বন্ধু শহীদ কাদরীর স্মৃতিচারণে আল মাহমুদ ও আসাদ চৌধুরী

শহীদ কাদরী আমার বন্ধু 
আল মাহমুদ

শহীদ কাদরী আমার বন্ধু। সে যখন নিউ ইয়র্ক থেকে ফোন করতো, বলতো, ‘আমি শহীদ।’ আর হা হা হা করে হাসতো। তার সেই গাঢ় স্বর আমার এখনও মনে আছে। আমি তো কানে শুনতে পাই না। তাই দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে কথা হয় না। তাতেও আমাদের বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে। বাংলাদেশে সে অনেক কষ্ট করেছে। তখন তার পাশে দাঁড়াবার কেউ ছিল না। আমরা হকারীও করেছি। বাংলা কবিতায় তিনি তার স্বাক্ষর রেখেছেন। পঞ্চাশের কবি হলাম আমরা। আমাদের গোড়ার দিকে আমরা ত্রিশের কবিদের খুব পছন্দ করতাম, মানে আপন মনে করতাম। কিন্তু পঞ্চাশ দশকে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে কবিতার ধারাটা, আধুনিক কবিতার ধারাটা বদলে ফেলতে হবে। তার প্রমাণ আমাদের কবিতা। এই সংগ্রামে শহীদ কাদরী শামিল ছিলেন।

শহীদের অনেক ব্যক্তিগত বিষয় আছে, যা তোমাদের আমি বলতে পারব না। তিনি আমাকে বিশ্বাস করেন। বন্ধু মনে করেন।
শ্রুতিলিখন: জাহিদ সোহাগ


আমি আমার বন্ধুকে হারিয়েছি
আসাদ চৌধুরী

আমার বন্ধু শহীদ কাদরী। তার জীবনযাপন প্রণালিই ছিল একটু ভিন্ন রকমের। তার আধুনিক মানসিকতা, কাব্য ভাষা আমাদেরকে দারুণভাবে প্রভাবিত করতো। আমরা যারা ষাটের দশকের দিকে বড়ো হয়েছি, লেখালেখি করেছি, সেই সময় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, এবং শহীদ কাদরী আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে রাখতো। শহীদ কাদরী তার কবিতায় পশ্চিমা ভঙ্গিমার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিষয়গুলোকেও ফুটিয়ে তুলেছেন চমৎকারভাবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার কবিতা সোচ্চার ভূমিকা রেখেছে। ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ বের হবার পর আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম যে, গণহত্যার বদলে গণচুম্বনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি। ফ্যান্টাসি আর অ্যাবসাডিটি এই বিষয়গুলোকে তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরলেন একের পর এক। এটা তখনকার দিনে বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল বটে।

ছড়াকে কীভাবে কবিতা করতে হয় সে বিষয়ে দক্ষ ছিলেন শহীদ কাদরী। কবিতাকে কী করে আধুনিক পাঠকের কাছে উপস্থিত করতে হয় এ কৌশল শহীদ কাদরীর কাছে ছিল সহজাত ও মামুলি ব্যাপার। তিনি আজ নেই। তার কাছে আমরা ঋণী। আমি আমার বন্ধুকে হারিয়েছি। বেদনার এই মুহূর্তে আমি শুধু এটুকু জোরের সঙ্গে বলতে চাই : বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য হারাল একজন সৎ ও মহৎ কবিকে।

শ্রুতিলিখন: মিলন আশরাফ
পুনর্মুদ্রণ