কেমন হলো বুকারের দীর্ঘতালিকা

এবারের বুকার পুরস্কারের দীর্ঘতালিকায় সবচেয়ে পরিচিত দুটি নাম হলো আগের দুই বিজয়ী মার্লন জেমস এবং ডগলাস স্টুয়ার্ট। ২০১৪ সালে 'এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব সেভেন কিলিংস' উপন্যাসের জন্য বুকার জয়ী মার্লন জেমস এবার ফিরেছেন 'দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারার্স' নিয়ে। উপন্যাসটি ১৯৮৮ সালের কিংস্টনে সমকামী একটি নাট্যদলের ওপর নৃশংস হামলা এবং সেই ঘটনার পর দুই দশক ধরে চলা মানসিক আঘাত ও প্রতিশোধের গল্প বলে। এটি যেমন জ্যামাইকায় সমকামিতাবিরোধী মনোভাবকে তুলে ধরে, তেমনি কুইয়ার সংস্কৃতি ও ক্যারিবীয় প্রবাসীদের জীবনও দেখায়।

২০২০ সালের বুকারজয়ী ডগলাস স্টুয়ার্টের 'জন অব জন'-ও দীর্ঘতালিকায় রয়েছে। এখানে এক তরুণ সমকামী ব্যক্তি শৈশবের বাড়িতে ফিরে আসে। সেখানে তার ধর্মভীরু বাবা নিজের যৌন পরিচয় গোপন করে জীবন কাটাচ্ছেন। উপন্যাসটি স্কটল্যান্ডের হেব্রিডিস দ্বীপপুঞ্জের ধর্ম, দমন-পীড়ন ও হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলে।

এলিজাবেথ স্ট্রাউটও তৃতীয়বারের মতো বুকারের মনোনয়ন পেয়েছেন। তার 'দ্য থিংস উই নেভার সে'-এ নতুন কিছু চরিত্র এসেছে। গল্পটি এক মধ্যবয়সী শিক্ষকের, যার দাম্পত্য জীবনে একটি গোপন সত্য এবং মনে গভীর বিষণ্নতা রয়েছে। স্ট্রাউট বরাবরের মতোই আমেরিকার শ্রেণিবৈষম্য ও বঞ্চনার কথা বলেছেন। ট্রাম্পের রাজনীতির প্রভাবও গল্পে ছায়া ফেলেছে। তবে তার মানবিকতা ও উষ্ণ লেখনী পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে।

আমেরিকান লেখক এমা ক্লাইনের 'সুইটজি'-ও দীর্ঘতালিকায় আছে। উপন্যাসটি স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত এক সফল ব্যক্তির শেষ যাত্রার গল্প। তিনি সুইজারল্যান্ডের একটি স্বেচ্ছামৃত্যু ক্লিনিকে যাচ্ছেন। পথে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেষবারের মতো সম্পর্কগুলোকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন। স্মৃতি হারানোর মধ্যেও জীবনের অর্থ খোঁজার এই গল্পটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ।

তবে এবারের বড় চমক হলো, আমেরিকান লেখক 'বেন লার্নার' দীর্ঘতালিকায় নেই। অনেকেই ভেবেছিলেন তার 'ট্রান্সক্রিপশন' নিশ্চিতভাবেই জায়গা পাবে। পরিবার, প্রযুক্তি এবং স্মার্টফোন কীভাবে আমাদের পৃথিবী দেখার দৃষ্টিকে বদলে দিচ্ছে—এই বিষয় নিয়ে লেখা উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত বাদ পড়েছে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ লেখক গুয়েনডোলিন রাইলি প্রথমবারের মতো বুকারের দীর্ঘতালিকায় এসেছেন। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে লিখে আসছেন। তার 'দ্য পাম হাউস' দীর্ঘদিনের এক বন্ধুত্ব এবং লন্ডনের অনিশ্চিত জীবনের গল্প।

এ তালিকায় এম জন হ্যারিসনের 'দ্য এন্ড অব এভরিথিং'-ও রয়েছে। এটি এমন এক ইংল্যান্ডের কাহিনি, যেখানে ভিনগ্রহের আক্রমণের পর সমাজ ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। যুদ্ধ, বদলে যাওয়া বাস্তবতা এবং নতুন বুদ্ধিমান জীবনের উত্থানের মধ্যে মানুষ কীভাবে পথ হারায়, সেটিই এখানে দেখানো হয়েছে।

বিচারক প্যাট্রিসিয়া লকউড বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মানুষের কমে যাওয়া মনোযোগের যুগে এমন নতুন ধরনের সাহিত্য তৈরি হচ্ছে, যেখানে পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। তার মতে, "একটি নতুন, অদ্ভুত ধরনের সাহিত্য জন্ম নিচ্ছে।" এবারের দীর্ঘতালিকায় সেই প্রবণতা স্পষ্ট। অনেক উপন্যাসেই অদ্ভুত, অতিবাস্তব ও ব্যঙ্গাত্মক উপাদান রয়েছে।

মিসৌরি উইলিয়ামসের 'দ্য ভিভিসেক্টরস' তারই একটি উদাহরণ। গাছে ঢেকে যাওয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় শহরকে ঘিরে লেখা এই উপন্যাসে সংস্কৃতি যুদ্ধ, পারিবারিক সংকট এবং সভ্যতার পতনের গল্প আছে। একই সঙ্গে এটি এক অদ্ভুত প্রেমের গল্পও।

রেবেকা পেরির প্রথম উপন্যাস 'মে উই ফিড দ্য কিং'-ও সহজে কোনো এক ঘরানায় ফেলা যায় না। এখানে একদিকে বর্তমান সময়ের এক জাদুঘরকর্মীর গল্প, অন্যদিকে মধ্যযুগের এক অনিচ্ছুক রাজার কাহিনি। পুরো উপন্যাসটি রহস্যময় ধাঁধার মতো এগোয়।

ম্যাকেনা গুডম্যানের 'হেলেন অব নোহোয়্যার' আরও ভিন্নধর্মী। নাটকের দৃশ্যের মতো সাজানো এই উপন্যাসে একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের ক্ষমতা ও মর্যাদা বদলে যাওয়ার গল্প বলা হয়েছে। এতে পুরুষতন্ত্র, সংস্কৃতি যুদ্ধ এবং পরিচয়ের রাজনীতি উঠে এসেছে।

তুর্কি লেখক কেনান ওরহানের 'দ্য রেনোভেশন'-এ ইতালির একটি অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুম হঠাৎ ইস্তাম্বুলের কারাগারে পরিণত হয়। এই অদ্ভুত ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিবাসন, স্বদেশ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং স্মৃতিভ্রংশের গল্প তৈরি হয়েছে।

লুক কেনার্ডের 'ব্ল্যাক ব্যাগ'-এ এক ব্যর্থ অভিনেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখানে তিনি শুধু একটি কালো চামড়ার ব্যাগ পরে ঘুরে বেড়ান। উপন্যাসটি হাস্যরসের মাধ্যমে কাজ, বন্ধুত্ব এবং আধুনিক পুরুষের সংকট নিয়ে কথা বলে।

আইরিশ লেখক জামেল হোয়াইটের প্রথম উপন্যাস 'অল দেম ডগস' ডাবলিনের অপরাধজগত, সমকামী আকাঙ্ক্ষা এবং ভুল সিদ্ধান্তের গল্প। অন্যদিকে ক্লোই আরিদজিসের 'দ্য শ্যাডো অব দ্য অবজেক্ট' অনেক শান্ত ও স্বপ্নময়। এখানে এক নারী পুরোনো ম্যাজিক লণ্ঠন এবং বিভ্রম তৈরির প্রযুক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

আগামী ২২ সেপ্টেম্বর বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। তখন চিত্র বদলাতে পারে। তবে আপাতত বলা যায়, এবারের বুকার দীর্ঘতালিকা নতুন ভাবনা ও নতুন সাহিত্যিক পরীক্ষাকে স্বাগত জানিয়েছে।

মূল : জাস্টিন জর্ডান/দ্য গার্ডিয়ান