এবারের নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে আলোচনায় যাঁরা

অক্টোবরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নোবেল পুরস্কার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। শান্তি ও সাহিত্য বিভাগে এই পুরস্কারকে ঘিরে যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা যায়, তা অন্য কোনো পুরস্কারের ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা যায় না। এই দুই বিভাগে কে নোবেল পেতে পারেন তা নিয়ে বাজি ধরাও শুরু হয়ে যায়। তবে সাহিত্যের ক্ষেত্রে উত্তেজনা থাকে তুঙ্গে। প্রথমবার প্রদানের পর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার অন্যান্য সাহিত্য পুরস্কারের চেয়ে নিজেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে ধরে রেখেছে। এটি যেমন সম্মান ও অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ করে দেয়, তেমনি বিজয়ীকে বেছে নেওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়াটিকে ঘিরে এক ধরনের গোপনীয়তাও বজায় রাখে। বুকার পুরস্কারের দুই সংস্করণ, প্রিঁ গঁকু এবং ইন্টারন্যাশনাল ডাবলিন লিটারারি অ্যাওয়ার্ডের মতো প্রায় সব বিখ্যাত সাহিত্য পুরস্কারই প্রাথমিক ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে এক ধরনের উদ্দীপনা তৈরি করে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিচারে সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার নিশ্চিতভাবেই এসব পুরস্কার থেকে অনেকটাই আলাদা। তা সত্ত্বেও, এই পুরস্কারকে ঘিরে উত্তেজনা ও আলোচনার কোনো কমতি নেই।

সুইডিশ একাডেমি যেহেতু অঞ্চল ও ভাষাকেও বিবেচনায় রাখে, তাই এ বছর লাতিন আমেরিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর কারণ একটাই। অনেক বছর ধরে সুইডিশ একাডেমি লাতিন-বান্ধব হতে পারেনি। সমসাময়িক লাতিন আমেরিকান লেখকদের মধ্যে সিজার আইরার পুরস্কারটি জেতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। হোর্হে লুইস বোর্হেসের (অনেক জল্পনা-কল্পনা সত্ত্বেও যিনি শেষ পর্যন্ত এই পুরস্কার পাননি) দেশের এই লেখকের বইগুলোর কলেবর বা পৃষ্ঠা সংখ্যা খুব বেশি না হলেও, বুদ্ধিজীবী ও নিবেদিতপ্রাণ পাঠকদের মধ্যে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আইরার পাশাপাশি মেক্সিকান কবি ওমেরো আরিদজিস, লেখক হুয়ান ভিলোরা, ঔপন্যাসিক ক্রিস্তিনা রিভেরা গারজা, ব্রাজিলের মিল্টন হাতুম, চিলিয়ান কবি রাউল জুরিতা নামও আলোচনায় উঠে আসছে।

তবে সাহিত্য নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে ইউরোপ সবসময়ই এগিয়ে থাকে, কারণ অনেক সমালোচকের মতে এই পুরস্কারটি এখনো ‘ইউরোপ-কেন্দ্রিকতা’র গণ্ডি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এবার যদি পুরস্কারটি ইউরোপে যায়, তবে সম্ভাব্য তালিকার শীর্ষে থাকবেন ইতালীয় লেখক ক্লাউদিও মাগরিস ও রোমানিয়ান লেখক মির্চা কার্তারেস্কু। মাত্র একটি উপন্যাস দানিউব—এর মাধ্যমেই মাগরিস বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন; তিনি পুরস্কারটি পেলে কেউ অবাক হবে না। আর যদি গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় দেশগুলোর কথা বিবেচনা করা হয়, তবে স্পেইন বা জার্মানির নাম উঠে আসবে। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দুটি দেশের কোনো লেখক সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাননি (যদি মারিও ভার্গাস ইয়োসাকে পেরুর লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়)। এ কারণে স্পেনের এনরিক ভিলা-মাতাস, আন্তোনিও মুনোজ মলিনা, এদুয়ার্দো মেনদোজা এবং জার্মানির বোথো স্ট্রাউসের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার লুদমিলা উলিৎস্কায়া, মিখাইল শিশকিন ও ভ্লাদিমির সরোকিন, লেবানন-বংশোদ্ভূত ফরাসি লেখক আমিন মালুফ, ইউক্রেনীয় আন্দ্রে কুরকভ এবং বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কারজয়ী ইসরায়েলি ঔপন্যাসিক ডেভিড গ্রসম্যানও এই পুরস্কারের দৌড়ে রয়েছেন।

নোবেল কমিটি এখনো এমন কোনো লেখককে সম্মানিত করেনি যিনি আমেরিকান উত্তর-আধুনিক সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। ভনেগাট ও বার্থ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও পুরস্কারটি পাননি, তবে নোবেল কমিটি এখনো উইলিয়াম টি ভোলমান, আশিতোর্ধ্ব ডন ডেলিলো বা টমাস পিনচনের মতো উত্তর-আধুনিক আমেরিকান লেখকদের পুরস্কৃত করার সুযোগ রাখে। ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করা লেখকদের মধ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান লেখক রোহিন্তন মিস্ত্রি, বুকারজয়ী কানাডিয়ান লেখক মাইকেল ওন্দাচি, আইরিশ ঔপন্যাসিক জন ব্যানভিল, ব্রিটিশ লেখক ইয়ান ম্যাকইউয়ান ও জুলিয়ান বারনেস এবং অস্ট্রেলিয়ান লেখক রিচার্ড ফ্লানাগানও এই পুরস্কারের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থী। প্রতি পাঁচ বা ছয় বছর অন্তর ইংরেজি ভাষার কোনো লেখকের পুরস্কার জয় করাটা বিস্ময়কর কিছু নয়, কারণ ইংরেজি ভাষায় রচিত অভিবাসী বা ডায়াসপোরা সাহিত্য বিশ্বজুড়ে পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চমৎকার সব উপন্যাস উপহার দেওয়া অস্ট্রেলিয়ান লেখক জেরাল্ড মারনেইন যদি নোবেল পুরস্কার পান, তবে তা দুই শতাব্দীর ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের পাঠকের জন্য হবে আনন্দদায়ক একটা ঘটনা। ১৯৭৩ সালে ঔপন্যাসিক প্যাট্রিক হোয়াইট একমাত্র অস্ট্রেলীয় লেখক হিসেবে এই পুরস্কারটি অর্জন করেছিলেন।

আফ্রিকা থেকে আলোচনায় রয়েছেন মোজাম্বিকের ‘অ্যানিমিস্ট রিয়েলিস্ট’ লেখক মিয়া কুতো, দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর-আধুনিকতাবাদী লেখক ইভান ভ্লাদিস্লাভিচ, মরিশাসের আনন্দা দেবী এবং মরক্কোর তাহার বেন জেলুন ও আবদেললাতিফ লাবি। যেহেতু দুই বছর আগে হান কাং এই পুরস্কার জিতেছিলেন, তাই এ বছর এশিয়া থেকে কোনো লেখকের এটি জেতার সম্ভাবনা খুবই কম। গত কয়েক বছরের নোবেল বিজয়ীদের রচনার ধরন বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায় যে, বিজয়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নোবেল কমিটি পরীক্ষামূলক বা প্রথা-ভাঙা রচনার প্রতি বেশি আগ্রহী। এ বছরও সেই একই প্রবণতা বজায় থাকবে কি না, তা বলা কঠিন। ৮ অক্টোবর পর্যন্ত এজন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে।