অডিওবুক শুনুন, বইয়ের জগতে ফিরে আসুন

অনেকেই আমায় বলেন যে, অডিওবুক শোনা, আর বই পড়া এক বিষয় নয়। তাদের মতে, বই পড়ার সময় মনকে যেভাবে ডুবিয়ে দিতে হয়, মনোযোগ প্রয়োজন হয় এবং যে ধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়— তা অডিওবই শুনে পাওয়া যায় না। বই পড়ার সময় পাঠক নিজের মতো করে শব্দের ছন্দ তৈরি করেন, চরিত্রের কণ্ঠ কল্পনা করেন, দৃশ্যগুলোকে নিজের মতো মনে মধ্যে আঁকেন। তাই অনেকে মনে করেন, কানে শুনে গল্প- কবিতা-প্রবন্ধের স্বাদ নিলে সেই অভিজ্ঞতা যেন কিছুটা স্মিত হয়ে যায়। আমি এই ধারণার সঙ্গে একমত নই। আমি নিজে শোনার মধ্যে ডুবে যেতে পারি, মনোযোগ আরও বাড়ে এবং আমি মনে রাখতে পারি আরও বেশি।

এখন আমাদের জীবনের বাস্তবতা অন্যরকম। এ এক নতুন সময়। আমাদের দেশে মানুষ বেশিরভাগ ব্যস্ত জীবনের কারণে বই-ই পড়েন না। আমি মনে করি এই মানুষদের আবার বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনতে অডিওবই একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনও বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে বই পড়ে জানা, আর অডিওবই শুনে জানার মধ্যে তেমন কোনও মৌলিক পার্থক্য নেই। শোনার মাধ্যমে আমাদের বিষয় আত্মস্থ করার সুযোগকে কমিয়ে দেয় না। বরং অনেক সময় তা নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে। ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল লিটারেসি ট্রাস্টের পরিচালক জোনাথন ডগলাসও মনে করেন, যখন মানুষের পড়ার ক্ষমতা বা আগ্রহ কমে যায়, তখন বই শুনলে তার কল্পনাশক্তিকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে। অনেক শিশু বা তরুণ যারা বই থেকে অনেক দূরে চলে গেছে, তারা অডিওবইয়ের মাধ্যমে আবার এই জগতে ফিরে আসতে পারে।

আমাদের মস্তিষ্ক গল্প শুনতে ভালোবাসে। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা গল্প শুনেই বড় হয়েছি – গ্রামের উঠোনে, আগুনের পাশে বসে, কিংবা পারিবারিক আড্ডায়। তখন বই ছিল না, ছিল শুধু গল্প বলার কণ্ঠ। দাদী-নানীর গল্প, লোককথা, পুরাণ— সবই মানুষেরা কানে শুনেছা। অডিওবই সেই পুরনো ঐতিহ্যকেই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে এনেছে। ফলে বই এখন কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; তা মানুষের শ্রুতিতে, মস্তিষ্কে এবং কল্পনায় নতুনভাবে বাসা বাঁধছে।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টাইম ম্যানেজমেন্ট। এখনকার ব্যস্ত জীবনে অনেকেই বলেন, তারা বই পড়ার সময় পান না। আপিস, যানজট, কাজের চাপ— সব মিলিয়ে দিনের শেষে বই নিয়ে বসার ইচ্ছে অনেকেরই থাকে না। কিন্তু অডিওবই সেই সমস্যার এক সহজ সমাধান দিচ্ছে। গাড়ি চালানোর সময়, যানজটে বাসে বসে থাকলে, হাঁটতে বের হলে কিংবা শরীরচর্চার সময় অডিওবই আমাদের পড়তে সাহায্য করতে পারে। এটা একটা স্বভাবজাত সুন্দর প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে।

প্রথমে আমরা শুনতে শুরু করি এবং তারপর ধীরে ধীরে গল্পের প্রতি আমাদের আগ্রহ বাড়ে। চরিত্রগুলো পরিচিত হয়ে ওঠে, গল্পের ভেতর ঢুকে পড়ার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। একসময় সেই আগ্রহ আমাদের আবার বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনে। অডিওবই অনেক প্রাক্তন পড়ুয়ার জন্যে পড়ার বিকল্প নয়; বরং পড়ার পথে ফিরে যাওয়ার নতুন এক দরজা।

সবচেয়ে সুন্দর দিকটা হচ্ছে—  বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। বই আমাদের ভাবতে শেখায়, অন্যের জীবনকে বুঝতে শেখায়, পৃথিবীর নতুন কোনো একটা দিক আমাদের চোখের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়। অডিওবই যদি সেই সম্পর্ককে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে, তাহলে তাকে আমাদের সাদরে গ্রহণ করা উচিত বলেই আমার মনে হয়। অডিওবই পড়ার সময় আমি টের পাই পড়ার অর্থ শুধু হরফগুলো চোখে দেখে, মনে নিয়ে, মস্তিষ্কে প্রেরণ করা নয়– পড়ার অর্থ হচ্ছে আমি সেই বিষয়টা অনুধাবন করতে পারলাম। বই শুনলে সেই অর্থ হারিয়ে যায় না। আমরা যতদিন গল্প শুনতে চাইবো, আমাদের শত ব্যস্ততার মাঝেও পড়ার নতুন নতুন মাধ্যম আমরা আবিষ্কার করবো। পড়া কখনও জীবনে আর বই পড়ার সময় পাবেন না, তারা অডিওবই শুনে পড়ার জগতে ফিরে আসতে পারেন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক