চৈতন্যে (?) লীন হয়ে গেলেন, যাঁর স্বরূপ আজ অবধি কারুরই সম্যক ধারণায় নেই। অধুনাকার সারস্বত সমাজের অনেক শ্মশ্রু-গুল্ফ-ধারী মস্ত মস্ত সংস্কৃতি ও সমাজমনস্ক, অধুনা-প্রথিত বা প্রথিত-যশা ও হয়ত ‘ইন্দ্র-পাত’ শব্দবন্ধটির জন্য মগজ হাতড়াবেন, রবীন্দ্র কুমার কে, কী বা ইন্দ্রপাতের কথাটার তাৎপর্যই বা এ ক্ষেত্রে কতটা তাই নিয়ে নানা বাক-বিন্যাস করবেন।
টিভির ছবিতে যেসব বুদ্ধিজীবীদের দেখি এবং বাক-বৈদগ্ধ শুনি তাতে, আমাদের আকাট ব্যক্তির এমনই মনে হয়। অথবা মিডিয়ার এই উন্নততম ধারকেরা রবীন্দ্র কুমারের মহাপ্রয়াণের সংবাদটিকে টিভি চলার দ্রুত ধাবমান কয়েকটি শব্দে সামান্য দায়সাড়া গোছের মতো ব্রেকিং নিউজে প্রদর্শিত করেই সারলেন কেন? তাঁরা সম্ভবত ভাবলেন, মানুষটি না কোনও রাজনৈতিক নেতা, না কোনও চিত্র নক্ষত্র বা উল্কা। সুতরাং তার আর বাজার দর কী? ব্রেকিং নিউজের ছায়াময় ধাবমান এবং দ্রুত অপসৃয়মান ছায়া শরীরের কল্যাণে শুধু এইটুকু বুঝলাম, রবিদা আর নেই। সব চাইতে চমকপ্রদ ব্রেকিং নিউজের বাকি বাক্য বিন্যাসে ছিল ভোটের জোটে কারা কোন দিকে থাকবেন তারই খতিয়ান। অবশ্য আমার এই ক্ষোভ সবার প্রতি নয়। অনেকেই তো গিয়েছিলেন।
এই লেখাটি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের জন্য নয়। এটি শুধু তাঁর বিষয়ে সামান্য দু-চারটি কথা আলোচনা মাত্র। তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করার ক্ষমতা বা অধিকার কোনওটাই আমার নেই। আবার তাঁর সম্মন্ধে বলতে গিয়ে পরনিন্দা, পরচর্চা করাও তো অন্যায়। বিশেষ রবীন্দ্রকুমার এই কর্মটি নেহাৎ বাধ্য না হলে, অথবা বিশেষ কোনও ব্যক্তিত্বের দ্বারা অনুরুদ্ধ না হলে করতেনই না, তাও যদি সাহিত্যিক দায়বদ্ধতা না থাকত। এ বিষয়ে তাঁর ‘বাঙালি কি আত্মঘাতি ও অন্যান্য রচনা’য় গ্রন্থিত প্রবন্ধাবলির প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কিন্তু সেসব পরের কথা। আপাতত আমার মতো নির্বুদ্ধিজীবীর ইতর জনেদের জন্য কিছু সাধারণ কথা জানানো প্রয়োজন। এইভাবে নিজেরও জানা হবে।
জন্ম অভিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) বৃহত্তর বরিশাল জেলার মাহিলারা গ্রামে। অন্য অন্য বাঙাল প্রবাসী এবং উদ্বাস্তুদের মত তাঁর ‘দেশও’ মানসিক অস্তিত্বে গ্রাম। কিন্তু সেটা ক্রমশ বড় হতে হতে গোটা বিশ্বকেই তার অন্তর্ভূক্ত করে নিয়েছিল। জ্ঞান ও মননশীলতার জগৎকে তিনি তাঁর অন্তঃবিশ্বে বিশ্বায়িত করে নিয়েছিলেন বলে আমার সামান্য সংযোগ মাধ্যমে মনে হয়েছে। প্রচলিত অর্থে তিনি উদ্বাস্ত ছিলেন না, কিন্তু মাহিলারার প্রসঙ্গে তাঁর মানস অবস্থানটি যে একেবারেই সাধারণ বাঙাল ছিন্নমূলীয় এরকমই বরাবর দেখেছি। অথচ মাহিলারা গ্রামে তাঁর অবস্থিতি ছিল মাত্র বছর দশেকের। মিউনিসিপ্যাল আপার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষারম্ভ থেকে তিনি প্রায় গোটা জীবনই কোলকাতা প্রবসী।
১৯৩১ মেট্রিক, ’৩৩ থেকে ’৩৫-এর মধ্যে আই.এ ও বি.এ (অনার্স) এবং ১৯৩৭-এ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ। ১৯৩৮ থেকে ’৪৫ এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পোস্ট গ্র্যাজুয়েট টিউটর হিসাবে কাজ করেন। ১৯৪১-এ মেডিএভাল হেরিটজ অব এলিজা বেথান কমেডি বিষয়টি নিয়ে রিসার্চ করে লাভ করেন পি.আর.এস ডিগ্রি। ইউরোপীয়ান ইনফ্লুয়েন্স অব বেঙ্গলী লিটারেরি ক্রিটিসিজম নিয়ে গবেষণা করে ১৯৫০-এ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.ফিল ডিগ্রি পান। তাঁর কর্মজীবন ও গবেষণার ক্ষেত্র আলাদা ছিল না। বোধি বা প্রজ্ঞান্বেষী এই তপস্বীধর্মী মানুষটি জীবনভর গবেষণার কাজ করেই কাটিয়েছেন। তাঁর গবেষণার স্বীকৃতি হিসাবে তিনি ১৯৪৯ সালে সোয়াট গোল্ড মেডেলটিতে সম্মানিত হন। বিষয় ছিল: দি অ্যান্টিশিভালরিক অ্যান্ড অ্যান্টি-অ্যাকিউজিটিভ ট্যাডিশন ইন দি কমেডিজ অব বেন জনসন। ১৯৫৭-তে মিল্টন’স থিওরি অব পোয়োট্রির উপর গবেষণা করে লাভ করেন অক্সফোর্ডের ডি.ফিল ডিগ্রি। সারাবিশ্বের ইংরেজি সাহিত্যের বাঘা ছাত্ররাও নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে, তাঁর এই বিষয় নির্বাচনটি কী প্রচণ্ড দুঃসাহসিক ছিল। শুনেছি, তাবড় সাহেব ধুরন্ধরেরাও এ ব্যাপারে পাঁচবার ঢোক গেলেন। প্রখ্যাত অধ্যাপক হেলেন গার্ডেনার এ ব্যাপারে তাঁর তত্ত্বাবধাক ছিলেন।
আজীবন গবেষক এই মানুষটি ১৯৭২-এ মাইকেল মধুসূদনের উপর প্রবন্ধ লিখে সরোজিনী গোল্ড মেডেল পান। ১৯৯০-এ কালিদাস নাগ গোল্ড মেডেলও তিনি লাভ করেছিলেন।
কর্মসূত্রে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, সেন্ট্রাল কলেজ অব এগ্রিকালচার, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেগোর প্রফেসর অব বেঙলি ইন ডিপার্টমেন্ট অব মডার্ন ইন্ডিয়ান ল্যাঞ্জুয়জে যুক্ত ছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে কাজও তিনি যথেষ্টই করেন এবং সুযোগ ও সমাদর সত্ত্বেও কোথাও স্থায়ী চাকুরি সূত্রে তিনি আবদ্ধ হননি। তাঁর দৃষ্টি সততই স্বদেশের দিকে নিবদ্ধ ছিল। ১৯৭৭-এ অবসর গ্রহণের পর তিনি ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রথম ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন।
পত্র পত্রিকায় যথেষ্ট প্রবন্ধ, নিবন্ধাদি লিখলেও পুস্তক রচনার ব্যাপারে যেন তাঁর তীব্র অনাসক্তি এবং অনীহা ছিল। তাঁর সঙ্গে কথা বলে বা তাঁর লেখা পড়ে এরকম মনে হয়েছে যে, বইয়ের জগতে প্রকাশনার বর্তমান স্বীকৃতি তাঁর একান্তই অপছন্দের ছিল। তাঁর গুণগ্রাহীদের প্রচেষ্টায় কমবেশি মাত্র খান তের বই এযাবৎকালে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা বইয়ের সংখ্যা মাত্র পাঁচ। হয়ত পরবর্তীকালে, আমার এই লেখার পর, আরো কিছু প্রবন্ধাদি সংগৃহীত হলে বইয়ের সংখ্যা কিছু বাড়তে পারে।
তাঁর সব রচনাই প্রবন্ধধর্মী এবং মননশীল। অসম্ভব সবল এবং সাধুভাষায় রচিত, সে সবই সুললিত গদ্যে। সংখ্যায় নগণ্য হলেও তার একখানা গ্রন্থও ভারবত্তায় নগণ্য নয়। মানুষটি ব্যক্তি হিসেবেও যেমন সদারসিক, সহজ-সরল, মননের প্রকাশের ক্ষেত্রেও তেমনি, কোথাও যেন জটিলতার লেশমাত্রও নেই। রসিকতার প্রকাশ অবশ্য রচনার মধ্যে খুবই সন্তর্পণে আছে। তার বেশিটাই কথা গল্পে। কিন্তু সারল্য সর্বপ্রকার রচনায়ই লভ্য। তা কোথাও পাণ্ডিত্যের গভীরতার অন্তরায় নয়। প্রতিটি ভাব এবং কথা যেন তাঁর রচনায় যেন অতলান্তিক গভীরতায় ধ্রুপদী।
উদাহরণস্বরূপ তাঁর বিবেকানন্দের দ্বৈত এবং অদ্বৈত বেদান্তের মীমাংসার উপর বক্তৃতাবলির উল্লেখ করা যেতে পারে। তত্ত্ব জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে বাঙালি নিজস্ব মানসের প্রকাশ যদি কোনও বাঙালি মণীষীর ক্ষেত্রে নির্ভেজালভাবে ঘটে থাকে তবে তিনি নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত। তাঁর বাঙালিত্ব ক্ষুদ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্রত্বে আবদ্ধ ছিল না।
তাঁর পাণ্ডিত্যের প্রগাঢ়ত্ব সম্পর্কে একমাত্র নীরদ সি চৌধুরী মশাই ছাড়া কেউ কখনও অবজ্ঞা প্রদর্শন করেননি। তবে যাঁরা রবীন্দ্রকুমারের ‘বাঙালি কি আত্মঘাতি’ ইত্যাদি রচনা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, সরস অথচ অব্যর্থ বাক্য এবং শব্দ-সায়কে, যথোচিত সংযত ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গীতে বিদ্রুপ বা ব্যক্তিক চরিত্র হননের কোলাহলে না গিয়েও, কীভাবে তিনি প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করেছেন। কিন্তু সেখানে অসূয়া বা ক্রোধের বিন্দুমাত্র প্রকাশও আমরা দেখি না। এরকম মিত আচরণ এবং সংযত রবীন্দ্রকুমারের মত যথার্থ মণীষার ক্ষেত্রেই সম্ভব। অধুনাকার অনেক স্ব-ঘোষিত বিদ্বজ্জনের (বিশেষ করে টিভির বিদ্বজ্জনদের কিয়দংশের) আচরণে যখন বিনয়কে প্রকাশ্যে ধর্ষিত হতে দেখি, তখন তার আচরণটি ‘বিদ্যা বিনয়ং দদাতি’—এই অনুসিদ্ধান্তটির প্রতি নতুন করে বিশ্বাস স্থাপন করতে আগ্রহ জাগে। কিন্তু কাদের সঙ্গে আমি কার তুলনা করতে যাচ্ছি! বাজ পাখির সঙ্গে কি চড়ুইয়ের তুলনা সঙ্গত?
মূলত ইংরেজি সাহিত্যের লোক হলেও, সারস্বত চর্চার খুব কম ক্ষেত্রেই তাঁর পদপাত ঘটেনি। দর্শন এবং সমাজ ইতিহাসের ক্ষেত্রে তো তাঁর বিচরণ রীতিমত একজন স্কলার একস্ট্রা-অর্ডিনারির পর্যায়ের, যা ওই ওই বিষয়ের স্বনামধন্য পণ্ডিতদের কাছেও ঈর্ষণীয়। এতটা সুদীর্ঘ জীবনের অধিকারী হয়েও মৃত্যুর কয়েক মাস আগে পর্যন্ত এ রকমভাবে স্মৃতিকে সজীব এবং সতেজ রাখা বা মননে ও প্রকাশে কর্মক্ষম থাকা বস্তুতই এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। এই ক্ষমতাটি সত্যই একজন প্রকৃত তাপসতুল্য ব্যক্তির ক্ষেত্রেই সম্ভব ও সংগত।
তাঁর সংসর্গে যারা এসেছেন, তারা জানেন তিনি মননের দিক দিয়ে এক ক্লান্তিবিহীন পরিব্রাজক ছিলেন। তাঁর সেই প্রব্রজ্যা শুধু জ্ঞান ও প্রজ্ঞার নিমিত্তই নয়। তার অন্তরালে তা ছিল মানুষের হৃদয় অন্বেষী। একারণেই বোধ হয় আজীবন গবেষণাকর্মে রত থাকলেও তাঁর একটি রচনায়ও একাডেমির কঠিন প্যাঁচ বা পণ্ডিতন্মন্যতার আঁশটে গন্ধ পাওয়া যায় না। ইংরেজি ‘কোয়েস্ট’ শব্দটিতে যা বোঝায়, সেটাই সারাজীবন ধ্রুব করে রেখেছিলেন তিনি। হৃদয়ের সন্ধান ব্যাপারটি যেন তাঁর জীবনের সহজ সাধনা, যা সহজ সরল কিন্তু ধ্রুপদী গভীরতা এবং গাম্ভীর্যে ঋদ্ধ। এটাই কি যাকে অনেক মহাশয় ব্যক্তিরা উনিশ শতকীয় বাঙালি রেনেসাঁর স্পিরিট বলেন তাই?
সেই স্পিরিট বিষয়ে সম্যক ধারণা না থাকলেও নিঃসন্দেহে এটা বুঝতে অসুবিধে হয় না যে রবীন্দ্রকুমার আদ্যন্তই ক্ল্যাসিক্যাল ম্যাগন্যানিমিটিতে ওতপ্রোত এক ব্যক্তিত্ব, যার নমুনা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে একেবারে বিলীন হয়ে গেল।
তাঁর সঙ্গে পরিচিত অনেকেই তাঁর মুখে একাধিকবার টি.এস.এলিয়টের ‘দি রক’ কবিতাটি থেকে উদ্ধৃতি শুনেছেন,
“Where is the wise dom?
we have lost in knowledge
where is the knowledge?
we have lost in information.
where is the life?
we have lost in living.”
বার বার এলিয়ট কর্তৃক ব্যবহৃত উপনিষদের তিনটি শব্দের উল্লেখ তাঁর মুখে বোধহয় সবাই শুনেছেন, ‘দত্ত, দস্যত, দয়ধ্বস’। এইসব কথার পিছন থেকে উঁকি দিতে থাকে হৃদয় নামক সেই একদা শস্যপূর্ণ প্রান্তর, যা অধুনা ক্রমশ ইন্টারনেট ইনফরমেশনের যান্ত্রিকতায় মরুময় হয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর হাহাকার আমি শুনেছি। এরকমই তাঁর বিশ্বাস ছিল। একারণেই বার বার তিনি উচ্চারণ করতেন, ‘দি ওয়ার্ল্ড ইজ সিংকিং আন্ডার দি ডেড ওয়েট অব প্রিন্টেড নলেজ।’ হৃদয়ের ক্রমশ অবলুপ্তি তাঁকে বড়ই ব্যথিত ও ক্লিষ্ট করত। অনেকে বলতে পারেন, তিনি প্রাচীনপন্থী। কিন্তু আদপেই নয়।
তাঁর হাতে পর্যালোচনার জন্য আসা কোনও গ্রন্থে যদি তিনি এতটুকু হৃদয়ের ছোঁয়া পেতেন, নির্দ্বিধায় তাঁর কলম থেকে একটি বাক্য অবশ্য নির্গত হত, “বাংলা ভাষায় সম্প্রতি এমন আর একটি বই পড়ি নাই।” প্রশংসার এই ‘তর তম’ আধিক্যে স্বয়ং গ্রন্থকারও হয়ত অস্বস্তিতে পড়তেন। কন্তু রবিদা কখনও কারুর বিরুপ সমালোচনা করতেন এমন দেখিনি। ভালটুকুকেই তিনি শুধু যথাযথভাবে প্রকটিত করতেন।
তত্ত্বগতভাবে রবীন্দ্রকুমারের প্রস্থান নিঃসন্দেহে ভাববাদী দর্শনে। যেকথা আগে বলেছি যে, তিনি মূলত ইংরেজি সাহিত্যের লোক হলেও তাঁর গতিবিধি ছিল সর্বশাস্ত্রে। দর্শনকে তিনি জীবনের সব চাইতে বড় আসনখানা দিয়েছিলেন, যদিও স্বয়ং দর্শনের প্রথাগত ছাত্র ছিলেন না। কিন্তু ওই শাস্ত্রে সেজন্য তাঁর গভীর জ্ঞানার্জন কিছুমাত্র ব্যহত হয়নি।
তিনি যে তত্ত্বাগতভাবে ভাববাদি দর্শনাশ্রয়ী, একথা তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলাপ-আলোচনার সময়, তাঁর নানাবিধ আচরণ তথা বক্তব্যে আমার ধারণা হয়েছে। এমন কি তিনি যে ঈশ্বর বিশ্বাসী সে কথাও তিনি স্বীকার করেছেন প্রসঙ্গক্রমে জিজ্ঞাসিত হয়ে। কিন্তু তিনি যে বস্তুবাদি দর্শনেরও উত্তম পাঠক তথা বোদ্ধা তার পরিচয় পাই “অলীক সংলাপ” (প্রকাশক গাঙচিল) নামক বইটি পড়ার পর। বইটি পড়ে তার Quest এর ব্যাপ্তির কথাই প্রথমত আমার মনে হয়েছে। এ বিষয়ে তপন রায়চৌধুরীর পর্যালোচনার একটি অংশ এখানে উদ্ধৃত করব। অংশটি এরকম—
“বিদ্রুপের কষাঘাত সুস্থ সামাজিক ও রাষ্ট্রিক জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। বিদ্যাবুদ্ধি জ্ঞানে সমুজ্জ্বল এই মানুষটি (রবীন্দ্রকুমার) আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের বিশিষ্ট সম্পদ। ওর পীড়াবোধ আমাদের বিচলিত করলে আমাদের মঙ্গল। কিন্তু তঁর সব মূল্যায়ন আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করলে বিচার বিভ্রমের আশঙ্কা।” অলীক সংবাদ ছাড়াও Satesman এ বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক অতীতে তাঁর কিছু প্রবন্ধেও মার্কসীয় দর্শন বিষয়ে তাঁর লেখা পড়ে বোঝা যায় যে তিনি কত গভীরভাবে এই দর্শন বিষয়েও গভীরভাবে পড়াশোনা করেছিলেন। প্রসঙ্গত, ২০০৫-এর ৩০ শে জুন এবং ১ লা জুলাই প্রকাশিত একই প্রবন্ধের দুইটি অংশে তিনি মার্কসিস্ট পার্টিকে তাত্ত্বিক দিক থেকে তীব্র সমালোচনা করেন। প্রবন্ধটির নাম Whither the philosophy-party must justify calling it self Marxist. সেই প্রবন্ধের প্রত্যুত্তরে কেউ প্রতি-প্রবন্ধ লিখেছিলেন বলে চোখে পড়েনি। প্রবন্ধটির দ্বিতীয় অংশের Sub-title ছিল, Western resistance to Indian Idealism. এর আগেই ২৬.০১.০৫ তারিখে বাংলা Statesman এ বেরিয়েছিল একটি প্রবন্ধ। “দেশে এখন মণীষার দৈন্য ততোধিক, মণীষী ও চরিত্র বানেরা সরব হতে পারলেই পরিবর্তন সম্ভব”—এই শিরোনামে। এই প্রতিবাদ কিভাবে সম্ভব, সেই বিষয়েও তিন কিস্তিতে একটি প্রবন্ধ The Statesment এ তিনি লিখেছিলেন। যেখানে আগ্রাসী যুদ্ধবাজ মার্কিন সাম্রাজ্যের একক কর্তৃত্বের বিরোধিতা করে তিনি বিকল্প এক শান্তিময় বিশ্বের কথা বলেছেন। সেই লেখারও কোনও প্রত্তুত্তর নজরে আসেনি, যদিও রবীন্দ্রকুমারের বস্তুবাদী অভীক্ষা এবং তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা যে সমালোচনার উর্ধ্বে এমন মনে হয়নি। তবে কিনা সেক্ষেত্রে প্রত্যুত্তরকারীর তাত্ত্বিক কোমড়ের জোর যথেষ্ট পোক্ত হওয়ার প্রয়োজন ছিল এবং আছে। এই সব লেখাই একটা নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা ধরে প্রকাশিত হয়েছিল। জানি না, ইংরেজি বা বাংলা কোনও কোনও সংগ্রহে এই লেখাগুলো গ্রথিত হয়েছে কিনা। আমি স্বল্পপাঠের মানুষ, আমার নজরে অন্তত সে রকমটি পড়েনি।
যাই হউক, এই সূত্র ধরে কিছু স্ব-ঘোষিত বিদ্বজ্জ্বন আখ্যাধারী মানুষ ‘সুশীল সমাজ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে রবীন্দ্রকুমারের আকাঙ্ক্ষার বিপরীত একটি গোষ্ঠী গঠন করেছিলেন। আমরা জানি, তাদের মধ্যের একটা বড় অংশ অত্যন্ত আত্ম ও ব্যক্তিস্বার্থী হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছেন। এখনও পর্যন্ত তাঁদের কোনও উন্নততর দার্শনিক অথবা নিলোর্ভ ব্যক্তিক ব্যবহার বা প্রতিষ্ঠা আমরা প্রত্যক্ষ করছি না।
সর্বশেষ আর দু’একটি সংবাদ বলে এই গোত্রহীন রচনাটি শেষ করব। সেই সংবাদগুলো ব্যক্তিগত আলাপচারিতার প্রায় খুঁটিনাটি। সবাই জানেন, নীরদ সি চৌধুরী মশাই তাঁর বাংলা কাব্য কবিতা পাঠের একটা নির্ধারিত সময়-সীমা টেনে দিয়ে ছাপার অক্ষরেই জানিয়েছিলেন যে এর আগে আর যাব না। কারণ, কিন্তু কারণের কথাটা থাক। সেটা রবীন্দ্রপরবর্তী কবিদের পক্ষে বড়ই অশ্রদ্ধেয় হবে।
রবীন্দ্রকুমারের কাছে আমার যাতায়াতের শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কারণে অকারণে তখন প্রায়ই তাঁর কাছে যেতাম। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, নীরদ বাবুর মত তাঁরও কোনও লক্ষণগণ্ডি আছে কিনা। তিনি বলেছিলেন, আমি সামান্য পড়াশোনার মানুষ। বেশিতো পড়িনি বোঝার সামর্থ্যও খুব কম। যেমন ধরো এই ‘আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে যে নানান কথা হয়, আমি তার সঠিক মর্ম বুঝি না। যেমন, একটা গান শুনলে বোঝার চেষ্টা করি তার মধ্যে সঙ্গীত বস্তুটা আছে কিনা। তেমনই একটা ছন্দবদ্ধ রচনায় খুঁজি কবিতা বা Poetry তার মধ্যে আছে কিনা। প্রাচীন বা আধুনিক এরকম ভাগ বিচার আমার নাই। আমার ক্ষেত্রে কোনও লক্ষণগণ্ডি নেই, তবে জীবনানন্দের পরে আমার গতিবিধি আর নেই। জিজ্ঞেস করেছিলাম, অধুনাকার কারুর ওপরই বিশ্বাস বা ভরসা নেই? বললেন, শঙ্খের সম্ভাবনা আশাদীপ্ত করে। তবে পড়ি না তো। ওই কবিতাটা পড়েছ? ‘কোন ক্ষেতে বা কোন খামারে?’ কবিতাটা মুখস্থ ছিল মোটামুটি। তাঁরও। বললেন, কিন্তু সঞ্জয় তো সর্বশেষ সর্বনাশের খরবটাই দেবেন। বললাম, এসব নিয়ে আপনি একটা লিখলে বেশ হয়। বলেছিলেন, লিখেছি তো এদিক ওদিক কম না, কিন্তু আমার লেখা একদম ভাল হয় না, আর কবিতা তো মুখস্থই থাকে না। পড়াশুনাও কম। রঙ্গ করে বলেছিলাম, এই আপনার একটা মস্ত দোষ, পড়াশুনাটা করেননি।
শেষ দেখা করতে যাই ২০০৮ এর ফেব্রুয়ারি মাসে। শরীর ভাল না তাঁর। কথা বলতে বলতে ঝিমিয়ে পড়ছিলেন। তাঁর সেই জিমধরা চেতনায় মস্তিষ্কের কোন্ অলিতে গলিতে কোন্ তত্ত্ব বা কবিতার সূত্র কিংবা পঙক্তি ঘোরাফেরা করছিল, সে খবর জানি না। মনে হচ্ছিল, কী ছোট আমরা! কত যে ছোট!! ইদানিং তো দেখি সৃজনশীলতার জন্য যাদের মস্ত বড় আসনখানা দিয়েছিলাম, মননের জগতে তাঁদের দীনতা কী অতলস্পর্শী, মননের চাইতে লোভের ব্যাপারে তাঁরা কত মনোযোগী। তার মধ্যে কবি, শিল্পী নাট্যকার সবাই কী অপরিসীম ক্লেদে মাখামাখি! ভাবি, ‘হায় রবিদা! কাদের উপর পরিবর্তনের জন্য ভরসা করেছিলেন! উনবিংশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁকে আজকের পণ্ডিত, বিদ্বজ্জ্বনেরা কেউ মান্যতা দেন, কেউ বা ঠোঁট ওল্টান। বাঙালির আলোকোজ্জ্বল কোনও কিছুর মধ্য থেকে কালিমা খুঁড়ে বার করতে তাঁরা যেন প্রায় ‘Sensual ecstasy’র হর্ষ অনুভব করেন। ভাবেন সেটাই পাণ্ডিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠা। রবিদার ব্যাপারটা ছিল তার বিপরীত। বাঙালির গৌরব প্রচারে তাঁর লেখনী ছিল আরবী অশ্বের মতই প্রাণোচ্ছ্বল এবং গতিবান। সেখানে তাঁর নজরে কোনো ছোট বা বড় বুদ্ধিজীবীদের কাউকেই রেহাই দিতেন না। বাঙালি এবং রবীন্দ্রনাথকে ‘আত্মঘাতি’ বলে নীরদ বাবুকে মূল্য দিতে হয়েছিল চড়া দামে। আমৃত্যু সে ঘা বোধহয় তাঁর আর শুকোয়নি।
তবে কিছু মানুষ এখনও আছেন যাঁরা রবীন্দ্রকুমারকে বাঙালি রেনেসাঁর শেষ মণীষী বলে মান্যতা দেন। তা, বিরুদ্ধবাদিরা ‘বিগ বাজারের’ উন্মত্ততার মঞ্চের নিয়ন আলোকিত অংশে থাকুন, আমরা বরং অন্ধকার কোণে একটি মাটির প্রদীপের ম্লান আলোয় বসে এই শেষ ধ্রুপদী ঋষির তিরোভাব উপলক্ষ্যে আমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা ও অশ্রুর অর্ঘ্য নিবেদন করি।